কমিটিই হয়নি, আটকে আছে চলচ্চিত্রের অনুদান
জুনের মধ্যে চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান ঘোষণার চল থাকলেও জুলাই মাসেও ২০২৫–২৬ অর্থবছরের অনুদান কমিটি করতে পারেনি সরকার, ফলে এখনো চিত্রনাট্য বাছাই শুরু হয়নি। খোঁজখবর নিলেন মকফুল হোসেন
অন্তর্বর্তী সরকার অনুদানের জন্য পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রস্তাব আহ্বান করে গত ৮ জানুয়ারি। ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল মেয়াদ। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ৩১ মার্চ। ৩ দফায় প্রায় ২০০ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও দেড় শতাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রস্তাব জমা পড়ে।
সচরাচর জমা পড়ার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে বাছাইয়ের কাজ শুরু করে অনুদান বাছাই কমিটি। প্রতিবছর জুনের মধ্যে অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণা করা হয়। আর এবার জুন পার হয়ে গেলেও অনুদান বাছাই কমিটিই করতে পারেনি সরকার। চলচ্চিত্র অনুদান কমিটিও পুনর্গঠিত হয়নি। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনুদান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনিশ্চয়তায় পরিচালকেরা
অনুদানের বিষয়ে এক সপ্তাহে অন্তত ছয় নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা প্রত্যেকে অনুদানের জন্য প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাছাই শুরু না হওয়ায় তাঁরা প্রত্যেকেই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নির্মাতা জানান, ২৯ জানুয়ারি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রস্তাব জমা দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য এখনো কোনো কমিটিই করেনি সরকার। তাহলে আমাদের সিনেমার ভবিষ্যৎ কী?’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক তরুণ নির্মাতা বলেন, ‘অনুদান কমিটি হলেও আশার আলো দেখতাম। সেটাও হয়নি। অহেতুক কালক্ষেপণ হচ্ছে। এই অর্থবছরের মধ্যে অনুদান ঘোষিত হলো না। কোনো আশা দেখছি না।’
আরেক নির্মাতা জানান, তিনিও জানুয়ারি মাসে চলচ্চিত্রের প্রস্তাব জমা দেন। তবে এখনো মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে কোনো সাড়া পাননি। গত বছর চলচ্চিত্রের প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর তাঁকে পিচিংয়ের জন্য ডাকা হয়েছিল। পরে বাদ পড়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ বছর কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি। কবে বাছাই হবে, পিচিং হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
কমিটি হয়নি
চলচ্চিত্রের অনুদান প্রদানের জন্য বছর বছর অনুদান কমিটি পুনর্গঠন করে সরকার। কমিটিই অনুদানের পুরো বিষয়টি দেখভাল করে। অনুদান নীতিমালা অনুযায়ী পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য আলাদা আলাদা দুটি করে মোট চারটি কমিটি করা হয়। কমিটিগুলো হলো, বাছাই কমিটি ও অনুদান কমিটি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের চলচ্চিত্রের প্রস্তাব দেখভালের জন্য এখনো কোনো কমিটিই পুনর্গঠন করেনি সরকার।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা বলছেন, অনুদান কমিটি পুনর্গঠন না করায় অনুদানপ্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কমিটি পুনর্গঠনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান কমিটি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই কমিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদান ঘোষণা করে। তবে অনুদান পাওয়া সিনেমার কোনোটিই দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পায়নি।
পুরোনো কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে বৈঠক করেছিল অনুদান কমিটি। এরপর আর কোনো বৈঠক হয়নি।
পুরোনো বাছাই কমিটির এক সদস্য বলেন, তাঁদের কমিটি এখনো আছে কি না, জানেন না। নতুন কমিটি পুনর্গঠনের প্রজ্ঞাপন হওয়া পর্যন্ত ওই কমিটি কার্যকর থাকার কথা। তবে নির্বাচনের পর থেকে সেই কমিটি বর্তমানে নিষ্ক্রিয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এক পরিচালক জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুদান কমিটি পুনর্গঠন করা জরুরি ছিল। সেটি না হওয়ায় অনুদানের জট তৈরি হয়েছে।
এই পরিচালক বলেন, ‘নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে (তথ্য ও সম্প্রচার) মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। অনুদান কমিটি করাটা কোনো রকেট সায়েন্স নয়। কমিটিতে সরকারেরই ছয়–সাতজন থাকেন। চার-পাঁচজন ফিল্ম এক্সপার্ট হলেই কমিটি করা যায়। এত দিনেও সেটা করা যায়নি।’
বাছাই কমিটি প্রাথমিকভাবে চলচ্চিত্র বাছাই করে অনুদান কমিটিতে পাঠায়। তারা নির্বাচিত ছবি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্ট লিস্ট) করে। তালিকা ধরে পিচিং সেশনে অংশ নেন পরিচালক ও প্রযোজকেরা। পরে সেখান থেকে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়।
কবে
বিষয়টি নিয়ে জানতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (চলচ্চিত্র) কে এম আবদুল ওয়াদুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে জানান, তিনি চলচ্চিত্র অনুবিভাগে সম্প্রতি এসেছেন। এ বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।
বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (চলচ্চিত্র অধিশাখা) মাহফুজা আখতারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এই অতিরিক্ত সচিব। মাহফুজা আখতারকে ফোন করে পাওয়া যায়নি, হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়েও উত্তর মেলেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গত সোমবার প্রথম আলোকে জানান, কমিটি না হওয়ায় চলচ্চিত্রের প্রস্তাব বাছাইসহ প্রাথমিক কার্যক্রমই শুরু হয়নি।
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, কমিটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করেছে সরকার।