বাংলাদেশের বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করতে এসে কেমন অভিজ্ঞতা হচ্ছে ব্রিটিশ উপস্থাপক ও প্রকৃতিবিদ নাইজেল মারভেনের

২০২৫ সাল থেকেই বাংলাদেশের বন্য প্রাণী নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ করছেন জনপ্রিয় ব্রিটিশ উপস্থাপক ও প্রকৃতিবিদ নাইজেল মারভেন। এবারের সফরে শুটিং শুরুর আগে ঘুরতে গিয়েছিলেন খাগড়াছড়ি। মাটিরাঙ্গার পিটাছড়ায় গিয়ে দেখে এসেছেন বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগ। এই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন উদ্যোগটির প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল

ব্রিটিশ উপস্থাপক ও প্রকৃতিবিদ নাইজেল মারভেনছবি: নাইজেল মারভেন ডটকম

পড়াশোনা শেষ করে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে থাকতাম। জীবনের মানে খুঁজতে তখন ঘুরেছি নানা দেশ, নানা প্রান্ত। আমাজন বনে আদিবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা আমার জীবনটাই বদলে দেয়। সেই অভিজ্ঞতারই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত থিতু হই খাগড়াছড়ির পিটাছড়া বনে। মাটিরাঙ্গার পূর্ব খেদাছড়ায় আমাদের গড়ে তোলা এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বয়স প্রায় এক দশক। 

পিটাছড়া ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এ বনাঞ্চল। একজন ট্রাস্টি লন্ডনে থাকেন, যাঁর সঙ্গে নাইজেল অ্যালান মারভেনের পরিচয় রয়েছে। তাঁর কাছ থেকেই পিটাছড়া ও আমার কাজের কথা জানতে পারেন নাইজেল। সাগ্রহে পিটাছড়ায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেই সূত্র ধরেই তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ।

নানা সময়ে পরিবেশকর্মী, বন্য প্রাণী গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা পিটাছড়ায় এসেছেন। তবে নাইজেল অ্যালান মারভেনের মতো বিশ্বখ্যাত বন্য প্রাণী উপস্থাপক ও সংরক্ষণকর্মীর আগমন আমার জন্য নিঃসন্দেহে বিশেষ ঘটনা। ৬৫ বছর বয়সী নাইজেল অ্যালান মারভেনের ভক্ত এ দেশেও কম না। একসময় বিবিসিতে তাঁর ওয়াইল্ডলাইফ উপস্থাপনা কিংবা আইটিভিতে করা কাজ আমার মতো অনেককেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমার বনবাসী জীবন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে যুক্ত হওয়ার পেছনেও তাঁর কাজের বড় ভূমিকা রয়েছে। এমন একজন মানুষকে কাছে থেকে দেখা, তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো, আমার জন্য তা ছিল সত্যিই বিরাট পাওয়া।

মাটিরাঙ্গার পূর্ব খেদাছড়ার পিটাছড়া বনের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নাইজেল মারভেন ও জ্যাক সিমিডিয়ান
ছবি: পিটাছড়ার সৌজন্যে

নাইজেলের ‘ওয়াইল্ড বাংলাদেশ’ 

বাংলাদেশের বন্য প্রাণী নিয়ে ডকুমেন্টারি করছেন নাইজেল মারভেন। এ প্রকল্পের কাজেই গত বছর বাংলাদেশে আসেন। এ দফায় ঢাকায় পৌঁছান গত ২৮ ডিসেম্বর। মূল শুটিং শুরুর কথা ৪ জানুয়ারি, তার আগে তিন দিন পিটাছড়ায় কাটানোর পরিকল্পনা। ঢাকার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ৩০ ডিসেম্বর পিটাছড়ায় পৌঁছান তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নাইজেল মারভেন প্রডাকশনের গবেষক জ্যাক সিমিডিয়ান, যিনি ‘ওয়াইল্ড বাংলাদেশ’ ডকুমেন্টারির গবেষক হিসেবেও কাজ করছেন।

পিটাছড়ায় থাকার সময় দিনে–রাতে নানা সময়ে নাইজেল আমাদের সঙ্গে বনজঙ্গলে ঘুরেছেন। দেখা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। পাখি শনাক্ত করা নিয়ে হয়েছে বিস্তর আলোচনা। নাইজেল ও জ্যাক সঙ্গে করে এনেছিলেন দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের পাখি ও বন্য প্রাণীবিষয়ক বেশ কিছু বই। বনে–ঝোপে যা-ই দেখা গেছে, সঙ্গে সঙ্গে বই ঘেঁটে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। কাচার বুলবুল না অলিভ বুলবুল, এমন সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়েও দীর্ঘ আলাপ হয়েছে।

সব প্রাণীর দেখা না মিললেও সৌভাগ্যক্রমে আমরা গন্ধগোকুল (পাম সিভেট) দেখাতে পেরেছি। এই প্রাণী জ্যাক আগে কখনো বনে দেখেননি। বাংলা লজ্জাবতী বানরের (বেঙ্গল স্লো লরিস) দেখাও পাওয়া গেল। সব মিলিয়ে দিনে ও রাতে হেঁটে হেঁটে বন দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে ছিল ভীষণ উপভোগ্য।

২০২৬ সালের প্রথম দিনটিও আমরা একসঙ্গে উদ্​যাপন করি। নাইজেলের সম্মানে পিটাছড়ার পাবলিক লাইব্রেরিতে ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজন। স্থানীয় শিশুদের গান-নাচ, পার্বত্য অঞ্চলের সাংস্কৃতিক চর্চা তাঁকে মুগ্ধ করে। তাঁকে আরও নিবিড়ভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করাতে ঢেঁকিতে আটা কুটে পিঠা বানিয়ে খাওয়ানো হয়। পুরো প্রক্রিয়া তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখেন।

নাইজেল সারাক্ষণ মজা করেন, প্রশ্ন করেন, ব্রিটিশ কৌতুক ছুড়ে দেন। ইংল্যান্ডে দীর্ঘ সময় থাকার সুবাদে ব্রিটিশ কৌতুক বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি, এতে তাঁর সঙ্গে খুনসুটিতেও সুবিধা হয়েছে। আবার নিজের নিরিবিলি সময়ও ঠিকই বের করে নেন। সন্ধ্যার পর হেডল্যাম্প জ্বালিয়ে থ্রিলার পড়েন। খাওয়াদাওয়া খুব কম করেন, জ্যাকও তা–ই। তবে নাইজেল নিয়মিত চা–কফি খান।

নাইজেলের ব্যক্তিত্বের নানা দিক আমাকে মুগ্ধ করেছে। 

নাইজেল মারভেন
ছবি: মাহফুজ রাসেল
আরও পড়ুন

সংরক্ষণ নিয়ে ভাবনা

গল্প-আড্ডাও কম হয়নি। আড্ডায় উঠে এসেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে নাইজেলের কাজ করার অভিজ্ঞতা—কোস্টারিকা, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ইত্যাদি জায়গার গল্প। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে খুব সূক্ষ্মভাবে প্রাণী শনাক্ত করতে হয়, একই প্রজাতির ভেতরে থাকা বিভিন্ন ধরন কীভাবে আলাদা করে চেনা যায়। আমাদের সেন্টারের অন্য সদস্যরাও তাঁদের কাছ থেকে জেনেছেন, কীভাবে তাঁরা কাজ করেন, কীভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং গবেষণার পদ্ধতি কী।

আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও আমি নিয়েছি। সেখানে তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে এই ডকুমেন্টারির কাজ হচ্ছে। তাঁর ডকুমেন্টারিতে বন্য প্রাণীর পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতিও গুরুত্ব পাবে। ঢাকার বসন্ত উৎসবে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছেন। সুন্দরবনে শিশুদের গান গাওয়ার দৃশ্য ধারণ করেছেন, আর ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার মতো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিও দেখেছেন। নাইজেল বলেন, ‘বন্য প্রাণীকে এভাবে ব্যবহার করা উচিত কি না, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এটি বাংলাদেশের বহুদিনের ঐতিহ্য, আর সেটি নথিভুক্ত করা আমার জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা।’ 

পিটাছড়া বনে ঘোরাঘুরি
ছবি: পিটাছড়ার সৌজন্যে

তিনি সুন্দরবনের টাইগার প্যাট্রোল দলের কাজ দেখার কথাও বলেন। এ দলের সদস্যরা বাঘ মারার বদলে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেন। তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে যুক্ত মানুষেরা। 

তিনি বলেন, ‘এখানে এখনো হাতি আছে, সুন্দরবনে এখনো বাঘ আছে। আর আছে অত্যন্ত বিরল এক পাখি—মাস্কড ফিনফুট, যা এখন নির্ভরযোগ্যভাবে দেখা যায় কেবল বাংলাদেশেই।’

এবারের সফরটি নাইজেলের প্রকল্পের শেষ ধাপ। সাতছড়ি, লাউয়াছড়া, চট্টগ্রাম অঞ্চল, শেরপুরের হাতিসহ আরও কয়েকটি জায়গায় শুটিং হওয়ার কথা।

ডকুমেন্টারিটি কবে মুক্তি পাবে—এমন প্রশ্নে নাইজেল জানান, ‘আমরা জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে চাই। বিশ্বব্যাপী কোথায় এটি প্রচারিত হবে, এখনো তা নিশ্চিত নয়। তবে আমরা আশাবাদী যে এটি বাংলাদেশের টেলিভিশনেও দেখানো হবে, যাতে এখানকার মানুষ নিজের দেশে থাকা বিস্ময়গুলো নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে। সরকার বা স্পনসর পেলে এটি বিশ্বব্যাপী মুক্তির সুযোগও পেতে পারে।’

সব মিলিয়ে নাইজেল অ্যালান মারভেনের এই সফর পিটাছড়ার জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি আমাদের সবার জন্য শেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। 

অনুলিখন: সজীব মিয়া

আরও পড়ুন