স্কুলকে শিক্ষাবান্ধব করার উপায়
অর্থবহ বা মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য স্কুলকে গড়ে তুলতে হবে শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। শিক্ষার্থীদের কাছে স্কুল হতে হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা দিন দিন স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে। স্কুলে না যাওয়া বা স্কুল পালানোটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। এতে করে বেড়ে যাচ্ছে তাদের প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং–নির্ভরতা। অভিভাবকদের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসছে বাড়তি খরচের এক ভয়াবহ বোঝা। এর কারণ কী? এর পেছনে অনেক বিষয় জড়িত। সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, আকাশ–সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদি তো আছেই, পাশাপাশি আমাদের স্কুল ব্যবস্থাপনাগত বা পাঠদানসংক্রান্ত কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। কারণ, যত সমস্যার কথাই বলি না কেন, আমাদের সন্তানদের স্কুলমুখী করার কোনো বিকল্প নেই। তাই সমস্যাটির সমাধান করতেই হবে। অন্তত আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই।
একটা কথা বলে রাখা দরকার। আমি ৩২ বছরের বেশি সময় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে এখন অবসরে আছি। তাই বিষয়টিকে মাধ্যমিক পর্যায় অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পরিপ্রেক্ষিতে আমি আলোচনা করছি। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে হলে আমাদের অবশ্যই কিছু কাজ করতে হবে।
প্রথমেই আসে অবকাঠামোর বিষয়টি। অবকাঠামোকে অবশ্যই সুন্দর ও আকর্ষণীয় করতে হবে। কোনো রকমে একটা স্কুলঘর দাঁড় করালেই হবে না। সম্পূর্ণ স্কুলটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। আমাদের দেশে বিষয়টি অনেকটাই অবহেলিত।
আমেরিকার স্কুলে দেখেছি, প্রক্সি ক্লাসের জন্য নিয়মিত শিক্ষকদের বাইরে কিছু নিবন্ধিত শিক্ষক আছেন। কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিবন্ধিত শিক্ষক ক্লাস নেন। আমাদের দেশেও এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। সীমিতসংখ্যক স্কুলে হলেও এটা চালু করে দেখা যায়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনোরূপ পরিকল্পনা ছাড়াই স্কুল স্থাপিত হয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় অনেক কিছুর যেমন অভাব থাকে, তেমনি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশও সেখানে থাকে না। ফলে সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আনন্দময় কোনো পরিবেশ পায় না। এমনিতেই পড়াশোনা একটি বিরক্তিকর ব্যাপার। তার ওপর আনন্দময় পরিবেশ যদি না থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখাটা খুব কঠিন। তাই পুরো স্কুলটি সাজানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি স্কুলের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকা দরকার। স্কুলের কোথায় কী থাকবে, তা এই মাস্টারপ্ল্যানে থাকতে হবে।
একসঙ্গে সব হয়তো করা যাবে না। কিন্তু প্ল্যানটা থাকলে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংযোজন সম্ভব, যার ফলে স্কুলের অবকাঠামোতে সংযোজন ঘটলেও পরিবেশটা এলোমেলো হবে না। কিন্তু আমাদের স্কুলগুলোতে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা না থাকায় শুধু যে সৌন্দর্যের বিষয়টিই বিঘ্নিত হয়, এমনটি নয়; বরং অনেক সময় অর্থেরও অপচয় হয়। যেমন একটি ঘর এক জায়গায় তোলা হলো। কিছুদিন পর দেখা গেল একটা বিল্ডিং করা দরকার। তার জন্য আগের ঘরটা ভাঙতে হয়। এভাবে অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়ে যায়। একটা মাস্টারপ্ল্যান থাকলে এমন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
আমির খানের ‘তারে জামিন পার’ সিনেমা যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা অবশ্যই বুঝেছেন, একজন ভালো শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেন। এটা সিনেমায় নয়, বাস্তবেও সম্ভব।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রেণিকক্ষটা সুন্দরভাবে সাজানো। শ্রেণিকক্ষটা আকর্ষণীয় হলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসের প্রতি আকৃষ্ট হবে, এটাই স্বাভাবিক। শ্রেণিকক্ষ যে কত সুন্দরভাবে সাজানো সম্ভব, সেটা দেখেছিলাম ২০১০ সালে আমেরিকায় টি ই এ প্রোগ্রামে গিয়ে। সেখানে ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে লিংকন শহরের নর্থস্টার হাইস্কুলে আমার দুই সপ্তাহ শ্রেণিপাঠদান কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। ওখানে শ্রেণিকক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি দ্বারা অসাধারণভাবে সাজানো, যার ফলে ক্লাস নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক খুব সহজেই সব সামগ্রী হাতের কাছে পেয়ে যান।
মনে করুন, এখন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভূগোল ক্লাস। শিক্ষার্থীরা সবাই যাবে ভূগোল স্যারের কক্ষে, যেখানে শিক্ষক ভূগোল বিষয় পড়ানোর সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষা করছেন। পরের পিরিয়ডে গণিতের ক্লাস থাকলে শিক্ষার্থীরা যাবে গণিতের স্যারের কক্ষে। এভাবে শিক্ষার্থীরা কক্ষ পরিবর্তন করে। শিক্ষক নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করেন। এতে করে পাঠ উপকরণগুলো বারবার টানাহেঁচড়া করার ঝামেলা না থাকায় এগুলো সুন্দর থাকে এবং বহুদিন টিকে থাকে। পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হাতের কাছে সহজেই পাওয়া যায়। আমেরিকানরা তদের শ্রেণিকক্ষের অবস্থা এই পর্যায়ে রাতারাতি নিয়ে এসেছেন, এমন ভাবার কারণ নেই। আর চেষ্টা করলে আমরা পারব না, এমনটাও ভাবার কারণ নেই।
শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারেন প্রধান শিক্ষকেরা। আমার বিশ্বাস, একজন প্রধান শিক্ষকের কার্যক্রমে যদি সততা ও স্বচ্ছতা থাকে এবং তিনি যদি নেতৃত্বগুণসম্পন্ন হন, তবে তাঁর পক্ষে স্কুল চালানো অনেকটাই সহজ। তাঁর পক্ষে সবার সহযোগিতায় স্কুলে শিক্ষাবান্ধব একটি পরিবেশ গড়ে তোলাও খুবই সম্ভব। একটা কথা খুব ভালো করে মাথায় রাখতে হবে যে শিক্ষার্থীদের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা তাঁর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে এই দায়িত্বপালন থেকে তাঁর পিছু হটার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থীদের স্কুলে আকৃষ্ট করার ব্যাপারে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন আমাদের শিক্ষকেরা। আমার ধারণা, শিক্ষকদের প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে মন্ত্রের মতো কাজ করতে পারে। তবে দু–একজনের চেষ্টায় তেমন কিছু হবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে দরকার সম্মিলিত ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। আরেকটি কথা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে শিক্ষকের পাঠদান আকর্ষণীয় হয়, তাঁর ক্লাস শিক্ষার্থীরা এখনো মনযোগ দিয়ে শোনে। তাঁর ক্লাসের জন্য তারা আগ্রহভরে অপেক্ষা করে থাকে। আর একটা সুন্দর ক্লাসের জন্য দরকার ভালো প্রস্তুতি। ন্যূনতম প্রস্তুতি ছাড়া ভালো ক্লাস নেওয়া কীভাবে সম্ভব? একজন ক্রিকেটার বা ফুটবলারের কথা ভাবুন, যিনি তাঁর দৃষ্টিনন্দন খেলা দিয়ে সারা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন। কিন্তু তাঁর এই ক্ষমতা কি রাতারাতি অর্জিত হয়ে যায়? আমরা কি ভেবে দেখি, এর জন্য তাঁকে কতটুকু শ্রম দিতে হয়েছে? একজন কণ্ঠশিল্পী তাঁর গান দিয়ে স্টেজ মাতিয়ে রাখেন। কিন্তু আমরা কি খবর রাখি, সুন্দর সংগীত পরিবেশনের জন্য কী পরিমাণ রেওয়াজ তিনি করেন? তবে প্রস্তুতি ছাড়া আমাদের ক্লাসে শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হবে, এটা কীভাবে আশা করি?
শিক্ষকতাকে আমরা যাঁরা পেশা হিসেবে নিয়েছি, শিক্ষার মানোন্নয়নের চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে এবং তা করতে হবে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। আমরা যদি নিজেদের কাজটায় একটু বেশি সময় দিয়ে, শ্রম দিয়ে, মাথা খাটিয়ে পাঠদানটাকে আকর্ষণীয় করতে পারি, তবে আমার বিশ্বাস, আমাদের ক্লাসগুলোর জন্য শিক্ষার্থীরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকবে। আর এ ক্ষেত্রে পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকারের কোনো বিকল্প নেই। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস মূলত ছিলেন একজন শিক্ষক। আর এথেন্সের যুবকদের শিক্ষা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাণটাই দিতে হয়েছিল। আর তাঁর এই ত্যাগের হাত ধরেই সারা বিশ্বে আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠেছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে তাঁর মতো ত্যাগ স্বীকার করা তো সম্ভব নয়। তবে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করার জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হবে।
এখানে আরেকটা বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হলে আমাদের স্কুলগুলোকে অবশ্যই সমস্যামুক্ত করতে হবে। সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের বিষয়ে একটু বলি। নিয়োগবিধির জটিলতায় সব সরকারি মাধ্যমিক স্কুল সহকারী প্রধান শিক্ষকশূন্য। শুধু সহকারী প্রধান শিক্ষক নয়, একই জটিলতায় সব সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদের শূন্যতা নিয়েই চলছে প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি দায়িত্বে সহকারী প্রধান শিক্ষক দিয়ে স্কুলগুলো চলছে কোনোরকমে। জেলা শিক্ষা অফিসেরও একই অবস্থা। প্রায় ৮০ ভাগ সরকারি স্কুল প্রধান শিক্ষকশূন্য। চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষক দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের কাজ চলছে। প্রায় দুই হাজার সিনিয়র শিক্ষজের পদ শূন্য থাকলেও আইনি জটিলতায় পদোন্নতি আটকে আছে। ৫০ শতাংশ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদে সিনিয়র শিক্ষকদের পদায়নের বিধান থাকলেও প্রায় ৩০০ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ছাড়া প্রায় ২০–২১ বছর চাকরি করেও টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পাচ্ছেন না অনেক শিক্ষক। বঞ্চিত হচ্ছেন আর্থিক সুবিধা থেকে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি’ বিষয়টি পাঠ্যতালিকায় থাকলেও সরকারি স্কুলে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষকের কোনো পদ নেই। বেসরকারি স্কুলেও এমন অনেক সমস্যা আছে। সরকারি–বেসরকারি স্কুলের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হলে এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। কারণ, স্কুলের কার্যক্রমে গতিশীলতা না থাকলে শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, যা মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে অন্তরায়।
মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রক্সি ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা। কোনো শিক্ষক স্কুলে উপস্থিত না থাকলে অন্যদের মাধ্যমে তাঁর ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা এটি। অনেক সময় এ ধরনের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের তেমন কোনো কাজ হয় না বললেই চলে। যেমন ধরুন, আজ গণিতের স্যার স্কুলে নেই। স্যারের ক্লাসের সময় গণিত ক্লাস নিতে পারেন, এমন অন্য সবার নিজের ক্লাস আছে। ওই পিরিয়ডে ইসলাম শিক্ষার স্যারের কোনো ক্লাস নেই। এ অবস্থায় তাঁকেই গণিতের ক্লাসে পাঠানো হলো। এই ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীদের সময় কাটানো ছাড়া কোনো লাভ হবে না। এ ধরনের ক্লাস অনেক সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—সবার জন্য বিরক্তির কারণ হয়। আমেরিকার স্কুলে আমি দেখেছি, প্রক্সি ক্লাসের জন্য নিয়মিত শিক্ষকদের বাইরে কিছু নিবন্ধিত শিক্ষক আছেন। কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিবন্ধিত শিক্ষককে দিয়ে ছুটিতে থাকা শিক্ষকের ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যিনি ক্লাস নেওয়ার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আসেন এবং তাঁর ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব উপকৃত হয়। আমাদের দেশেও এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। সীমিতসংখ্যক স্কুলে হলেও এটা চালু করে দেখা যায়। বেসরকারি অনেক তহবিল তো স্কুলে আছেই। শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে এ–সম্পর্কিত আরেকটা তহবিল গঠন করলে তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়; বরং প্রক্সি ক্লাসগুলো সুন্দর হলে শিক্ষার্থীদেরই লাভ। এখানে আরও একটা বিষয় বলতে চাই। আমেরিকায় শিক্ষকেরা ভালো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া কোনো ক্লাস নেন না। তাঁরা স্কুল ছুটির পর পরের দিনের ক্লাসের প্রস্তুতি শেষ করে বাড়ি যান। ফলে শিক্ষার্থীরা পরদিন তাঁর কাছ থেকে সুন্দর ক্লাস উপহার পায়।
স্কুলে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে উৎসাহিত করা সম্ভব। আজ যে শিক্ষার্থীকে খুব সাধারণ ভাবছি, হয়তো তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ কোনো প্রতিভা। একটু সুযোগ পেলেই সে হয়তো পেয়ে যেতে পারে তার গন্তব্যের সন্ধান, সমাজকে করতে পারে আলোকিত। তাই ক্লাসের পাশাপাশি সহপাঠক্রমিক কাজেও আমরা অর্থাৎ শিক্ষকেরা যদি একটু বেশি সময় দিই, তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের যেমন সুযোগ সৃষ্টি হবে, তেমনি তারা স্কুলমুখী হবে বলেও আমার বিশ্বাস। আর এভাবেই তাদেরকে মাদক, জঙ্গিবাদ, কিশোর গ্যাং ইত্যাদি থেকে দূরে রেখে সুন্দর সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
দেশের স্বার্থেই স্কুলের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আর কাজটা যে খুব কঠিন, এমন নয়। আবার খুব যে সহজ, তা–ও নয়। এর জন্য একটু পরিশ্রম তো করতেই হবে। ইউরোপ বা আমেরিকায় শিক্ষার যে পরিবেশ, তা এক দিনের ফসল নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফলে সেসব দেশ শিক্ষার পরিবেশকে এই পর্যায়ে আনতে পেরেছে। সাধারণ মানের স্কুল নিয়ে বসে থাকলে এখন আর আমাদের চলবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে কাজ আমাদের করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। প্রশাসন, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ম্যানেজিং কমিটি, স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক—সবাই একযোগে কাজ করে স্কুলে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়নে ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা যত ভালো, সে স্কুলের পরিবেশও তত ভাল। ম্যানেজিং কমিটি চাইলে স্কুলের পরিবেশ সুন্দর হবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না।
শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের চেষ্টাও কিন্তু কম নয়। অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সারা দেশের বহু স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, আইসিটি লার্নিং সেন্টার নির্মাণ, অনেক উপজেলায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ইউআইআরটিসিই ভবন নির্মাণ, ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠদানের জন্য ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, মাল্টিমডিয়া সরবরাহসহ সব ধরনের প্রচেষ্টাই সরকারের পক্ষ থেকে অব্যাহত আছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও আমাদের শিক্ষকদের পাঠদানে যদি কোনো পরিবর্তন না আসে, পাঠদান যদি আগের মতোই হয়, তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে লাভ হবে না। সরকারের দেওয়া সুবিধাগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে তো প্রকৃত সুফল আসবে না। আমরা যদি এ সুযোগগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাই, তবেই পাঠদান সুন্দর হবে, যার সুফল পাবে শিক্ষার্থীরা। তখন তারা তাদের স্কুলের প্রতি মনোযোগী হবেই।
আমাদের একটা বিষয়ে খুব গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সেটা হলো কর্মমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া। পাঠ্যক্রম এই লক্ষ্য নিয়ে সাজানো জরুরি। স্কুলের বিজ্ঞান ল্যাবগুলোর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর বিজ্ঞান ল্যাবে গতানুগতিক ব্যবহারিক ক্লাসের পরিবর্তে অ্যাডভান্সড ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডে আইসিটি প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় আমরা ওয়েলিংটন কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে একটা ব্যবহারিক ক্লাসে রোবট বানাতে দেখেছিলাম। ২০১০ সালে টিইএ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সময় আমেরিকার একটা স্কুলের ব্যবহারিক ক্লাসে ট্রাকের ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করতে দেখেছি। সে তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। কিন্তু আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ব্যবহারিক ক্লাসগুলো যদি নিয়মিত ও আকর্ষণীয় করতে পারি, শিক্ষার্থীরা এসব ক্লাস কখনোই মিস করবে না।
দেশের পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। এই দায়ভার কি শুধু তাদের? দায়ভার তো আমাদেরও। একজন শিক্ষার্থী নবম ও দশম শ্রেণিতে একই বই দুই বছর পড়েও এসএসসিতে পাস করতে পারবে না, এটা দুঃখজনক। দুর্বল শিক্ষার্থীদের নিয়ে আগে থেকেই একটু কাজ করলে এ পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। আর সবল শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটু বাড়তি কাজ করলে জিপিএ–৫–এর সংখ্যাও বাড়ানো সম্ভব। আমরা স্কুলের ভালো ফলাফল চাইব আর একটু বাড়তি পরিশ্রম করব না, তা কি হয়?
আমির খানের বিখ্যাত সিনেমা ‘তারে জামিন পার’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা অবশ্যই বুঝেছেন, একজন ভালো শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেন। এটা শুধু সিনেমায় নয়, বাস্তবেও সম্ভব। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষার্থীর মধ্যে মননশীলতা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সীমাহীন। বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডারের শিক্ষক ছিলেন এরিস্টটল। আলেকজান্ডার বহু দেশ জয় করেছিলন। কিন্তু জয়ের পর তিনি কোনো দেশেই কোনোরূপ ধ্বংসলীলা চালাননি। তাঁর এই ধৈর্যশীল আচরণে এরিস্টটলের শিক্ষাদানেরই প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।
শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করার ব্যাপারে শিক্ষকদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি বলে আমি মনে করি। শিক্ষকদের ছাড়াও এ বিষয়ে অনেকেই সহায়তা করতে পারেন, এটা ঠিক। তবে কাজের কাজটা করতে হবে শিক্ষকদেরকেই। শিক্ষার্থীদের ভালোবেসে, আন্তরিকতা দিয়ে স্কুলটাকে শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে পারেন শিক্ষকেরাই। তাঁরা শিক্ষার্থীদের শুধু যে পাঠ্যবই পড়িয়ে পরীক্ষায় পাস করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন তা নয়; বরং তাঁরা শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের দুয়ার খোলে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখাবেন; আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, এরিস্টটল, সক্রেটিস, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্ন অবশ্যই দেখাতে হবে। যার মধ্যে স্বপ্ন নেই, সে এগিয়ে যাবে কী করে! আর স্বপ্ন দেখাতে হলে নিজেও তো স্বপ্ন দেখতে হবে। যে শিক্ষক নিজেই স্বপ্ন দেখেন না, তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাবেন কী করে?
একটা বিষয়ে আমাদের খুব গুরুত্ব দিতেই হবে। আর সেটি হলো আমাদের নিজেদের স্বার্থে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে, সর্বোপরি দেশের স্বার্থে স্কুলকেই শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বানানোর জন্য স্কুলের পরিবেশটাকে অবশ্যই শিক্ষাবান্ধব করতে হবে। আমরা আমাদের দেশটাকে উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত করতে চাই। আর এর জন্য দরকার শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও মননশীল জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে স্কুলগুলোকে মানসম্পন্ন বা উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই। আর এ জন্য দরকার সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর উদ্যোগ এবং সরকার, ম্যানেজিং কমিটি, প্রধান শিক্ষকসহ সব শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমার বিশ্বাস, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের স্কুলগুলো শিক্ষাবান্ধব হবেই। আর আমাদের শিক্ষার্থীদেরও তখন স্কুলমুখী না হওয়ার কোনো কারণ থাকবে না। এমন একটা সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় রইলাম।
*মো. মোতাহার হোসেন, সাবেক প্রধান শিক্ষক, মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা