বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে কেন
হানজাবাম ধনরাজ শর্মা প্রথমবার যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন ক্লাস নাইনে পড়তেন। বড় বোন হানজাবাম দীপা বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। বোনকে পৌঁছে দিতেই সেবার ভারতের মণিপুর থেকে এসেছিল পুরো পরিবার। ২০২৪ সালে দীপার এমবিবিএস শেষ হয়েছে। এখন ধনরাজও পড়ছেন একই মেডিক্যালে, শেষ বর্ষে।
ধনরাজ বলেন, ‘আমাদের ওখানে সরকারি মেডিক্যালে চান্স পাওয়া খুব কঠিন। বেসরকারি মেডিক্যালের খরচ এখানকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তা ছাড়া বাংলাদেশের মেডিক্যালের পাঠ্যক্রম আমাদের সঙ্গে অনেকটা মেলে। দূরত্ব কম। ভাষাটা রপ্ত করা সহজ। সে জন্যই এ দেশে আসা।’
২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে পড়ছেন, কখনোই অনিরাপদ বোধ হয়নি, জানালেন ধনরাজ। তিনি বলছিলেন, ‘নিউজ ও সোশ্যাল মিডিয়া দেখে অনেক সময় আত্মীয়স্বজনেরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ফোন করে বলেন, তোমাদের ওখানে নাকি অনেক কিছু ঘটছে। কিন্তু আমার কাছে সব সময় নিরাপদই মনে হয়েছে। বাংলাদেশি বন্ধুরা তো আছেই, তাই কোনো ভয় নেই।’
ধনরাজের মতো এমন অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীই প্রতিবছর বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোয় ভর্তি হন। তাঁদের একটা বড় অংশই ভারতীয় ও নেপালি। এ ছাড়া ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফিলিস্তিনসহ নানা দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়তে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকেও আসেন, তবে তাঁরা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি।
মেডিক্যাল কলেজের করিডরে বিদেশি শিক্ষার্থীরা হাঁটছেন, হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গে আধো বাংলায় কথা বলছেন, এই দৃশ্য দেশের অনেক মেডিক্যাল কলেজেই দেখা যায়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।
সরকারি মেডিক্যাল কলেজ
২০১৯ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের এই প্রাক্তন ছাত্র সেবার নিজ কলেজে গিয়ে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন।
লোটে শেরিংয়ের মতো বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোয় সুযোগ পান মূলত সার্ক ও নন–সার্ক কোটায়। প্রতিবছর এই কোটায় ২২০ থেকে ২৬টি আসন বরাদ্দ থাকে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের বিজ্ঞপ্তি বলছে, এবারও সার্ক কোটায় ১২৫ জন ও নন–সার্ক কোটায় ৯৯ জনকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে ভর্তির সুযোগ পেলেও সবাই ভর্তি হননি। তাই সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিগত বছরে মোট কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ৩৭টি। সব কটি মেডিক্যালে বিদেশি শিক্ষার্থী নেই। যেগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীরা বেশি ভর্তি হন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ।
কথা হলো স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ফারুক আহাম্মদের সঙ্গে। এ বছরের শুরুতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবেও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন একবার সব বিদেশি শিক্ষার্থীকে ডেকে তাঁদের কথা শুনেছি। মতামত নিয়েছি। কেউ কেউ থাকা, খাওয়া ও স্যানিটেশনের কিছু সমস্যার কথা বলেছিলেন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আমরা সব সময় আন্তরিক।’
সার্ক কোটায় ভিন্ন ভিন্ন দেশের জন্য ভিন্নসংখ্যক আসন বরাদ্দ থাকে। এবার যেমন এমবিবিএস কোর্সে ভারতের জন্য ২২টি, পাকিস্তানের ২১, নেপালের ১৯, শ্রীলঙ্কার ১৩, ভুটানের ২৮, মালদ্বীপের ৬ ও আফগানিস্তানের জন্য ৩টি আসন বরাদ্দ ছিল। এমবিবিএসে নন–সার্ক কোটায় মিয়ানমার, ফিলিস্তিন ও অন্যান্য দেশের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭২টি আসন। সার্ক ও নন–সার্ক কোটায় অন্য মোট ৪০টি আসন ডেন্টালের জন্য রাখা হয়েছে।
মেডিক্যাল খাতে পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের (স্নাতকোত্তর) জন্যও অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসেন। নেপালের ডা. রাম সাগর শাহ যেমন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) নিওনেটোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে আমি চট্টগ্রামের ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। এমবিবিএস শেষে নিজ দেশে ফিরে গিয়েছিলাম। পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের জন্য আবার বাংলাদেশে আসি। কারণ, এখানে সরাসরি নিওনেটোলজিতে পড়ার সুযোগ আছে। ভাষাটাও আমার জানা।’
বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজে নেপালি শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট তুলনামূলক ভালো। গত বছর যেমন এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় সারা দেশে সেরা ১০–এর মধ্যে ছিলেন নেপালের স্তুতি রিমাল। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। ‘স্বপ্ন নিয়ে’র সঙ্গেই এক সাক্ষাৎকারে স্তুতি বলেছিলেন, ‘মুখ না খুললে কেউ বুঝতেই পারে না, আমি বাংলাদেশি নই।’
বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ
বাংলাদেশে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়েন, এমন বেশ কয়েকজন বিদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলো। খরচ তুলনামূলক কম, কয়েক ভাগে টিউশন ফি দেওয়া যায়, ভাষা শেখা তুলনামূলক সহজ, নিজ দেশের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মিল, এমন নানা কারণেই তাঁরা এ দেশে পড়তে আসেন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৮টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে অন্তত ৬০টিতেই নিয়মিত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হন। যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি।
২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বেসরকারি মেডিক্যালে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির একটি তালিকা পাওয়া গেল স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে। তালিকাটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের মহামারি–পরবর্তী কয়েক বছর বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল। ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিক্যালগুলোয় ভর্তি হওয়া মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৪৭। পরের দুই বছরে যথাক্রমে ২ হাজার ১২ ও ২ হাজার ৯৬ জন। কিন্তু ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকেই আবার সংখ্যা কমতে শুরু করে। সে বছর বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৬৬৯ জন। পরের বছর ১ হাজার ১৮৭ জন।
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এবার যে আরও কমেছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত করলেন স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসাশিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন। তিনি বলেন, ‘আমি ডিজিএমইতে যোগ দেওয়ার পর দুটি অ্যাডমিশন টেস্ট হয়েছে। গতবার মোটামুটি স্টুডেন্ট ছিল। এবার বিদেশি শিক্ষার্থী পেয়েছি গতবারের চেয়ে কম। সরকারি মেডিক্যালে বিদেশিদের জন্য বরাদ্দ আসন মোটামুটি ভরে যায়। তবে বেসরকারি মেডিক্যালগুলো আগে যে রকম বিদেশি শিক্ষার্থী পেত, এখন সে রকম পায় না। সে জন্য বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। আমরাও আমাদের দিক থেকে সহায়তা করছি।’
সরকারি মেডিক্যালে নন–সার্ক কোটায় যাঁরা পড়েন, টিউশন ফি বাবদ প্রতিবছর তাঁদের পাঁচ হাজার ডলার (অর্থাৎ পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে প্রায় ২৫ হাজার ডলার) দিতে হয়। এ ছাড়া বেসরকারি মেডিক্যালে প্রতিষ্ঠানভেদে বিদেশি শিক্ষার্থীদের খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার ডলার। অর্থাৎ এই খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ আছে।
কমছে কেন, বাড়ানোর কী উদ্যোগ
মেডিক্যালে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে কেন? বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি, ২০২৪ সাল–পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা—মোটাদাগে এ কারণগুলো সহজে অনুমেয়। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এর বাইরেও কিছু কারণ আছে। নেপাল ও মালদ্বীপে গত কয়েক বছরে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়ার সুযোগ বেড়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পড়তে আসেন বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে। যেসব এজেন্সি রাশিয়া, চীন কিংবা অন্যান্য দেশে পড়ার বন্দোবস্ত করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে তারা আরও সক্রিয় হয়েছে। ফলে ভারত, নেপালসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বিকল্প বিভিন্ন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।
কয়েক বছর আগেও যেমন মালদ্বীপ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসতেন। এখন তাঁরা চীন, রাশিয়া বা মালয়েশিয়ায় পড়ছেন, তবে ইন্টার্নশিপের জন্য আসছেন বাংলাদেশে। দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনা করে প্রতিবছর মালদ্বীপের প্রায় দেড় শ শিক্ষার্থীকে বিনা খরচে এখানকার সরকারি মেডিক্যালে ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হয়।
ইন্টার্নশিপের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন পড়ালেখাটাও এ দেশের মেডিক্যালেই করেন, সে জন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করছে তারা। বিপিএমসিএর জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘গত বছর মালদ্বীপে আমরা মেডিক্যাল এডুকেশন ফেয়ার করেছি। নেপালে করেছি। এ বছর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, এমন কয়েকটি দেশে ফেয়ার করার ইচ্ছা আছে। বাংলাদেশে কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও অনেকে পড়তে আসেন, তাঁদের আমরা মেডিক্যাল এডুকেশনের প্রতি আগ্রহী করতে পারি। তবে শুধু শিক্ষার কথা বললে হবে না। দেশ হিসেবেও আমাদের মার্কেটিং দরকার, ব্র্যান্ডিং দরকার।’