যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ, প্রতিবাদে অস্কার নেননি যে পরিচালক
জাপানি অ্যানিমে শব্দটা শুনলেই যে নামটি সবার আগে মনে পড়ে, তিনি হলেন হায়াও মিয়াজাকি। ভালোবেসে অনেকেই তাঁকে ‘জাপানের ওয়াল্ট ডিজনি’ বলেন। আজ ৫ জানুয়ারি, কিংবদন্তি অ্যানিমেটর হায়াও মিয়াজাকির জন্মদিন। ৮৫ বছর বয়সে পা রাখা এই শিল্পীর জীবন কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
স্টুডিও জিবলির সূচনা
মিয়াজাকির জীবনের এক বড় অংশজুড়ে রয়েছে উড়োজাহাজ আর আকাশ। তাঁর বাবা যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার পরিচালক ছিলেন, যা মিয়াজাকির মনে ওড়ার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করে। এই ভালো লাগা থেকেই তিনি তাঁর স্টুডিওর নাম রাখেন জিবলি। এটি একটি লিবীয়-আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘মরুভূমির তপ্ত বাতাস’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক ইতালীয় বিমানের নামও ছিল এটি। মিয়াজাকি চেয়েছিলেন জাপানি অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রিতে (যা তখন অনেকটা গৎবাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল) নতুন এক বাতাসের ঝাপটা নিয়ে আসতে। এই রূপকটি তাঁর খুব পছন্দ হয় এবং তিনি তাঁর প্রিয় সেই বিমানের নামেই স্টুডিওর নাম রাখেন। মিয়াজাকি চেয়েছিলেন তাঁর স্টুডিও জাপানি অ্যানিমেশন–শিল্পে এক নতুন বাতাসের ঝাপটা নিয়ে আসবে, যা শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
১৯৮৫ সালে পরিচালক হায়াও মিয়াজাকি ও ইসাও তাকাহাতা, সঙ্গে প্রযোজক তোশিও সুজুকি—এই তিনজনের হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে স্টুডিও গিবলি। অ্যানিমেশন ও গল্প বলার দুনিয়ায় এই স্টুডিও এমন এক ছাপ রেখে গেছে, যা মুছে যাওয়ার নয়। সেই সময়কার প্রচলিত অ্যানিমেশনের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্ন স্বাদের ছবি বানানোর আকাঙ্ক্ষাই ছিল এই স্টুডিওর জন্মের মূল প্রেরণা।
জিবলি নামের উচ্চারণ নিয়ে মজার ঘটনা
জিবলি শব্দটি ইতালীয় উচ্চারণে ‘গিবলি’ হলেও, মিয়াজাকি যখন নামটি নিবন্ধন করেন, তখন তিনি এর জাপানি উচ্চারণ করেন ‘জি-ব্লি’। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘গিবলি’ নামে পরিচিত হলেও জাপানে ভক্তদের কাছে এটি ‘জিবলি’ নামেই জনপ্রিয়।
পড়াশোনা করেছেন অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে
শৈশব থেকেই অ্যানিমেটর হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও মিয়াজাকি বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি টোকিওর গাকুশুইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুসাহিত্য গবেষণা ক্লাবে সক্রিয় ছিলেন।
প্রথম সিনেমা ও সাফল্য
স্টুডিওটি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৬ সালে তারা প্রথম সিনেমা হিসেবে মুক্তি দেয় ‘ক্যাসল ইন দ্য স্কাই’। এরপর ১৯৮৮ সালে ‘মাই নেইবার তোতোরো’ মুক্তির পর জিবলি একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত হয় এবং তোতোরো চরিত্রটি স্টুডিওর লোগো হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
চিত্রনাট্য ছাড়াই কাজ!
মিয়াজাকি যখন কোনো সিনেমা বানানো শুরু করেন, তখন তাঁর কাছে কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য থাকে না। তিনি সরাসরি স্টোরিবোর্ড (একধরনের স্কেচ) আঁকা শুরু করেন এবং কাজ চলাকালীন গল্পটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘আমরা জানি না সিনেমাটি কোথায় গিয়ে শেষ হবে, আমরা শুধু কাজ চালিয়ে যাই।’ মিয়াজাকির মতে, যদি তিনি আগেই জানতেন সিনেমাটি কীভাবে শেষ হবে, তবে সেই সিনেমা বানানোর রোমাঞ্চই হারিয়ে যেত। তাই দর্শকদের জন্য তাঁর প্রতিটি সিনেমাই এক অজানা গন্তব্যে যাওয়ার রোমাঞ্চকর জার্নি হয়ে ওঠে।
হাতে আঁকা প্রথাগত অ্যানিমেশন
বর্তমান সময়ে ডিজনি বা পিক্সারের মতো বড় স্টুডিওগুলো যখন পুরোপুরি থ্রিডি বা কম্পিউটার অ্যানিমেশনের ওপর নির্ভরশীল, স্টুডিও জিবলি সেখানে হাতে আঁকা পদ্ধতিতে কাজ করে। তারা মনে করে, মানুষের হাতের ছোঁয়ায় যে আবেগ ফুটে ওঠে, কম্পিউটারে তা সম্ভব নয়। যদিও তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সিজিআই ব্যবহার করলেও তা সিনেমার মোট ফ্রেমের ১০ শতাংশের বেশি হয় না। তাদের সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো অনেকটা জলরঙের পেইন্টিংয়ের মতো মনে হয়।
মিয়াজাকি মনে করেন, মানুষের হাতের ছোঁয়ায় যে আবেগ ফুটে ওঠে, তা কম্পিউটারে সম্ভব নয়। তিনি নিজে হাতে প্রতিটি ফ্রেম পরীক্ষা করেন এবং প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিজেই আঁকেন। ‘দ্য উইন্ড রাইজেস’ সিনেমার সময় তিনি প্রায় এক লাখ ফ্রেম নিজে এঁকেছিলেন বলে জানা যায়। এই অবিশ্বাস্য ধৈর্য এবং নিখুঁত কাজের প্রতি ভালোবাসা জিবলির প্রতিটি দৃশ্যকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
মৌলিকত্বের ব্যাপারে আপসহীনতা
স্টুডিও জিবলি তাদের সৃষ্টির মৌলিকত্বের ব্যাপারে কোনো আপস করে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বিখ্যাত হলিউড প্রযোজক হার্ভে ওয়াইনস্টিনের সঙ্গে ঘটা একটি আলোচিত ঘটনা। ১৯৯৭ সালে ‘প্রিন্সেস মনোনোকে’ যখন যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির প্রস্তুতি চলছিল, তখন ওয়াইনস্টিন সিনেমাটির দৈর্ঘ্য কমানোর জন্য কিছু দৃশ্য কাটার প্রস্তাব দেন। জিবলির দীর্ঘদিনের প্রযোজক তোশিও সুজুকি এর প্রতিবাদে তাকে একটি আসল সামুরাই তলোয়ার (কাতানা) পাঠান। তলোয়ারের সঙ্গে একটি ছোট্ট চিরকুট ছিল, যেখানে লেখা ছিল— ‘নো কাটস’ (কোনো কাটছাঁট নয়)। এই কঠোর অবস্থানের কারণেই জিবলির সিনেমাগুলো সারা বিশ্বের দর্শক ঠিক সেভাবেই দেখতে পায়, যেভাবে নির্মাতারা চেয়েছিলেন।
প্রযুক্তির প্রতি অনীহা
মিয়াজাকি আধুনিক প্রযুক্তির চেয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা বেশি পছন্দ করেন। তিনি স্মার্টফোন বা আইপ্যাড ব্যবহারের খুব একটা পক্ষপাতী নন। এমনকি তিনি একবার বলেছিলেন, ‘মানুষ এখন অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা তাদের সৃজনশীলতা ও চারপাশের সৌন্দর্য দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।’ তিনি তাঁর ‘পোনিও’ সিনেমায় এমন এক মা ও শিশুর গল্প দেখিয়েছেন, যারা প্রযুক্তি ছাড়াই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে।
যুদ্ধ নয়, শান্তি
১৯৪১ সালে জন্ম নেওয়া মিয়াজাকির শৈশব কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা দেখে। সেই ট্রমা তাঁর অধিকাংশ সিনেমার মূল দর্শনে প্রভাব ফেলেছে। তাঁর সিনেমায় সব সময়ই যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং প্রকৃতির সপক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা থাকে। এ ছাড়া তাঁর সিনেমার নায়িকারা ভঙ্গুর চরিত্রের না হয়ে সাহসী এবং স্বাবলম্বী হয়। ‘কিকিস ডেলিভারি সার্ভিস’ থেকে শুরু করে ‘প্রিন্সেস মনোনোকে’—প্রতিটি সিনেমাতেই তিনি নারীর অন্তর্নিহিত শক্তিকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অস্কার বর্জন
মিয়াজাকির জীবনের সবচেয়ে আলোচিত এবং সাহসী অধ্যায়টি হলো তাঁর ২০০৩ সালের ‘অস্কার বর্জন’। সে বছর তাঁর মাস্টারপিস ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ সেরা অ্যানিমেটেড ফিচারের পুরস্কার জেতে। এটি ছিল জাপানি অ্যানিমেশন বা অ্যানিমে জগতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ, এটিই ছিল প্রথম হাতে আঁকা বিদেশি ভাষার সিনেমা, যা এই সম্মান পায়। কিন্তু সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল, অস্কারের সেই জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে মিয়াজাকি অনুপস্থিত। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সবাই ধারণা করেছিল যে তিনি হয়তো বয়সের কারণে বা ব্যস্ততার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যাননি।
বহু বছর পর তিনি প্রকাশ করেন যে সেটি কোনো অবহেলা ছিল না, ছিল একটি জোরালো প্রতিবাদ। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল। শান্তিবাদী মিয়াজাকি এমন এক দেশে পুরস্কার নিতে যেতে চাননি, যারা অন্য একটি দেশে বোমা ফেলছিল। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, একজন শিল্পীর কাছে তাঁর মানবিক আদর্শ ও নৈতিকতা একটি পুরস্কারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
অন্যান্য স্বীকৃতি এবং অস্কার
যদিও ২০০৩ সালে তিনি অস্কারে যাননি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে একাডেমি এবং মিয়াজাকির সম্পর্কের উন্নতি হয়। ২০১৪ সালে মিয়াজাকির অবদানের জন্য সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করা হয়। এই পুরস্কারটি নিতে তিনি সশরীর লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের অস্কারে তাঁর সর্বশেষ সিনেমা ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন’ আবারও সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন সিনেমার পুরস্কার পায়। মজার বিষয় হলো, এবারও তিনি বা স্টুডিও জিবলির কেউ অনুষ্ঠানে সশরীর উপস্থিত থেকে ট্রফি গ্রহণ করেননি। তবে এবার সেটি ছিল মূলত প্রচারবিমুখতা এবং বয়সের কারণে। এ ছাড়া তিনি বার্লিন উৎসবে স্বর্ণ ভালুক ও র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
বারবার অবসর গ্রহণ আর ফিরে আসা
হায়াও মিয়াজাকির ক্যারিয়ারের মাজার ঘটনা হলো বারবার অবসর নেওয়া আর ফিরে আসা। অনেক ভক্ত তো মজা করে একে ‘মিয়াজাকির রিটায়ারমেন্ট সাইকেল’ বলে থাকেন। কারণ, হায়াও মিয়াজাকি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেকবার অবসরের ঘোষণা দিলেও কাজের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার কারণে প্রতিবারই ফিরে এসেছেন। ১৯৯৭ সালে ‘প্রিন্সেস মনোনোকে’ এবং ২০১৩ সালে ‘দ্য উইন্ড রাইজেস’ নির্মাণের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের কথা জানিয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিবারই নতুন কোনো গল্প বা আইডিয়া তাঁকে আবারও স্টুডিওতে ফিরিয়ে এনেছে। ২০২৪ সালে ৮৩ বছর বয়সে ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন’ সিনেমার জন্য অস্কার জয়ের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে সৃজনশীলতার কোনো বয়স নেই। ৮৫ বছর বয়সেও তিনি নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করে চলেছেন।
জাপানি অ্যানিমে চলচ্চিত্রে স্টুডিও জিবলির অবদান
জাপানের বক্স অফিস এবং বিশ্বব্যাপী আয়ের তালিকায় তাকালে দেখা যায়, সর্বকালের সেরা ১৫টি সর্বোচ্চ আয়কারী অ্যানিমে চলচ্চিত্রের একটি বড় অংশই জিবলির দখলে। নিচে জিবলির বিখ্যাত ৭টি চলচ্চিত্রের তালিকা দেওয়া হলো, যা আয়ের দিক থেকে ইতিহাস গড়েছে—
১. ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ (২০০১)
এটি জিবলির সবচেয়ে সফল সিনেমা। প্রায় ১৯ বছর ধরে এটি জাপানে নিজের রেকর্ড অক্ষত রেখেছিল (পরবর্তী সময়ে ‘ডেমন স্লেয়ার’ এটি ভেঙে দেয়)। বিশ্বজুড়ে এটি প্রায় ৩৯৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
২. ‘হাওলস মুভিং ক্যাসেল’ (২০০৪)
বিশ্বজুড়ে এর আয় ছিল প্রায় ২৩৬ মিলিয়ন ডলার।
৩. ‘পোনিও’ (২০০৮)
ছোটদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে।
৪. ‘প্রিন্সেস মনোনোকে’ (১৯৯৭)
এই সিনেমাই প্রথম জিবলিকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে। জাপানের বক্স অফিসে এটি তৎকালীন সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল।
৫. ‘দ্য উইন্ড রাইজেস’ (২০১৩)
হায়াও মিয়াজাকির ব্যক্তিগত জীবনের দর্শনে অনুপ্রাণিত এই সিনেমাটি জাপানে ব্যাপক ব্যবসা করে।
৬. ‘দ্য সিক্রেট ওয়ার্ল্ড অব অ্যারিয়েটি’ (২০১০)
এটি মিয়াজাকি পরিচালিত না হলেও (পরিচালক: হিরোমাসো ইয়োনেবায়াশি) জিবলির ব্যানারে ব্যাপক সাফল্য পায়।
৭. ‘টেলস ফ্রম আর্থসি’ (২০০৬)
সমালোচকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও আয়ের বিচারে এটি জাপানের সেরা ১৫টি সিনেমার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।
এন্টারটেইনমেন্ট উইকলি, আইএমডিবি অবলম্বনে