default-image

শাবনাজ-নাঈম ও সালমান শাহ-শাবনূরের ছবি দেখে নিজেকে সিনেমার নায়িকা হিসেবে স্বপ্ন দেখতেন মুনমুন। বাস্তবে একটা সময় তিনিও নায়িকা হয়েছেন। তবে ভাগ্যটা যেন তাঁর সুপ্রসন্ন হয়নি। ছবিতে অভিনয় করেছেন ঠিকই, ব্যবসায়িক সফলতাও পেয়েছে তাঁর অভিনীত ছবিগুলো, কিন্তু দর্শকের কাছে তাঁর ভাবমূর্তি নেতিবাচক। তাই তো রাগ-ক্ষোভ, বিষাদময় মন নিয়ে ২০০৩ সালে বিয়ে করেই সিনেমাজগৎ থেকে দূরে সরে পড়েন মুনমুন। বিয়ে করে চলে যান যুক্তরাজ্যে। দুই বছর পর আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। টুকটাক কাজও শুরু করেন। নব্বই দশকের আলোচিত-সমালোচিত এই চিত্রনায়িকা এখন কোথায় আছেন, কী করছেন?


বুধবার দুপুরে কথা হয় মুনমুনের সঙ্গে। জানালেন, স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে টঙ্গীর কামারপাড়া এলাকায় নিজের বাড়িতে থাকেন। করোনার কারণে তিন মাসের বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছা ঘরবন্দী জীবন কাটছে। সময়টা জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ সময় বলেও জানালেন তিনি। সন্তানদের দেখভাল করতে পারছেন। নিজে রান্নাবান্না করে খাওয়াচ্ছেনও।


মুনমুন বললেন, ‘শুরুতে ভেবেছিলাম ঘরের কাজ খুব একটা করতে পারব না। কিছুদিন যাওয়ার পর দেখছি সমস্যা হচ্ছে না। আমি নিজে এমনিতে খুব পরিশ্রমী মানুষ। তাই যেকোনো চ্যালেঞ্জে খুব সহজে মানিয়ে নিতে পারি।’


মুনমুন দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন মীর মোশাররফ হোসেনকে। এই সংসারে রয়েছে শিবরাম নামে তাঁর একটি সন্তান। স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানে পড়ে। প্রথম ঘরের সন্তান যশ পড়ে স্ট্যান্ডার্ড সিক্সে। দুই সন্তানকে নিয়ে কাটছে মুনমুনের এখনকার জীবন। কথায় কথায় জানালেন, লকডাউনের বেশ কিছুদিন আগে তিনটি ছবিতে কাজ করেছেন। নাম ‘রাগী’, ‘তোলপাড়’ ও ‘পাগল প্রেমিক’। আর গত বছর মুক্তি পেয়েছিল ‘পদ্মার প্রেম’ ছবিটি।

default-image

যে মুনমুন ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা কাজ করেছেন, সেই মুনমুন এখন অনেকটাই অনিয়মিত। টানা ৬ বছরে ৮০টির মতো ছবিতে কাজ করেন। আর গেল ১৭ বছরে ছবির সংখ্যা হাতে গোনা ১০টির মতো। সিনেমা ছাড়ার কারণ হিসেবে মুনমুন বলেন, ‘ছাড়ার আগে সিনেমার সার্বিক অবস্থা খুব খারাপ হয়েছিল। আমার জন্য কাজ করাটা খুব কঠিন হয়ে ওঠছিল। অশ্লীলতা আর ফিল্মি পলিটিক্স অন্যতম দুটো কারণ। এত হিট ছবি উপহার দেওয়ার পরও সবাই বলত, আমি অশ্লীল ছবির নায়িকা! মনটা বিষাদময় হয়ে উঠেছিল। তাই দূরে সরে যাই।’
আপনি কি অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয় করেননি? মুনমুন বলেন, ‘আমি যে ধরনের পোশাক পরতাম, তখন সব নায়িকাই একই ধরনের পোশাক পরতেন। আমাকে কেন আলাদাভাবে অশ্লীল বলা হতো, মাথায় ঢুকত না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব প্রচার করা হতো। আমি অ্যাকশন ছবির নায়িকা ছিলাম। অ্যাকশন ছবিতে সুপার কমার্শিয়াল বিষয়টা একটু বেশিই থাকে। তাই অনেকে অকারণে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতেন। কিছু দর্শক আর সাংবাদিক আমাকে অশ্লীল তকমা দিয়েছেন। দেশের আনাচকানাচে স্টেজ শো করি, কেউ তো আমাকে অশ্লীল নায়িকা বলেন না, সবাই আমাকে অ্যাকশন দৃশ্যের নায়িকা বলতে পছন্দ করেন।’
এহতেশাম পরিচালিত ‘মৌমাছি’ সিনেমার মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে মুনমুনের। ‘টারজান কন্যা’ ছবি দিয়ে আলোচনায় আসেন। আর ‘রানী কেন ডাকাত’ ছবি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে জানালেন। চলচ্চিত্রে তাঁর শুরুটা হয়েছিল এহতেশামের মতো বরেণ্য পরিচালকের হাত ধরেই। এই পরিচালকের ছবিতে অভিষেক হয়ে চলচ্চিত্রের আকাশে আজও ঝলমলে তারা হয়ে আছেন শবনম, শাবানা, শাবনাজ, শাবনূরের মতো তারকারা। মুনমুনের ক্ষেত্রে উল্টোচিত্র। তাঁর ভাগ্যে জুটেছে নেতিবাচক ভাবমূর্তি। এ জন্য পরিচালক-প্রযোজকদের বেশি করে দুষলেন তিনি।

default-image

মুনমুন জানালেন, লেডি অ্যাকশন ছবিতে তাঁর ব্যাপক চাহিদা ছিল। ‘রানী কেন ডাকাত’ মুক্তির পর সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। প্রযোজক-পরিচালকেরা এ সময় মুনমুনকে ব্ল্যাকমেল করাও শুরু করেন বলে দাবি তাঁর। বললেন, ‘হঠাৎ করে আমার আলোচিত হওয়াটা অনেকে ভালোভাবে নিতে পারেননি। সত্যি কথা বলতে, আমি খুব পরিশ্রমী ছিলাম। চেষ্টা করতাম, অভিনয় ভালো করে করার। কিন্তু প্রযোজক–পরিচালকদের একটা গ্রুপের সঙ্গে আমার পোশাক নিয়ে প্রতিনিয়ত ঝগড়া হতো। মন–কষাকষি হতো। আমাকে স্বল্পবসনা হয়ে পর্দায় উপস্থিত করানোর জন্য চাপ দেওয়া হতো। প্রায় ছবিতে শর্টপ্যান্ট পরতে বাধ্য করতেন। আমারও বলার স্বাধীনতা ছিল না। তবে তখন শুধু একা আমি নই, অনেক নায়িকাই শর্টপ্যান্ট পরতেন, বদনাম হতো শুধু আমার! আমার সঙ্গে যেসব প্রযোজক-পরিচালক এমন করেছেন, তাঁরা পরে কর্মফলও ভোগ করছেন।’
কারা সেসব পরিচালক? এমন প্রশ্নে মুনমুন বললেন, ‘আমি তাঁদের নাম এখন আর মুখে নিতে চাই না। ওদের কারও প্রতি মন থেকে আমার শ্রদ্ধাও নেই। তখন একটু বোকা ছিলাম, তাই কষ্ট পেতাম। এখন মনে হয় যা হয়েছে তা হয়তো আমার ভাগ্যে লেখা ছিল। নিজের পুরোনো ছবিগুলো যখন দেখি, আমি কখনোই মনে করি না ভুল করেছি। আমি অন্যায় করিনি। আমার সঙ্গে প্রযোজক–পরিচালকেরা যা করেছেন, তা চরম অন্যায়, অপরাধ। প্রতিহিংসাবশত আমাকে ব্ল্যাকমেল করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, সৃষ্টিকর্তা অন্ধকার যেমন দিয়েছেন, তেমনি আলোও দিয়েছেন।’

default-image

চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুরের মেয়ে মুনমুন। বাবা সৈয়দ বজল আহমেদের চাকরিসূত্রে তাঁর জন্ম ইরাকে। ৭ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই থেকেছেন। এরপর তাঁর বাবা এসে নাটোরের সুগার মিলে চাকরিতে যোগ দেন। ওখানেই প্রথম স্কুলে ভর্তি হন মুনমুন। বছরখানেক পর চলে আসেন ঢাকার পল্টনে। ভর্তি হন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে। ১৯৯৬ সালে ‘ও’ লেভেল শেষ করার পর পরিচিত এক খালার মাধ্যমে যোগাযোগ হয় এহতেশামের সঙ্গে। প্রথম দেখায় এহতেশাম নায়িকা হিসেবে পছন্দ করলেও প্রযোজক প্রধান নায়িকা করতে রাজি হননি মুনমুনকে। বললেন, ‘আমি একটু মোটা ছিলাম। ওজন ছিল ৬৫ কেজি। প্রযোজক বলেছিলেন, আরও ১০ কেজি ওজন কমাতে হবে। তবেই নায়িকা বানাবেন। প্রধান নায়িকা না বানালেও আমাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন এহতেশাম দাদু।’
এহতেশামের ‘মৌমাছি’ ছবিতে কাজ করার সময়ই একসঙ্গে আরও তিনটি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন মুনমুন। ছবি তিনটি হচ্ছে ‘আজকের সন্ত্রাসী’, ‘বেঈমানীর শাস্তি’ ও ‘টারজান কন্যা’। শেষ ছবিটি তাঁকে আলোচনায় নিয়ে আসে। এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৯০টি ছবিতে কাজ করা হয়েছে তাঁর। মুনমুন জানালেন, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তাঁরা দুজন জুটি হয়ে চার বছরে এক ডজনের বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন