২৫-এর প্রেরণায় ২৬-এ চুয়েট
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ক্যাম্পাসটা শহর থেকে বেশ দূরে। কাপ্তাই সড়কের কোল ঘেঁষে ১৭১ একরের বিশাল প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের কাছে এক ‘অন্য দুনিয়া’। বছরজুড়ে নানা উদ্ভাবনী কার্যক্রমে সরব থাকেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ২০২৫ সালও ব্যতিক্রম ছিল না। উদ্ভাবন, গবেষণা, উদ্যোগ মিলিয়ে গত বছরের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনায় চোখ ফেরানো যাক।
৫০০–তে ৪৯৯ দশমিক ৮!
গত বছর গ্লোবাল স্পেস চ্যালেঞ্জে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় চুয়েটের ‘টিম এসরো’, সঙ্গে জিতে নেয় ‘বেস্ট টিম ভিডিও’ পুরস্কার। প্রতিযোগিতাটির সিনিয়র ক্যাটাগরিতে অংশ নিয়ে ৫০০ নম্বরের মধ্যে টিম এসরো পেয়েছিল ৪৯৯ দশমিক ৮। টানা সাত দিন চলা এই প্রতিযোগিতায় চুয়েটের প্রতিযোগীরা প্ল্যানেটারি সায়েন্স, স্পেসক্রাফট ডিজাইন, অরবিটাল মেকানিকস, রিমোট সেন্সিং, এন্ট্রি-ডিসেন্ট-ল্যান্ডিং, এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল হ্যাবিট্যাট, হিউম্যান ও রোবোটিক এক্সপ্লোরেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। দলের সদস্য সজীব কুমার কর বলেন, ‘তখন পূজার ছুটি ও টার্ম ফাইনাল একসঙ্গে চলছিল। তবে আমাদের টিমের দারুণ ডেডিকেশন, পারফেক্ট টিমওয়ার্ক আর স্ট্র্যাটেজির ফলেই আমরা পেরেছি। ভবিষ্যতেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা আছে।’
শোক থেকে শক্তি
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উদ্ভাবনী সমাধান দেখিয়ে সাফল্য অর্জন করেন চুয়েটের শিক্ষার্থী তাসনিম বিনতে আহসান। হোন্ডা ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘থ্রি জিরো টেকাথন’ নামের একটি প্রতিযোগিতায় ‘দুর্ঘটনাহীন’ ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ৫০ হাজার জাপানিজ ইয়েন জিতে নেন স্থাপত্য বিভাগের এই শিক্ষার্থী। গত বছর চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে বাসের ধাক্কায় চুয়েটের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন। ঘটনাটি তাসনিমকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। সেই ভাবনা থেকেই এই প্রকল্প। ‘একটি ছোট যাত্রা—কাপ্তাই রোডের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা’ নামে অনন্যার তৈরি এ প্রকল্পে বিশেষ ধরনের ‘স্মার্ট হেলমেট’ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই হেলমেট গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনে তথ্য পাঠাতে সাহায্য করবে।
পুরস্কার এসেছে জাপান থেকে
জাপান থেকে ‘এশিয়া ইয়াং ডিজাইনারস অ্যাওয়ার্ড’ এনেছেন স্থাপত্য বিভাগের মাহদিয়া রহমান। প্রতিযোগিতায় প্রথমে বাংলাদেশ পর্বে স্বর্ণপদক জিতে আন্তর্জাতিক পর্বে জায়গা করে নেন তিনি। সেখানেই তাঁর প্রকল্পটি বিচারকদের নজর কাড়ে। স্বামীহারা যেসব নারী সমাজে টিকে থাকতে সংগ্রাম করছেন, তাঁদের স্বাবলম্বী করতে চেয়েছেন মাহদিয়া। বিশেষ এক চায়ের দোকানের নকশা করেছেন তিনি, যার মাধ্যমে সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব। মাহদিয়া বলেন, ‘পুরস্কার পাব ভাবিনি। আমাদের দেশে স্বামীহারা অনেক নারীকে সন্তানসহ খুব অসহায় জীবন যাপন করতে দেখি। আবার চায়ের দোকানও আমাদের সমাজে খুব পরিচিত ও সাধারণ একটি বিষয়। এই দুটো দিককে এক করেই আইডিয়াটা মাথায় এসেছে।’
রানার্সআপ তুরস্কে
২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা সেজেরিফেস্ট ২০২৫। এই আয়োজনে রানার্সআপ হয় মেকাট্রনিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মিনহাজুল ইসলাম এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের জাবের আহছান ভূঁইয়ার দল। ত্রিমাত্রিক নকশা ও ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ ব্যবহার করে এক বিশেষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন এই দুই শিক্ষার্থী, যা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জীবনকে কিছুটা হলেও সহজ করবে। তাঁদের প্রকল্পের নাম ছিল ‘স্টেডি গ্রিপ—স্বয়ংক্রিয় কাঁপুনি দমন গ্লাভস’। চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, ভুটান, ভারতসহ ৮ দেশের ১০টি দল অংশ নেয়। চুয়েটের দলটি জিতে নেয় রানার্সআপের পুরস্কার।
বিতর্কে সেরা
এ বছরের মে মাসে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বিতর্ক উৎসবে ফাইনালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দলকে হারিয়ে জয়ী হয় চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি। দলের সদস্য ছিলেন কামরুল আহসান, আফফান বিন নূর ও কৌশিক বৈদ্য।
বিয়ারিং প্যাড নিয়ে গবেষণা
ভূমিকম্প–সহনশীল ভবন নির্মাণের জন্য বিয়ারিং প্যাড তৈরির কাজ করছেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক বশির জিসান। কলামের মধ্যে থাকা এই প্যাডের মূল কাজ হলো ভূমিকম্পের সময় ঝাঁকি সহ্য করা। টায়ার ও রড দিয়ে তৈরি করা প্যাড বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় বাংলাদেশে এর ব্যবহার খুব একটা চোখে পড়ে না। তাই গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার থেকে স্বল্প খরচে বিয়ারিং প্যাড তৈরি করেছেন তিনি। বশির জিসান বলেন, ‘এই বিয়ারিং প্যাড ব্যবহার করলে খুবই কম খরচ পড়বে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।’
শনাক্ত হবে সেপসিস
হাসপাতালে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সেপসিস। এটি একটি সংক্রমণজনিত রোগ। সময়মতো শনাক্ত করা না গেলে সেপসিস প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে শুরুতেই এটি চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। চুয়েটের তিন শিক্ষক বলছেন, তাঁরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা ব্যবহার করে সংক্রমণের শুরুতেই দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সেপসিস শনাক্ত করা সম্ভব। এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধ্যাপক মেহেদী হাসান চৌধুরী, অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও সহকারী অধ্যাপক ফাহিম মাহমুদ। গবেষকেরা আশা করছেন, এই পদ্ধতি সেপসিসকে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছানো রোধ করবে এবং হাসপাতালের আইসিইউতে চাপ কমাবে। সাধারণ সেন্সর এবং অল্প দামের র্যাস্পবেরি পাই ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি ও যাচাই করা হয়েছে। এর নির্ভুলতার হার প্রায় ৮৭ শতাংশ, যা সেপসিস শনাক্তকরণের অন্যান্য পদ্ধতি থেকে ভালো। অধ্যাপক মেহেদী হাসান বলেন, ‘এই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কাজে লাগালে ভবিষ্যতে বহু রোগীর জীবন বাঁচবে।’
টেলিস্কোপ নির্মাণ
ডবসোনিয়ান মডেলের একটি টেলিস্কোপ নির্মাণ করেছেন চুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থী। ‘এসরোস্কোপ’ নামের এই টেলিস্কোপটি প্রায় ১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণে সক্ষম। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ফাহিম ফয়সাল, সঙ্গে আরও ৬ জন যুক্ত ছিলেন।
গবেষকদের বন্ধু ‘রিসার্চবাডি’
গবেষণার বিভিন্ন ধাপে সহায়তা দিতে চুয়েটের তিন শিক্ষার্থী চালু করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘রিসার্চবাডি এআই’। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গবেষণা প্রবন্ধ লেখা, পেপার রিভিউ, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সহায়তা এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে ভার্চ্যুয়াল ল্যাব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত চুয়েটের তিন শিক্ষার্থী হলেন মো. ফাহিম উদ্দিন, মো. জহিরুল ইসলাম ও নাহিয়ান বিন নুর। তাঁদের চিফ টেকনোলজি অফিসার ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইশমাম আহমেদ। উদ্যোক্তারা জানালেন, গত ৮ মাসে এই প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত এর ব্যবহারকারী প্রায় ২ হাজার জন। গবেষণা হয়েছে ১ হাজার ১০০টি। ২০টি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে। ৪০টির কাজ চলমান। মূল উদ্যোক্তা মো. ফাহিম উদ্দিন বলেন, ‘গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতেই এই উদ্যোগ। অল্প সময়েই দেশ-বিদেশের গবেষকদের কাছ থেকে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি।’
বিশ্বমানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি: উপাচার্য
মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া, উপাচার্য, চুয়েট
গত বছর ৩০ অক্টোবর যোগদান করার পর থেকেই সবার সহযোগিতায় চুয়েটকে শিক্ষা-গবেষণায় বিশ্বমানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে কিছু উন্নতি চোখে পড়ছে। গবেষণাকে যুগোপযোগী করাসহ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, এ–সংক্রান্ত যাবতীয় প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ‘আউটকাম বেইজড এডুকেশন’ কার্যক্রমকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে চুয়েটের অবস্থান দেশের মধ্যে এখন শুরুর দিকে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে টার্ম ফাইনাল পরীক্ষায় কোডিং সিস্টেম চালু করাসহ অনলাইনভিত্তিক শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন সেবা চালু করা হয়েছে। মেডিকেল সেন্টারটিকে আধুনিকায়ন করে নতুন চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ করা হয়েছে। বাসের সংখ্যা ও শিডিউল বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করা হয়েছে। প্রধান ফটকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে সিসিটিভি স্থাপন এবং জিমনেসিয়ামে নতুন ব্যায়ামের সামগ্রী সংযোজন করে সবার জন্য চালু করা হয়েছে। চুয়েটের নতুন মুক্তিযোদ্ধা হল দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু করে হলে থাকতে ইচ্ছুক প্রায় সব শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে আবাসন প্রদান করা হয়েছে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট শিক্ষার্থীদের রুমে রুমে পৌঁছানোসহ আরও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান আছে।
আরও অন্তত দুটি কাজ আমি করতে চাই—
১. শ্রেণিকক্ষে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠদান অধিকতর কার্যকর করা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক পেতে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার, যা তাৎক্ষণিক মূল্যায়নে সহায়ক হবে।
২. চুয়েটকে একটি মডেল ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ হিসেবে দেখতে চাই। যে ক্যাম্পাসে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী—সবাই প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার, পরিবেশের মানোন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, পানি ও বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার ইত্যাদির প্রতি সচেতন থাকবে।