৬১ বছর বয়সে আমিরের প্রেম–বিয়ে, কে এই গৌরী
বলিউডপাড়ায় নতুন করে আলোচনায় ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ আমির খান। দীর্ঘদিনের প্রেমিকা গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন তিনি—ভারতের একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরে সরগরম চলচ্চিত্র অঙ্গন। খবর অনুযায়ী, আগামী ৫ জুলাই অত্যন্ত ঘরোয়া আয়োজনে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন এই তারকা।
বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে খবরটি নিশ্চিত করলেন অভিনেতা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ভ্যারাইটি ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমির খান জানান, ৫ জুলাই মুম্বাইয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা আমির খান বলেন, ‘বিয়ের খবর সত্যি। ৫ জুলাই আমাদের বিয়ে। এখন আমরা দুজনই মনে করছি, সম্পর্কটিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।’
গুঞ্জনের শুরু
দীর্ঘদিন ধরে আমির খান ও গৌরী স্প্র্যাটের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। তবে ২০২৫ সালের মার্চে নিজের ৬০তম জন্মদিনে প্রথমবারের মতো গৌরীকে প্রকাশ্যে পরিচয় করিয়ে দেন আমির। সেদিনই তিনি জানান, তাঁদের পরিচয় প্রায় ২৫ বছরের পুরোনো। সেই পরিচয় প্রেমে রূপ নিয়েছে অনেক পরে। আমিরের ভাষায়, ‘গৌরী আর আমি হঠাৎ করেই আবার একে অপরের জীবনে ফিরে আসি। বন্ধুত্ব হয়, তারপর ভালোবাসা আসে।’
এর পর থেকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে গৌরীর কথা অকপটে বলেছেন অভিনেতা। সম্পর্কের গভীরতা নিয়েও কখনো রাখঢাক করেননি।
কে এই গৌরী স্প্র্যাট?
দীর্ঘদিন ধরে প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা গৌরী স্প্র্যাট হঠাৎ করেই ভারতের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। তবে এর কারণ শুধু আমির খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নয়, তাঁর নিজস্ব পেশাগত ও পারিবারিক পরিচয়ও কম আগ্রহের বিষয় নয়।
বেঙ্গালুরুতে বেড়ে ওঠা গৌরী স্প্র্যাট পেশায় একজন উদ্যোক্তা ও লাইফস্টাইল–সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী। দীর্ঘদিন তিনি বেঙ্গালুরুর একটি পরিচিত স্যালন ও বিউটি চেইনের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসা পরিচালনা, ব্র্যান্ড উন্নয়ন ও গ্রাহকসেবাভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে তিনি আমির খান প্রোডাকশনের সঙ্গেও যুক্ত আছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির কিছু প্রশাসনিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখছেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে গৌরী এক সন্তানের মা। আগের বিবাহিত জীবনের সাত বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে তাঁর। ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, পরিবার ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধকে তিনি সব সময়ই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখেছেন। সম্ভবত এ কারণেই বিনোদন অঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও তিনি বরাবরই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেছেন।
গৌরীর পারিবারিক শিকড়ও বেশ ব্যতিক্রমী। তাঁর দাদা ফিলিপ স্প্র্যাট ছিলেন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত একজন কমিউনিস্ট চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী। ১৯২০-এর দশকে তিনি ভারতে এসে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ভারতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পরিবারের উত্তরসূরি গৌরী নিজেও বহুসাংস্কৃতিক ও উদার পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছেন।
তবে গৌরীকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তাঁর ব্যক্তিত্ব। আমির খান একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গৌরীর মধ্যে তিনি এমন একধরনের শান্তি, স্থিরতা ও আন্তরিকতা খুঁজে পেয়েছেন, যা তাঁর জীবনের এই পর্যায়ে এসে খুব প্রয়োজন ছিল। আর গৌরীর ভাষায়, তিনি আমিরকে কখনো সুপারস্টার হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন একজন যত্নশীল, মানবিক ও নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে। সম্ভবত এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁদের সম্পর্ককে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
‘আমি এমন একজনকে খুঁজছিলাম, যার কাছে শান্তি পাব’
গৌরীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমির খান বারবার একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘শান্তি’। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি এমন একজন মানুষকে খুঁজছিলাম, যার সঙ্গে আমি শান্তিতে থাকতে পারব। যে আমাকে মানসিক প্রশান্তি দেবে। গৌরীর মধ্যে আমি সেটাই খুঁজে পেয়েছি।’ আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি খুব সৌভাগ্যবান যে গৌরীর মতো একজন মানুষ আমার জীবনে এসেছে। ওর সঙ্গে থাকলে আমি শান্তি অনুভব করি।’ শুধু তা-ই নয়, এ বছরের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘মনে হয়, জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি যেন পূর্ণতা পেয়েছি।’
গৌরীর চোখে আমির
সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর প্রথমবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে গৌরীও নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এমন একজন মানুষ চেয়েছিলাম, যিনি ভদ্র, যত্নশীল এবং মানবিক।’ পাশেই বসা আমির তখন হেসে জবাব দেন, ‘এত কিছু খুঁজে শেষ পর্যন্ত আমাকে পেলে?’ মজার বিষয় হলো, ভারতের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র তারকার প্রেমে পড়লেও আমিরের খুব বেশি সিনেমা দেখা হয়নি গৌরীর । তিনি জানিয়েছেন, আমিরের মাত্র দুটি ছবি—‘লগান’ ও ‘দিল চাহতা হ্যায়’ দেখেছেন।
এ প্রসঙ্গে আমির বলেন, ‘সে আমাকে কোনো সুপারস্টার হিসেবে দেখে না। একজন মানুষ ও সঙ্গী হিসেবে দেখে। সম্ভবত এটাই আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক।’
‘আমার হৃদয়ে আমি ইতিমধ্যেই ওকে বিয়ে করেছি’
গত এক বছরে বিয়ে নিয়ে অনেকবার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন আমির। একসময় তিনি বলেছিলেন, ৬০ বছর বয়সে আবার বিয়ে করা তাঁকে মানাবে কি না, তা নিয়ে তাঁর নিজেরই সংশয় রয়েছে। কিন্তু সম্পর্কের বিষয়ে কখনো দ্বিধা দেখাননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা খুবই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কে আছি। আমার হৃদয়ে আমি ইতিমধ্যেই গৌরীকে বিয়ে করে ফেলেছি। আনুষ্ঠানিকতা হবে কি না, সেটা পরে দেখা যাবে।’
আরেক আলোচনায় আমির বলেন, ‘যখন দুজন মানুষ সত্যিকার অর্থে একে অপরের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তখন কাগজে সই করাটাই বিয়ের একমাত্র অর্থ নয়।’
এক ছাদের নিচে
সম্পর্কের বিষয়ে দীর্ঘদিন নীরব থাকলেও ২০২৬ সালের শুরুতে আমির খান নিজেই জানান, তিনি ও গৌরী স্প্র্যাট একসঙ্গে বসবাস শুরু করেছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি থেকেই মুম্বাইয়ে একই ছাদের নিচে সময় কাটাচ্ছেন তাঁরা। বিষয়টি সামনে আসার পরই বিয়ের গুঞ্জন নতুন মাত্রা পায়।
এক সাক্ষাৎকারে আমির বলেন, ‘গৌরী ও আমি একে অপরের প্রতি খুবই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত সিরিয়াস। আমরা শুধু একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছি না, ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছি।’ তিনি আরও জানান, জীবনের এই পর্যায়ে এসে সম্পর্ককে তিনি অনেক বেশি পরিণত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাই কোনো তাড়াহুড়ো নয়; বরং একে অপরকে আরও ভালোভাবে জানার মধ্য দিয়েই তাঁরা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছেন।
ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, একসঙ্গে বসবাসের সিদ্ধান্ত ছিল তাঁদের সম্পর্কের স্বাভাবিক অগ্রগতি। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া গভীর বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নেন। ফলে তখন থেকেই বলিউডে আলোচনা শুরু হয়—শুধু সহবাস নয়, খুব শিগগির হয়তো সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপও দিতে যাচ্ছেন আমির ও গৌরী। আর জুলাইয়ে সম্ভাব্য বিয়ের খবর সামনে আসার পর সেই জল্পনাই যেন আরও জোরালো হয়েছে।
দুই বিয়ে, দুই বিচ্ছেদ
ব্যক্তিজীবনে এর আগে দুবার বিয়ে করেছেন আমির। ১৯৮৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে রীনা দত্তকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় দুই সন্তান—জুনায়েদ ও ইরা খান। ১৬ বছরের সংসারের পর ২০০২ সালে বিচ্ছেদ হয় তাঁদের। এরপর ২০০৫ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা কিরণ রাওকে বিয়ে করেন আমির। তাঁদের ছেলে আজাদ রাও খান সারোগেসির মাধ্যমে জন্ম নেয়। ২০২১ সালে ১৫ বছরের সেই দাম্পত্যেরও ইতি টানেন তাঁরা। তবে বিচ্ছেদের পরও দুই সাবেক স্ত্রীর সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন আমির। পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব কিংবা সন্তানদের বিভিন্ন আয়োজনে এখনো তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়।
এবার কি সত্যিই নতুন অধ্যায়?
আনুষ্ঠানিকভাবে খবরটি নিশ্চিত করলেন অভিনেতা আমির খান। ৫ জুলাইয়ের অপেক্ষায় এখন ভক্তরা। সত্যিই যদি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন আমির ও গৌরী, তবে ৬১ বছর বয়সে এসে শুরু হবে অভিনেতার জীবনের নতুন এক ইনিংস—যে ইনিংসের নাম হতে পারে শান্তি, স্থিরতা আর নতুন করে ভালোবাসা।