default-image

২০১২ সালের ডিসেম্বরে চারটি কমিকসের পাণ্ডুলিপি পেনড্রাইভে নিয়ে মিরপুরগামী বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আর তখন কয়েকটি অদ্ভুত চিন্তা মাথায় ঘুরছে। আমার তো দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অনার্সে আচমকা একটা পাতে তোলার মতো ভালো রেজাল্ট চলে আসায় এই ‘বিপত্তি’। রেজাল্ট খারাপ হলে কিছু সুবিধাও আছে; একটা হলো—কী করতে হবে তা নিশ্চিত হয়ে যাওয়া। সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই, ফাইট দিতেই হবে। আবার খুব ভালো রেজাল্ট হলেও চিন্তাটা নেই; ক্যারিয়ার অবধারিতভাবে একাডেমির আঙিনায় ঠিকানা খুঁজে নেবে। কিন্তু ‘মোটামুটি ভালো’ হলে এক প্যারাডক্সের সামনে পড়তে হবে।

আমাদের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের জন্য ইউরোপের লোভনীয় সব বৃত্তি বসে আছে। একটু খাটুনি করতে পারলে বেশ ভালো কিছু বৃত্তি পাওয়া সম্ভব। আর রেজাল্ট ভালো হলে চাই কি উত্তরের হিম হিম দেশগুলোতে আজীবনের জন্য থেকেও যাওয়া যাবে। মাঝেমধ্যে উইকেন্ডে হিমশীতল পরিবেশে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে লিখে ফেলা যাবে ‘দেশে কিছু হচ্ছে না’ টাইপের স্ট্যাটাস। বন্ধুবান্ধবের মধ্যে যাদের চাকরির বেশি দরকার, তারা ঢুকে যাচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপার এনজিও প্রতিষ্ঠানে। আরেক দল বসে গেছে সোনার হরিণ বিসিএসের প্রস্তুতিতে। ওদিকে আবার তখন তখনই বাংলাদেশ সরকার পৌরসভাগুলোতে চালু করেছে প্ল্যানার পোস্ট। বড় ভাইয়েরা মাঝেমধ্যেই ফোন করে সেখানে ঢুকে যেতে বলছেন।

যদিও ওই সময়ই কার্টুন সেক্টরে আমার ক্যারিয়ার ১৫ বছরের। তারপরও এসব দেখেশুনে একটু দ্বিধায় পড়ে গেছি। কার্টুন আঁকতে ভালো লাগে। আঁকতে আঁকতে ‘উন্মাদ’ ম্যাগাজিনে পাকাপোক্ত হয়ে গেছি। পলিটিক্যাল কার্টুন এঁকে রীতিমতো ‘চাকরি’ করছি ‘ডেইলি নিউ এজ’ পত্রিকায়। তারপরও কার্টুন-কমিকসই হবে আমার ক্যারিয়ার—এটা ঠিক গুরুত্বের সঙ্গে ভাবিনি। হলে ভালো, না হলেও ক্ষতি নেই—এমন একটা ব্যাপার ছিল। তাই হঠাৎ করে সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসায় একটা দোনোমনা পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। নিশ্চিত এলিট ঘরানার ক্যারিয়ারের জন্য সময় না দিয়ে এই মুহূর্তে বরং গোটা চারেক কমিকস বই ছাপানোর জন্য কী করা যায় তা নিয়ে কথা বলতে হালকা কুয়াশাঘেরা ঢাকায় মিরপুরগামী একটা লোকাল বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। গন্তব্য ‘উন্মাদ’ অফিস।

default-image

জীবনের আরও অনেক কিছুর মতো এই জটিলতা নিয়েও আলোচনার জন্য আমাদের একজনই আছেন—কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব। আহসান ভাই সবকিছু শুনেটুনে যা বললেন, আমার মনে হয় এটা সবার সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। তিনি বললেন—

একটা নতুন কিছু করা উচিত। আমার কাছে অনেক তরুণ আসে, ‘উন্মাদ’ নিয়ে একটা কিছু করতে চায়। আমার খুবই হাস্যকর লাগে। ‘উন্মাদ’ নিয়ে নতুন কিছু করার নাই তো! এটায় একজন তরুণ এফোর্ট দিয়ে এমন কী করে ফেলবে? তার চেয়ে তার এই এফোর্টটা নতুন কিছুতে কেন দেয় না? শুরু করো, কী আর হবে? বড়জোর ফেইল করবা। আমি আমার লাইফে কত কিছুতে ফেইল করছি। কিন্তু আমাদের সময়ে আমরা ‘উন্মাদ’ করেছি, সেটায় আমি লেগে ছিলাম। তখন কি কোনোভাবে ভেবেছি যে এটা এমন একটা জায়গায় আসবে? আমাকে কেউ চিনবে? এসব ভাবলে আর কাজ করা হতো না। নিজের আনন্দে কাজ করে গেছি। লেগে থেকেছি। শুরু করো, লেগে থাকো—একটা কিছু হবেই।
আহসান হাবীব, কার্টুনিস্ট ও ‘উন্মাদ’ সম্পাদক

এতই সহজ? ভেবে দেখলাম, আসলেই তা–ই। বিখ্যাত লেখকদের যে একটা খুব কমন গল্প শোনা যায়—তাঁদের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকেরা ফিরিয়ে দিচ্ছে একের পর এক। তাঁদের যদি একজন আহসান হাবীব থাকতেন, তবে আমি নিশ্চিত আরও অনেক নতুন লেখকের জন্ম হতো। বসের (আহসান হাবীব) কাছ থেকে এই কথাগুলো শুনেই আমার দ্বিধা চলে গেল। আসছে বইমেলায় ধারদেনা করে নিজেই ছাপিয়ে ফেলব চারটা কমিকসের বই, থাকবে ‘উন্মাদের’ স্টলে। খুব বেশি চিন্তা করার আর কিছু নেই। প্রেস ও প্রোডাকশনজনিত যাবতীয় আলোচনার জন্য ত্বরিতগতিতে মিটিং সেরে ফেললাম স্থপতি কনক ভাইয়ের সঙ্গে। এর একটা বড় কারণ হলো তাঁর সুবাদে প্রেসে একটা ছোটখাটো বাকি রেখে বই ছাপিয়ে নেওয়া যাবে। বিক্রির টাকা থেকে প্রেসের বিলটা শোধ করা হবে মেলার পরেই।

বিজ্ঞাপন

২০১৩ সালের বইমেলা

default-image

মহা উত্তেজিত হয়ে প্রথম চারটি কমিকস নিয়ে আমরা প্রেসে দিয়ে এলাম। এখন খালি বইমেলা শুরুর অপেক্ষা। কিন্তু না, জীবন যে ফুলশয্যা নয় তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। জানা গেল, ২৭ বছর পর এই প্রথম বইমেলায় ‘উন্মাদ’ কোনো স্টল পাচ্ছে না। কারণ, হঠাৎ করে কর্তৃপক্ষের মনে হয়েছে, এটা তো বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নয়; তবে বইমেলায় কেন থাকবে? এত দিন ছিল তা থাকুক, কিন্তু আর নয়। ‘উন্মাদ’ স্টল পাচ্ছে না, এই কষ্টের সঙ্গে আমাদের কমিকস আঁকিয়েদের মাথায় আরও যোগ হলো যে আমাদের প্রকল্পও মাঠে মারা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে চিমসা মেরে গেলাম। চারটি কমিকস নিয়ে যে প্রথম বছর নিজেরাই স্টল নিয়ে নেব, সে সম্ভাবনাও নেই। কী করব বুঝে উঠতে না পেরে আবারও সেই কুয়াশাঘেরা ঢাকায় মিরপুরগামী বাস ধরা, আবারও আমাদের সবার ‘বস’ আহসান হাবীবের কাছে যাওয়া। তিনি আমাদের মুষড়ে পড়া দেখে একটা কড়া ঝাড়ি লাগালেন। বললেন, ‘তার মানে বাংলাদেশে কমিকস হবে কি না হবে তা নির্ভর করছে “উন্মাদ”–এর স্টল পাওয়ার ওপর? আমরা স্টল না পেলে তোমরা কমিকস করবে না, এটা কেমন কথা? শুরু করে দাও। চেনাজানা কারও স্টলে দিয়ে দাও। কেউ না রাখলে এমনি সেল করো (বলে রাখা ভালো, তখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রিবাটার সংস্কৃতি চালু হয়নি), বইয়ের দোকানে দাও।’

যেই কথা সেই কাজ। এবং আসলেই ব্যাপারটা আগে ওভাবে মাথায় আনিনি। আমাদের কমিকস তো কোনো এক বছরের একটা স্টল পাওয়া না পাওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। নাহয় আমাদের কোনো অফিস নেই, পকেটে টাকা নেই, স্টল নেই, দোকান নেই; কিন্তু কমিকসগুলো তো আছে! আর সেটাই তো দরকার। আমাদের প্রথম কমিকসগুলো ছাপতে দিলাম নীলক্ষেতের নীরব প্রিন্টার্সের সদাহাস্যমুখী কালাম ভাইয়ের কাছে। যথাসময়ে প্রিন্ট বের হলো। মেলার আর মাত্র কদিন বাকি, আমার বইয়ে কিছু ভুল শোধরানোর কাজ বাকি ছিল। তাই মেলার প্রথম সপ্তাহে বের হলো আরাফাত করিমের ‘সি কে জাকি’ আর সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়ের ‘ব্যাকবেঞ্চার্স ক্লাব’।

উত্তাল সময়ে

default-image

২০১৩ সালের মতো এত ঘটনাবহুল বছর সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ দেখেনি। তার মধ্যে প্রথম অভূতপূর্ব ঘটনাটা ছিল শাহবাগের গণজাগরণ। মনে আছে, কমিকস কোথায় কোথায় দেওয়া যায়, তা নিয়ে কথাবার্তা বলে ফেরার পথে ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ মোড়ে জনা দশেক মানুষের একটা অবস্থান প্রতিবাদ দেখে এসেছিলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাঁদের বক্তব্যও শুনে এসেছিলাম। মনে হয়েছিল, এভাবে কি আসলে এই আন্দোলন এগোবে? কত আন্দোলনই তো এভাবে শুরু হয়। কিন্তু তারপরের ইতিহাস তো আর কাউকে বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না। তো আমাদের ঢাকা কমিকসের সেই প্রথম যাত্রার সময়টা এ রকম একটা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গেল। ওদিকে প্রকাশকেরা মিন মিন করে বলার চেষ্টা করছেন, এর ফলে ব্যবসা ধরা খাচ্ছে, মানুষ আসতে পারছে না। কিন্তু ঢাকা কমিকসের আর্টিস্টদের সেটা মাথায় আসার কোনো কারণই নেই। কারণ, তাঁরা প্রায় সবাই-ই তখন শাহবাগ মোড়ে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম। নিয়মিত আঁকছেন কার্টুন আর প্রতিবাদী পোস্টার। কোথায় কমিকস কোথায় কী!

বন্ধুপ্রতিম কয়েকজনের স্টলে আমাদের কমিকসের বইগুলো দিয়ে এসেছি; ওই পর্যন্তই। কয়টা বিক্রি হলো বা না হলো, তা নিতান্তই অবান্তর চিন্তা। এর ফাঁকে শাহবাগেই দেখা হয়ে গেল অগ্রজপ্রতিম ও বাংলাদেশের কমিকস নিয়ে প্রথম নিবেদিত প্রকাশনীর স্রষ্টা তারিকুল ইসলাম শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে। খেয়াল করলাম, আন্দোলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কমিকস নিয়েও শান্ত ভাই রোমাঞ্চিত। দেখেই বললেন, ‘মেহেদী, দারুণ হইছে! এইবার ভালো হবে, বুঝলা? এদ্দিন একা একা ফাইট দিছি। তোমরা আসলে ভালো হবে।’

দুঃখজনক হলো, সেটাই ছিল শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। শাহবাগের সেই মিছিলেই স্লোগানরত অবস্থায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে শান্ত ভাই চিরকালের মতো বিদায় নেন। কমিকস নিয়ে এই মানুষটার সঙ্গে আর বসা হলো না।

যাহোক, উত্তাল সময়ে মাঝেমধ্যে আমরা দল বেঁধে চলে যাই স্টলগুলোতে। একেবারেই বিনা শর্তে সে সময় বেশ কিছু প্রকাশনা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বর্ষাদুপুরের প্রকাশক মাশফিক ভাই, শুভ্র প্রকাশের রতন ভাই, ছোটদের কাগজের শাহীন ভাই, আদর্শ প্রকাশনী, প্রগতি প্রকাশনী। আর ‘উন্মাদ’কে স্টল না দিলেও আহসান ভাইয়ের যে আরেকটি প্রকাশনী—দিনরাত্রি, সেটি স্টল পেয়ে গিয়েছিল। সুতরাং নিজেদের যে কোনো স্টলই নেই, এই দুঃখ কিছুটা ঘুচল। এবং একের পর এক অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে বাড়িয়ে দেওয়া হলো সহায়তার হাত। যেচে পড়ে রিভিউ করে দিলেন সংবাদমাধ্যমের বন্ধুরা। একাত্তর টিভির পার্থ দা (পার্থ সঞ্জয়) বইমেলা নিয়ে করা অনুষ্ঠানে আমাদের কমিকস নিয়ে বললেন। ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, সমকাল আর আমার নিজের পত্রিকা নিউ এজ—সব জায়গায় বের হলো বই পরিচিতি ও আলোচনা। ঢাকার বিখ্যাত কমিকসের দোকান জামিল’স কমিকসের জামিল ভাই ডেইলি স্টারের ক্রোড়পত্র রাইজিং স্টারে লিখলেন রিভিউ। সোজা কথা আমরা যা ভাবতেও পারিনি, তা–ই হলো। আমরা টের পেলাম, এই কাজে আমরা একা নই। সবাই এটাকে একেবারে নিজেদের করে ভাবছে। এটা একটা বিরাট পাওয়া।

প্রকাশনা ব্যবসা হিসেবে ঢাকা কমিকস শুরু করিনি আমরা। এবং অন্যরাও কেউ এটাকে প্রকাশনা ব্যবসা হিসেবে দেখছে না। এটাকে ‘বাংলাদেশের কমিকস’ হিসেবেই সবাই দেখছে। বিনা চেষ্টায় মানুষের মনে আমরা ব্যাপারটা পুরে দিতে পেরেছি যে ঢাকা কমিকস আমাদের। এই অসাধারণ ব্যাপারটা আমাদের যাবতীয় হতাশা ও দুর্ভোগের অভিজ্ঞতা ভুলিয়ে দিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম উত্তাল সময়ের মধ্যেও তাই আমাদের কমিকস আশাতীত সাড়া ফেলল। আমরা সবার কাছেই কৃতজ্ঞ। পুরো প্রকল্প দেখে আহসান হাবীব সবচেয়ে খুশি, নগদ টাকায় তিনি কপি কিনে নিলেন। কথা দিলেন, পরবর্তী প্রডাকশনেই তাঁর নিজের একটি কমিকস আমরা পাব!

default-image

তারপর দেখতে দেখতে কার গল্প নিয়ে আমরা কাজ করিনি? আহসান হাবীব তো আছেনই আমাদের ওপর ছায়া হয়ে। তারপর কাজী আনোয়ার হোসেন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং মাঝে হুমায়ূন আহমেদের ছোট কমিকস সংকলন। আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন কত অসাধারণ প্রতিভাবান কার্টুনিস্ট কাম কমিকস আঁকিয়ে। ‘দুর্জয়’ সিরিজ নিয়ে আছেন তৌহিদুল ইকবাল সম্পদ, ‘জুম’ নিয়ে সব্যসাচী চাকমা, ‘ইব্রাহীম’ সুপারহিরো নিয়ে লেখক হিসেবে তানজিম-উল-ইসলাম, আঁকিয়ে এড্রিয়ান অনীক, ‘সি কে জাকি’ সিরিজের আরাফাত করিম, ‘রিশাদ’, ‘জিতু’ আর তার ব্যাগের পোষা ভূত নিয়ে ছিল দুর্দান্ত আঁকিয়ে আসিফ। ‘লুঙ্গিম্যান’ নিয়ে রোমেল বড়ুয়া। ‘নিহিলিন ক্লাব’ আর ‘পিশাচ কাহিনি’ নিয়ে আমি। সত্যি বলতে আমরা যখন শুরু করি, তখন জানতাম না বাংলাদেশে এত এত প্রতিভাবান কমিকস আঁকিয়ে আছেন। এদিকে নিয়মিত সব অনলাইন কমিকস–কার্টুন প্রতিযোগিতা থেকে যোগ দিচ্ছে টগবগে তরুণ আরেকটা কমিকস আঁকিয়ে ও গল্প বলিয়ের দল। গল্পকথনে যারা আরও দুর্দান্ত, আঁকাআঁকিতে চৌকস। বাংলা কমিকসের ভবিষ্যৎ তাই আরও অনেক উজ্জ্বল।

বিজ্ঞাপন

কলকাতা ও নারায়ণ দেবনাথ কমিকস পুরস্কার

default-image

২০১৩ সালে ঢাকা কমিকস শুরুর পর কেটে গেল দুই বছর। প্রথম বইমেলাতেই আমাদের প্রায় সব কপি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর সব মিলে চনমনে মেজাজে আছি। আরও বেশ কিছু কমিকস চলে এসেছে বাজারে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আমাদের পাঠকসমাজ। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন কলকাতার বুক ফার্ম প্রকাশনীর শান্তনু ঘোষ। কী ব্যাপার? ব্যাপার হলো প্রবাদপ্রতিম কমিকস–শিল্পী, ‘নন্টেফন্টে’র স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথের নামে তাঁরা প্রতিবছর একটা কমিকস পুরস্কার চালু করেছেন। এবং সেই পুরস্কার হাতে তুলে দেন প্রায় শতবর্ষী নারায়ণ দেবনাথ স্বয়ং! এবং এ বছর (২০১৬ সালে) পুরস্কারটি যৌথভাবে পেতে যাচ্ছে ঢাকা কমিকস ও কলকাতার কমিকস-শিল্পী সায়ান পাল। আমরা শুনে বাক্যহারা। এ রকম কিছু হবে ভাবিনি। আর এই পুরস্কার তো আসলে শুধু ঢাকা কমিকসের নয়, এটা আমাদের সবারই। যে ‘নন্টেফন্টে’, ‘বাঁটুল দ্য গ্রেট’ পড়ে আমরা বড় হয়েছি, সেই সিরিজের স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথের হাত থেকে নেওয়া হবে এই পুরস্কার! অবশ্যই এটা এক বিরাট প্রাপ্তি। কলকাতায় যখন তাঁর হাত থেকে পুরস্কারটা নিচ্ছি, তখন সত্যিই মনে হচ্ছিল বাংলাদেশি কমিকস শুধু দেশের সীমানায় আর আটকে থাকার নয়। এর সঙ্গে যখন পশ্চিমবঙ্গের সচেতন পাঠকদের থেকেও ভূয়সী প্রশংসা জুটল, তখন আমরা জেনে গেলাম, এটা শুধু বাংলাদেশেরই কমিকস নয়। এটার মূল শক্তি হলো—বাংলায় কমিকস।

কথা হলো বাংলায় কমিকস তো আগেও হয়েছে; তাহলে? প্রথমত কমিকসে একেবারে মৌলিক গল্প বলে ফেলা আগে বেশ কষ্টকর ছিল। ঝানু প্রকাশকদের অনেকেই যেহেতু এর বাজার নিয়ে সন্দিহান; তাঁদের মতে হাসির কমিকস না হলেও তা চলবে না। কিংবা কমিকস তো ছোটদের, সেটা বড়দের জন্য করলে ঠিক হবে কি না...। এসব যুক্তি–চিন্তা যেহেতু আমাদের ছিল না, তাই আমাদের হারানোরও কিছু ছিল না। ফলে একেবারে নিজেদের যেমন ইচ্ছা, তেমন করে গল্প বলেছি। এবং সেটা প্রমাণ করেছে যে এরও একটা বেশ বড় পাঠক আছে। ফলে এটা বাংলা ভাষার সব কার্টুন-কমিকস আঁকিয়েদের দারুণ উৎসাহ দিয়েছে। আর দ্বিতীয়ত আমাদের উঠতি পপ আর্টপ্রেমী তরুণেরা যেমন কেবল পশ্চিমের দিকেই তাকিয়ে থাকত এবং নিজেদের দেশের কাজগুলোকে অবজ্ঞা করত, তারা আমাদের কাজ ও প্রোডাকশন দেখে নড়েচড়ে বসেছে। এই দুটো বিষয় (যা আমরা মোটেও ভেবেচিন্তে করিনি) আমাদের একটা আলাদা অবস্থান করে দিয়েছে।

বর্তমানে

default-image

২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে এই ২০২০ সালের ডিসেম্বর—আমাদের অর্জন বলি, অভিজ্ঞতা বলি, কোনোটাই একেবারে কম নয়। প্রতিবছর বইমেলায় ঢাকা কমিকস নিজের স্টল নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকে। সামনে আগ্রহী শিশু-কিশোর আর তরুণদের জটলা থেকেই সাড়াটা টের পাওয়া যায়। সেই চারটি কমিকস থেকে শুরু করে আজ ৭৮টি বইয়ের একটি বড় তালিকা যুক্ত হয়েছে আমাদের ঝুলিতে। এবং প্রতিবছরই আগের চেয়ে সংখ্যায় ও মানে কলেবর বাড়ছে। ঢাকা কমিকসে যুক্ত হয়েছে একেবারে নতুনদের উৎসাহ দিতে ‘নবীন সিরিজ’। ফলে একেবারে নবীনেরাও সুযোগ পাচ্ছে তাদের কমিকস প্রকাশ করতে। ওয়েবসাইটে এখন যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ভার্সন—কেনাও যায় আবার ফ্রিতে পড়ার সুযোগও আছে। পৃথিবীব্যাপী বাংলা ভাষাভাষীদের কাছেও তাই নিমেষে চলে যাচ্ছে বাংলা কমিকস। শুরু হয়েছে ঢাকা কমিকস টয়। মৌলিক কমিকস ক্যারেক্টার নিয়ে বানানো স্ট্যাচু টয় এখন কমিকস পাঠকদের শখের তালিকায় যোগ হয়েছে। অতি সম্প্রতি একটি অ্যাপের মাধ্যমে আসছে আমাদের প্রথম অ্যানিমেটেড মোশন কমিকস ‘নীলকমল আর লালকমল’। বিক্রয় নির্বাহী শোভন পালের কল্যাণে দেশব্যাপী বিভাগীয় শহর আর বড় বড় সব জেলাশহরের নামকরা বইয়ের দোকানে দোকানে পৌঁছে গেছে বাংলা কমিকস। এখন যাচ্ছে অন্য জেলা শহরগুলোতেও। এবং সেগুলোর সাড়া প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বৈ কম নয়।

ভবিষ্যতে

default-image

শিগগিরই ঢাকা কমিকস শুরু করবে অ্যানিমেশন। এত দিনে এত এত গল্প জমে গেছে, তার অনেকগুলোই অ্যানিমেশন করার জন্য একেবারে তৈরি। কমিকসে যেমন একেবারে ‘দিশি’ পদ্ধতিতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোনো, এখানেও যাত্রাটা সেভাবেই শুরু হোক। খুব অসামান্য কিছু করে একবারে চমক লাগিয়ে দেওয়াটা আসলে কোনো ভালো কৌশল নয়। চটকদার যেকোনো কিছুই টেকে খুব অল্প সময়। তাই ধীরে ধীরে শুরু করাই আমাদের লক্ষ্য। আর বাংলা কমিকস শুধু বাংলায় না রেখে কিছু বই ইংরেজিতে অনুবাদ করে নিয়ে যেতে চাই আন্তর্জাতিক কোনো কমিকস সম্মেলনে। প্রতিযোগিতা নয়, বরং সবার সঙ্গে এক কাতারে বসে কমিকসের আন্তর্জাতিক বড় বাজারটা দেখাই উদ্দেশ্য। আর কে না জানে, টয় বা স্ট্যাচুর ক্ষেত্রে আমাদের দেশি চরিত্রগুলোর সম্ভাবনা কতটুকু। সেটাও আমরা বাজিয়ে দেখব তো বটেই।

বিজ্ঞাপন

উপলব্ধি

default-image

ঢাকা কমিকস প্রসঙ্গে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, আপনাদের এই পুরো আট বছরের যাত্রা থেকে কী শিখলেন? তবে যেটা বলা যায়, তা হলো যদি আপনার একটা কিছু করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে আজ এই লেখা পড়ার পরই তা শুরু করে দিন। অবশ্যই বাস্তব বুদ্ধি সঙ্গে নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কিন্তু কখনোই ‘পরে আরও ভালো করে করব’ ভেবে ফেলে রাখবেন না। শুরু করলে ভুল হবে, তবে সেটা ঠিক করতে করতে এগিয়েও যেতে পারবেন। আর শুরু করে দিলে দেখবেন, সমমনা অনেকেই পাশে এসে যোগ দেবে। শুরু করার আগে শুধু আইডিয়ার কথা জনে জনে বলে বেড়িয়ে কোনো লাভ নেই। বরং তখন দেখবেন, কেউই আপনি যেভাবে চাইছেন বা ভাবছেন, তা ঠিক বুঝতে পারছে না এবং কিছু জায়গায় রীতিমতো মানা করছে। তার চেয়ে চাকাটা গড়িয়ে দিন, তাকে নিজের পথ খুঁজে নিতে দিন।

মন্তব্য করুন