ময়নাতদন্তে রাহুলের মৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাঁর মরদেহ পৌঁছে বিজয়গড়ের বাসভবনেকোলাজ

অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে শোকের মধ্যেই সামনে এসেছে প্রাথমিক ময়নাতদন্তের তথ্য। সেখানে ইঙ্গিত মিলেছে, পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে সোমবার কলকাতায় সম্পন্ন হয়েছে তাঁর শেষকৃত্য। বিজয়গড়ের বাসভবন থেকে কেওড়াতলা মহাশ্মশান পর্যন্ত প্রিয় অভিনেতাকে শেষবিদায় জানাতে ভিড় করেন সহকর্মী, বন্ধু, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
তালসারিতে শুটিং চলাকালে রোববার দুর্ঘটনার পর রাহুলের মরদেহ প্রথমে নেওয়া হয় দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে। পরে তা আনা হয় তাম্রলিপ্ত গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের মর্গে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হয় ময়নাতদন্ত।

হাসপাতাল সূত্রের বরাতে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ময়নাতদন্তে রাহুলের ফুসফুস ও খাদ্যনালিতে বালু ও নোনাপানি পাওয়া গেছে। তাম্রলিপ্ত মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো লিখেছেন, প্রাথমিক ময়নাতদন্তে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরীরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ফুসফুস ও খাদ্যনালিতে বিপুল পরিমাণ বালু ও নোনাপানি জমা ছিল। এমনকি শ্বাসনালিতে বালুর কণার উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, যা সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে ঘটে।

আরও পড়ুন

ময়নাতদন্তে আরও দেখা গেছে, ফুসফুস অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গিয়ে প্রায় দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছিল। চিকিৎসকদের মতে, পানি ও বালুকণার প্রবেশে ফুসফুসের ভেতরে বায়ুথলিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অক্সিজেন আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যায়, যা ডুবে মৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
হাসপাতাল সূত্রের দাবি, শরীরে যে পরিমাণ বালু ও নোনাপানি পাওয়া গেছে, তা থেকে ধারণা করা হচ্ছে—রাহুল দীর্ঘ সময়, অন্তত এক ঘণ্টার বেশি সময় পানির নিচে ছিলেন। এ ছাড়া দেহে বড় ধরনের আঘাতের স্পষ্ট কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা এ ঘটনাকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যুর দিকেই ইঙ্গিত করছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমে শ্বাসরোধ শুরু হয়, এরপর ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে। রাহুলের ক্ষেত্রেও সেই একই শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার লক্ষণ মিলেছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি প্রাথমিক রিপোর্ট; পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময়, পরিস্থিতি ও অন্যান্য দিক আরও পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

আরও পড়ুন

মর্গের সামনে এদিন আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রাহুলের স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রিয় অভিনেতাকে শেষবার দেখতে সেখানে জড়ো হন ভক্তরা। শুধু সাধারণ মানুষই নন, হাসপাতালের নার্সিং ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা যায় শোকের আবহ।

রাহুল অরুণোদয়। ফেসবুক থেকে

ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরের দিকে রাহুলের মরদেহ কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়। বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাঁর মরদেহ পৌঁছে বিজয়গড়ের বাসভবনে। সেখানে আগে থেকেই ভিড় করেন স্থানীয় মানুষ, সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠজনেরা। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা দিয়ে জানান, প্রিয় মানুষটির নিথর দেহের মুখোমুখি হওয়ার শক্তি তাঁদের নেই।

সোমবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে বিজয়গড় থেকে রাহুলের মরদেহ নিয়ে কেওড়াতলা মহাশ্মশানের উদ্দেশে রওনা হন তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধুরা। তবে শ্মশানে পৌঁছানোর পর কিছু সময়ের জন্য বিশৃঙ্খলারও সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, বেছে বেছে শুধু তারকাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল। এ নিয়ে রাহুলের শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন
শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন
কোলাজ

কেওড়াতলায় রাহুলকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন টালিউডের অনেক পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, গৌরব চক্রবর্তী, ঋদ্ধিমা ঘোষ, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, রুকমা রায়, অঙ্কুশ হাজরা, রুদ্রনীল ঘোষ ও ইন্দ্রাশিস আচার্য। এর আগে বিজয়গড়ের বাসভবনেও উপস্থিত ছিলেন আবির চট্টোপাধ্যায়, রূপম ইসলামসহ আরও অনেকে। পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যক্তিগত পরিসরেই সম্পন্ন করা হয় শেষকৃত্য। ছেলের হাতের অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে চিরবিদায় নেন অভিনেতা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত পছন্দের নানা চিহ্নও ছিল শেষযাত্রায়। তাঁকে লাল সালাম জানান বামপন্থী নেতা-কর্মীরা। লাল পতাকায় মোড়া হয় শববাহী গাড়ি। ইস্ট বেঙ্গল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে পরিচিত রাহুলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশও দেখা যায় ভক্তদের মধ্যে।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু টালিউড অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। সহকর্মীরা বলছেন, তিনি শুধু জনপ্রিয় অভিনেতাই নন, ছিলেন আপন মানুষও। তাই তাঁর বিদায়ে শোক ছড়িয়ে পড়েছে শিল্পীসমাজ থেকে সাধারণ দর্শকের মনেও।