১. নিজের সেরাটা দাও

ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমি বহু মেধাবী মানুষ দেখেছি। মেধা তোমাকে দারুণ একটা সূচনা দেবে। কিন্তু জেতার জন্য সেটাই যথেষ্ট নয়‍। জিততে হলে তোমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

ছোটবেলায় খেলাধুলা আমি একদমই পারতাম না। এখনো পিকেলবল খেলায় স্বামী-সন্তানেরা কেউ আমাকে নিতে চায় না।

আমার বরং বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতেই ভালো লাগত। গ্রেডকে ভীষণ গুরুত্ব দিতাম। কোনো পরীক্ষা খারাপ হলে যখন দুশ্চিন্তায় পড়তাম, মা সব সময় জিজ্ঞেস করত, ‘তুমি কি তোমার সেরাটা দিয়েছ?’ আমি বলতাম, ‘হ্যাঁ।’ মা বলত, ‘তাহলে আর কিছুতেই কিছু যায় আসে না।’

এ কথা শুনে সে সময় খুব বিরক্ত লাগত। মনে হতো, মা আমার দুশ্চিন্তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। কিন্তু দিনে দিনে যত বড় হলাম, যেকোনো কঠিন পরীক্ষা কিংবা দিনের পর মনে হতো মায়ের সেই কথাটা শোনার জন্যই আমি বাড়ি ফিরছি। সব সময় আমি বিশ্বাস করেছি, ‘পরিশ্রমী মেধাবীকে হারিয়ে দেয়, যদি মেধাবী যথেষ্ট পরিশ্রম না করে।’

অতএব যদি কিছু করতেই চাও, নিজের সেরাটা ঢেলে দাও। চাওয়ার সঙ্গে যদি চেষ্টা যুক্ত হয়, তুমি তা-ই পাবে, যা কল্পনাও করোনি।

২. তোমার উদ্দেশ্য খুঁজে বের করো

জেনারেল মটরসেই কেটেছে আমার পুরো পেশাজীবন। ১৮ বছর বয়সে এখানে ‘কো-অপ স্টুডেন্ট’ হিসেবে কাজ করতাম। অর্থাৎ তিন মাস পড়তাম আর তিন মাস কাজ করতাম। এভাবে কেটেছে পাঁচ বছর। এই কাজ করে কলেজের টিউশন ফি দিয়েছি। জেনারেল মটরসেই স্বামী টনির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।

যেহেতু কো-অপ স্টুডেন্ট ছিলাম, আমাকে অনেকের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। তাঁদের দৃষ্টিতে আমি প্রতিষ্ঠানটাকে দেখেছি। কখনো কখনো তাঁরা তাঁদের স্বপ্ন–সংগ্রামের কথা আমাকে বলত। এভাবেই আমি সমানুভূতি শিখেছি, অন্যের জুতায় পা গলিয়ে দুনিয়াটা দেখেছি। আর এভাবেই ধীরে ধীরে খুঁজে পেয়েছি আমার জীবনের উদ্দেশ্য—মানুষকে তাঁর সেরাটা ঢেলে দিতে সাহায্য করা।

সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করো, ‘কেন?’ সততার সঙ্গে যদি এই সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারো, তাহলেই জীবনের ছোট-বড় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া সহজ হয়ে যাবে।

তুমি হয়তো এখনো তোমার জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওনি। আর যদি পেয়ে থাকো, দারুণ!

৩. বোঝার জন্য শোনো

শুনলে মানুষ বোঝে। আর বুঝলেই অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে শেখে, এমনকি নিজের মতের সঙ্গে না মিললেও।

জেনারেল মটরসে আমার অন্যতম কাজ হলো বৈশ্বিক মানবসম্পদ দলের নেতৃত্ব দেওয়া। শুরুতে এই ক্ষেত্রটা আমি খুব একটা বুঝতাম না। কিন্তু বিশ্বাস ছিল, একটা পরিবর্তন আনতে পারব। প্রতিষ্ঠানের জন্য সময়টা তখন কঠিন।

কর্মীদের বাড়তি চার দিনের ছুটিবিষয়ক একটা প্রকল্প নিয়ে তখন কাজ চলছিল। আমার কাছে প্রকল্পটা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। যদিও দলের অন্যরা বলেছিলেন, আমি ভুল করছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, আমিই ঠিক। অতএব প্রকল্পটা আমি বাদ দিয়ে দিলাম।

কদিন পর মনে হলো, নিজেকেই বাদ দিয়ে দিই। কারণ, এটা আমাকে খুবই অজনপ্রিয় করে তুলেছিল। কিন্তু প্রকল্পটা বাদ দেওয়া আমার ভুল ছিল না। ভুল ছিল ওদের কথা না শোনা, না বোঝা।

ওই বাড়তি ছুটির সময়টা কর্মীরা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করত। যেমন মা-বাবার দেখাশোনা করা, বাচ্চাদের খেলতে নিয়ে যাওয়া, সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানো। কাজের চাপ সামলে নেওয়ার জন্যই এই বাড়তি সময়টা দরকার। অতএব দ্রুতই আমি আবার সেই নীতিতে ফিরে আসি।

সব সময় তুমি শতভাগ ঠিক হবে না। কেউই হয় না। সব উত্তর তোমার কাছে আছে ভেবে গর্বিত হয়ো না। শোনো।

৪. সৎ থাকো, সব সময়

আমার মনে হয়, ভুল স্বীকার করার প্রবণতা মানুষকে বড় করে। সবাই জানে, তুমি একটা ভুল করেছ। অতএব তুমি যখন ভুলটা স্বীকার করছ, তখন তুমি শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

সৎ হওয়া মানে নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়া, নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি থাকা। অন্য কেউ তোমাকে একটা আইডিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি দেবে, এই আশায় কোনো মিটিংয়ে বোসো না।

শ্রদ্ধার সঙ্গে তোমার মতামতটা উপস্থাপন করতে শেখো। আমরা যখন সদয়ভাবে মত দেওয়া ও গ্রহণ করা শিখি, তখন কাজ আরও ভালো হয়।

সততাই সব। এটা গড়তে বছরের পর বছর লাগে। আবার একমুহূর্তেই তা চূর্ণ হয়ে যেতে পারে। একবার যদি সততা হারিয়ে যায়, ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। অতএব নিজের সততা আগলে রেখো। মনে রেখো, সততা ছাড়া যদি জিতেও যাও, সেটা আদৌ জয় নয়।

৫. টেবিলে জায়গা রাখো

যেমনটা বলছিলাম, আমাদের খাবার টেবিলে সব সময় প্রতিবেশী, স্বজনদের জন্য জায়গা থাকত। হঠাৎ কেউ এলে আমরা বাড়তি চেয়ার টেনে নিতাম। রাতের খাবারে যা থাকত, সেটাই ভাগ করে দিত মা। খাবার কম পড়ে গেলে দিত টুনা স্যান্ডউইচ।

কখনো কখনো মাকে কাবার্ডের দিকে এগোতে দেখলেই মনে মনে বলতাম, ‘প্লিজ, টুনা স্যান্ডউইচ না. . . ।’ সব সময় ওই একই জিনিস খাওয়াতে আমার সংকোচ হতো খুব। কিন্তু মা যখন মারা গেল, শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আমার কাজিন শেরিল হঠাৎ বলল, ‘তোমাদের মধ্যে কে কে ইভা আন্টির বাসায় টুনা স্যান্ডউইচ খেয়েছ?’

রুমের ভেতর প্রায় সবাই হাত তুলে ফেলল। বুঝলাম, ওরা যখন আমাদের বাসায় আসত, কথা বলত, শুনত, হাসত আর খেত; তখন টুনা মাছটা কখনোই মুখ্য ছিল না। হোক না সেটা টুনা স্যান্ডউইচ।

আমাদের খাবারের টেবিল ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। এই কাজটা আমি আর টনি আমাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও করার চেষ্টা করি। এমনকি পেশাগত ক্ষেত্রেও আমি এই নীতি মেনে চলি।

পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু চলছে, যা ঠিক নয়। দুশ্চিন্তা করার মতো অজস্র বিষয় আছে। কিন্তু আশাবাদী হওয়ার মতো বিষয়ও আছে। আমি মনে করি, সবাই মিলে কথা বলা, আরও মানুষকে জায়গা করে দেওয়া—এটাই আশাবাদী হওয়ার বড় জায়গা।

ইংরেজি থেকে অনুদিত

সূত্র: টুডে ডট ডিউক ডট এডু

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন