মাধ্যমিকের অনেক শিক্ষার্থী প্রথম দিনে বই পায়নি, সংকট নেই প্রাথমিকে

বছরের প্রথম দিনে নতুন বই হাতে পেয়ে খুশি শিক্ষার্থীরা। পুরান ঢাকার রাজার দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ছবি: দীপু মালাকার

শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও বছরের প্রথম দিনে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পায়নি মাধ্যমিক স্তরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পরিকল্পনা ছিল প্রথম দিনেই সব শিক্ষার্থীর হাতে অন্তত এক থেকে দুটি করে হলেও বই তুলে দেওয়া। কিন্তু সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির একটি বইও যায়নি অনেক বিদ্যালয়ে, এমন বিদ্যালয় রাজধানীতেও আছে।

তবে এবার কোনো সংকট নেই প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই নিয়ে। আরও দুই সপ্তাহ আগেই প্রাথমিকের শতভাগ পাঠ্যবই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যতিক্রম ছাড়া প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিনে সব পাঠ্যবই হাতে পেয়েছে। এর মধ্যেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক স্তর থাকা কোনো কোনো বিদ্যালয়ে আজ বৃস্পতিবার প্রাথমিকের বই দেওয়া হয়নি বলে একাধিক অভিভাবক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা দাবি করছেন, মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব পাঠ্যবই পেয়ে যাবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাস্তবে আরও দেরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। ফলে নতুন বই হাতে না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনার ক্ষতি হবে।

যদিও এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সব পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সন এনসিটিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে কেউ চাইলে সেখান থেকেও তা ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

এনসিটিবির সূত্রমতে, এবার মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪। এর মধ্যে গত ৩১ ডিসেম্বর রাত আটটা পর্যন্ত মাধ্যমিকের ৭২ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাঠ্যবই মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। ইবতেদায়ি স্তর ছাড়া কেবল ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই সরবরাহ করা হয়েছে ৬৯ শতাংশ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে গেছে ৮০ শতাংশের বেশি, সপ্তম শ্রেণিতে ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ ও নবম শ্রেণিতে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রমনা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে ট্রাক থেকে বই নামানো হচ্ছে
ছবি: মোশতাক আহমেদ

অবশ্য এরপরও আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আরও কিছু বই গেছে। এনসিটিবির সূত্রমতে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্‌–প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট বই ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি। এর মধ্যে আজ পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ২৪ কোটি ৬৯ লাখের বেশি (৮২ শতাংশের বেশি)।

বিদ্যালয়ে যায়নি সপ্তম–অষ্টমের বই

নিউ ইস্কাটন এলাকায় অবস্থিত প্রভাতী উচ্চ বিদ্যানিকেতন। আজ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আজ ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে। আবার বইও বিতরণ করা হচ্ছে। এই বিদ্যালয়ে প্রাক্‌–প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৪০০।

বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেছেন, প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সব বই পাওয়া গেছে। নবম শ্রেণির বেশির ভাগ বই এসেছে। কিন্তু সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির কোনো আসেনি।

সেখান থেকে ইস্কাটন গার্ডেন রোডে অবস্থিত ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয়ে গেলেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী জানান, প্রাথমিক স্তর ও মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির সব বই পাওয়া গেছে। আর নবম শ্রেণির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বই পেয়েছেন। কিন্তু সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই এখনো আসেনি।

দরপত্র অনুযায়ী এনসিটিবির তত্ত্বাবধানে বই ছাপিয়ে মুদ্রণকারীরা তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসে পৌঁছে দেয়। মাধ্যমিকের বই যায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে এবং প্রাথমিকের বই যায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। সেখান থেকে বিদ্যালয়গুলো বই সংগ্রহ করে পরে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়।

প্রভাতী উচ্চ বিদ্যানিকেতন ও ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয় দুটি রমনা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অধীনে। সেগুনবাগিচায় অবস্থিত সেই অফিসে গেলে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, তাঁদের অধীনে ২৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এবার বই দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির সব বই এসেছে। আর সপ্তম শ্রেণিতে দুই বিষয়ের (বাংলা বিষয়ের) বই এসেছে। আর অষ্টম শ্রেণির বই এখন নামছে।

প্রাথমিকের নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে। পুরান ঢাকার রাজার দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
ছবি: দীপু মালাকার

এই প্রতিবেদক যখন সেখানে ছিলেন, তখন দেখা যায় ছোট ট্রাক থেকে বই নামানো হচ্ছে।

মাদ্রাসার ইবতেদায়ি বই নিয়ে সমস্যা নেই। তবে দাখিল স্তরের মধ্যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই আসেনি। আর অষ্টম শ্রেণিতে পাঁচটি ও নবম শ্রেণিতে সব বই এসেছে।

‘প্রাথমিকে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে’

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য প্রাথমিক স্তরে মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি। এরই মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আগের মতো বছরের প্রথম দিনে বড় উৎসব করে শিক্ষার্থীদের বই দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যালয়গুলোয় বই পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়।

এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার আজ নতুন বছরের প্রথম দিনে ঢাকার আবুল বাশার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই বিতরণ কার্যক্রম দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনও করেন।

আরও পড়ুন

ওই অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, নতুন বছরের শুরুতেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা লক্ষ করলে দেখবেন, এই বইগুলোর মান আগের তুলনায় নিশ্চিতভাবেই ভালো। এটি বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।’

পরে উপদেষ্টা ঢাকার ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবনে নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ে বই বিতরণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এখানে কিছুদিন আগে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে, যা জাতির জন্য কলঙ্কজনক। আমরা দেখেছি সংবাদমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে, একজন সংখ্যালঘু নাগরিক আক্রান্ত হয়েছেন। এসব ঘটনা গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে আশার কথা হলো, এ দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এসব ঘটনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।’

আরও পড়ুন