যন্ত্রণার আরেক নাম নতুন ‘সরকারিকৃত’ কলেজ, যে ৫ যন্ত্রণায় শিক্ষক-কর্মচারীরা

৪ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষকেরাছবি: লেখক

২০১৬ সালের কথা। তখন দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ সরকারীকরণের উদ্যোগ নিল সরকার। আমরা খুশি, উচ্ছ্বসিত। ভাবলাম, বেসরকারি শিক্ষক হিসেবে যে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে এসেছি, অবশেষে সেই কষ্টের অবসান হবে। সরকারি চাকরি মানে নিয়মিত বেতন, ভাতা, পদোন্নতি, চিকিৎসা–সুবিধা, পেনশন—সবকিছু। আমার স্ত্রীও তখন বলেছিল, ‘এবার তো আমাদের সংসারে স্বস্তি আসবে।’ সেই স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল খুব সুন্দর। ২০১৮ সালে ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা’ তৈরি হলো। বিধিমালার আওতায় এখন পর্যন্ত ৩৩৫টি কলেজ সরকারি করা হয়েছে। আমাদের কলেজও এর মধ্যে পড়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে বিধিমালার কারণে আমরা সরকারি চাকরির ছোঁয়া পেলাম, সেই বিধিমালার কিছু ধারাই যেন আমাদের পেশাগত জীবনে বিষাদ ঢেলে দিল।

আজ আমি ফয়সাল হাবিব, একজন নন-ক্যাডার শিক্ষক হিসেবে কথা বলছি। আমার সঙ্গে দেশে আরও ১৬ হাজার ৮৩৬ শিক্ষক-কর্মচারী এ বৈষম্যের শিকার। আমরা আর চুপ করে থাকতে পারিনি। তাই গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছি। সেখানে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছি। সে দাবিগুলো আমার মুখের ভাষায় আপনাদের বলতে চাই।

আরও পড়ুন

প্রথম যন্ত্রণা: নিয়োগপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে গেছে

আমার মতো অনেক শিক্ষক আছেন, যাঁরা সরকারীকরণের আগে থেকেই কলেজে শিক্ষকতা করছেন। সরকারীকরণের পর আমাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আপাতত নাকি ‘আত্তীকরণ’ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরবর্তী সময়ে যখন নতুন শিক্ষক লাগবে, তখন কী হবে? ‘বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) নন-ক্যাডার নিয়োগ বিধি’ নামে কোনো স্পষ্ট কাঠামো নেই। যার ফলে নতুন করে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের কোনো পথ খোলা নেই। কলেজে শিক্ষকের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ক্লাস বন্ধ থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমাকে কখনো কখনো একাই তিনটি বিষয় পড়াতে হয়। শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ আমাদের হাতে কিছু করার নেই।

দ্বিতীয় যন্ত্রণা: বেতন গ্রেডের অবনমন, যেন বেতন কাটা

বেসরকারি আমলে আমরা যে বেতন গ্রেডে চাকরি করতাম, সরকারীকরণের পর সেই গ্রেড নাকি আর বৈধ নয়। একটি নতুন বেতনকাঠামো আরোপ করা হয়েছে, যা আগের চেয়ে কম। মানে সরকারি চাকরিতে ঢোকার পর আমাদের বেতন কমে গেছে। এত কষ্ট করে স্বপ্ন দেখেছিলাম বেতন বাড়বে, উল্টো কমে গেল। এটা কি বৈষম্য নয়? অথচ একই কলেজের ক্যাডার শিক্ষকেরা অনেক বেশি বেতন পান। আমরা একই প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে একই কাজ করছি, কিন্তু বেতনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

তৃতীয় যন্ত্রণা: পদোন্নতি নেই, বদলি নেই; ক্যারিয়ার যেন থমকে গেছে

একজন সরকারি কর্মচারীর প্রধান আকর্ষণ হলো সময়মতো পদোন্নতি। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী, সহযোগী থেকে অধ্যাপক—এটাই স্বাভাবিক গতি। কিন্তু আমাদের জন্য সেই পথ বন্ধ। সরকারীকরণের পর কোনো পদোন্নতি পাইনি আমি। আমার অনেক সিনিয়র সহকর্মী আছেন, যাঁরা ১৫-২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন, তাঁরাও পদোন্নতি পাননি। পদায়ন ও বদলির তো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা সেই কলেজেই আটকে আছি, যেখানে প্রথম যোগ দিয়েছিলাম। অথচ ক্যাডার শিক্ষকেরা সহজেই বদলি হয়ে দেশের যেকোনো ভালো কলেজে চলে যেতে পারেন। আমাদের ক্যারিয়ার যেন একটি অচলাবস্থায় পড়ে আছে।

চতুর্থ যন্ত্রণা: জ্যেষ্ঠতা ও চাকরিকাল গণনায় বিশৃঙ্খলা

আমার বয়স এখন ৪০। আমি শিক্ষকতা শুরু করি ২০১৪ সালে, একটি বেসরকারি কলেজে। সরকারীকরণের সময় আমার মোট চাকরিকাল ছিল ৪ বছর। কিন্তু সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, সেই ৪ বছরের পুরোটাই জ্যেষ্ঠতা গণনায় ধরা হয় না। বরং একটি জটিল সূত্র প্রয়োগ করা হয়, যাতে আমার জ্যেষ্ঠতা কমে যায়। ফলে যিনি আমার চেয়ে পরে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন, তিনিও আমার চেয়ে সিনিয়র হয়ে যান। এটি মর্মন্তুদ। আমি কি কম কাজ করেছি? আমি কি কম পড়িয়েছি? তাহলে কেন আমার পুরোনো অভিজ্ঞতা বাতিল করা হবে? এটা আমাদের মেধা ও পরিশ্রমের অবমূল্যায়ন ছাড়া কিছু নয়।

ছবি: লেখক
আরও পড়ুন

পঞ্চম যন্ত্রণা: চাকরি স্থায়ীকরণে দীর্ঘসূত্রতা ও বকেয়া বেতনের জটিলতা

সরকারীকরণের পর আমরা ‘আত্তীকৃত’ হয়েছি। কিন্তু আমাদের চাকরি এখনো ‘স্থায়ী’ হয়নি। বছরের পর বছর অপেক্ষা করছি। অথচ আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই স্থায়ীকরণ হওয়া কথা। আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই বকেয়া বেতন ও ভাতার পাহাড় জমে গেছে। অনেকের আড়াই-তিন বছরের বকেয়া আটকে আছে।

ষষ্ঠ যন্ত্রণা: অবসর–সুবিধার চাঁদা ফেরত না পাওয়া

আমরা বেসরকারি আমলে ‘অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে’ প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা জমা দিয়েছি। সরকারীকরণের পর সেই ট্রাস্টের অধিভুক্তি শেষ হয়ে যায়। আমরা ফেরত চেয়েছি। জবাব এসেছে, ‘বিধিমালায় সুযোগ নেই।’ অর্থাৎ আমাদের কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ সেই টাকার পরিমাণ প্রায় প্রত্যেকের জন্যই বিশাল। ফেরত না পেলে আমরা গুরুতর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ব। এটা সরাসরি প্রতারণার শামিল।

সপ্তম ও সবচেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রণা: নন-ক্যাডার বাদ দিয়ে ক্যাডার পদ সৃজন

আমরা সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছি যখন শুনলাম, ‘সরকারিকৃত’ কলেজগুলোতে নন-ক্যাডারদের পদ সৃজন না করে বরং নতুন করে ক্যাডার পদ সৃজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মানে আমাদের ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ যাঁরা বছরের পর বছর ধরে ওই কলেজে পড়াচ্ছেন, তাঁদের স্থায়ীকরণই হয়নি। আমরা যেন অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েছি। যদি নন-ক্যাডারদের জায়গাই না রাখা হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়? আমাদের সন্তানেরা কী বলবে যে বাবা শিক্ষক হয়েও সরকারি স্বীকৃতি পেলেন না?

পাঁচ দফা দাবি—আর নয় অবহেলা

এসব সমস্যার সমাধানে আমরা পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছি। আমি সেগুলো আবারও স্পষ্ট করে বলছি; কারণ, এগুলো আমাদের বাঁচার দাবি।

প্রথম দাবি—পৃথক নিয়োগ বিধিমালা: নন-ক্যাডার শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলির জন্য আলাদা ‘বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) নন-ক্যাডার কম্পোজিশন ও রিক্রুটমেন্ট রুলস’ দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, চাই একটি সুস্পষ্ট, ন্যায্য কাঠামো।

দ্বিতীয় দাবি—চাকরিকালের সঠিক গণনা: বেসরকারি আমলে আমরা যে বেতন গ্রেডে ছিলাম, তা বহাল রাখতে হবে এবং প্রথম নিয়োগ ও যোগদানের দিন থেকে কার্যকর চাকরিকাল গণনা করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করতে হবে। আমরা দাবি করি, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা মুছে ফেলা যাবে না।

তৃতীয় দাবি—পদ সৃজন ও শূন্য পদ পূরণ: ‘সরকারিকৃত’ কলেজগুলোতে নন-ক্যাডারদের জন্য প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃজন করতে হবে। সব শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে, যাতে শিক্ষার মান ফিরে আসে।

চতুর্থ দাবি—চাকরি স্থায়ীকরণ ও বকেয়া পরিশোধ: আত্তীকৃত শিক্ষকদের চাকরি দ্রুত স্থায়ী করতে হবে এবং বকেয়া বেতন-ভাতা অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে। আমরা আর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে পারি না।

পঞ্চম দাবি—অবসর–সুবিধার চাঁদা ফেরত: বেসরকারি আমলে অবসর–সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে জমা দেওয়া চাঁদার সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দিতে হবে। এটি আমাদের উপার্জিত অর্থ, তা ফিরে পাওয়া আমাদের অধিকার।

এসব কথা বলছি না শুধু নিজের জন্য। আমি বলছি ১৬ হাজার ৮৩৬ শিক্ষক-কর্মচারীর পক্ষে। আমরা মানববন্ধন করেছি, কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। কিন্তু দাবি না মানলে আরও কঠোর আন্দোলনের পথে যাব। কারণ, আমরা বিদ্রোহী নই, আমরা ন্যায়ের দাবিতে অটল। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বাঁচাতে হলে শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। আমরা যদি হতাশ হয়ে পড়ি, শিক্ষার্থীরা তার প্রভাব দেখবে। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী—সবার প্রতি বিনীত আহ্বান, আমাদের পাঁচ দফা দাবি বিবেচনা করুন। একটি বৈষম্যমুক্ত, ন্যায্য আত্তীকরণ বিধিমালা প্রণয়ন করুন। আমি শেষ করছি একটি প্রশ্ন রেখে—আমরা কি সেই শিক্ষক নই, যাঁরা রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলীকে তৈরি করে দিয়েছিলেন? সেই শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা আজ কোথায়? ফিরিয়ে দিন আমাদের অধিকার, নইলে হারাবে শিক্ষা, হারাবে বাংলাদেশ।

  • লেখক: ফয়সাল হাবিব, প্রভাষক (নন-ক্যাডার), সরকারিকৃত বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি কলেজ, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

  • ভুক্তভোগী শিক্ষক, সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক নন-ক্যাডার ঐক্যজোটের সদস্য