হলুদ ছাড়াই গায়েহলুদ—এখনকার বিয়ের আরও কিছু ট্রেন্ড
ছোটবেলায় একবার গ্রামে গিয়েছিলাম বড় মামার বিয়েতে। তখন বিয়ের দিনটির চেয়েও বেশি আনন্দ হয়েছিল বিয়ের আগের দিন। যে দিনকে আমরা বলি গায়েহলুদ। নানাবাড়ির উঠানে সেদিন যেন উৎসবের আমেজ। আশপাশের বাড়ি ও পাড়া থেকে শিশু, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বাড়ির বয়স্ক মানুষ—সবাই এসে জড়ো হয়েছিল।
উঠানজুড়ে হাসি, গল্প আর হইচই। বড় মামাকে পিঁড়িতে বসিয়ে নাচতে নাচতে গীত গাইতে লাগলেন প্রতিবেশী একদল নারী। গীতগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গেয়ে চলেছেন নারীরা। কখনো কখনো বর বা বউয়ের নাম মিলিয়ে তাৎক্ষণিক কিছু লাইনও যোগ হচ্ছিল, যা শুনে হেসে উঠছিল সবাই।
এরপর শুরু হয় হলুদ মাখানোর পালা। বয়সে যিনি সবচেয়ে বড়, তিনিই আগে হলুদ দিয়ে আয়োজনটির শুভসূচনা করেন। একে একে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবাই হলুদ লাগান বর বা কনেকে। গায়ে হলুদ মাখা শেষে কলসভর্তি পানি ঢেলে গোসল করানো হয় বরকে। কনের বাড়িতেও প্রায় একইভাবে গায়েহলুদ হয়। যদিও জায়গাভেদে কিছু পার্থক্য খেয়াল করা যায়।
হলুদের চলতি ধারা
এখন সময় বদলেছে, বদলেছে গায়েহলুদের আয়োজনও। আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই দুটি আলাদা হলুদের অনুষ্ঠান না করে নবদম্পতির একসঙ্গে গায়েহলুদের আয়োজন দেখা যায়।
শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, সময় ও খরচ—সবকিছু মিলিয়ে এই যৌথ আয়োজন অনেকের কাছেই সহজ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে বদলেছে হলুদের অনুষ্ঠানও। হলুদ মাখানোর বদলে এখন ছোঁয়ানো হয় বেশি।
গত বছরের নভেম্বরে আক্দ সম্পন্ন করেছেন সেতু-রাহি দম্পতি। আক্দের আগে সেতু ও রাহির বাড়িতে আলাদাভাবে ঘরোয়া গায়েহলুদ হয়। তবে সেতুর ইচ্ছা ছিল আক্দের পর দুই পরিবারকে একসঙ্গে নিয়ে আবার গায়েহলুদ করার।
সেই ইচ্ছা থেকেই রিসেপশনের আগের দিন, নভেম্বরের মাঝামাঝিতে রাজধানীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজন করা হয় তাঁদের গায়েহলুদ।
সেতু বলেন, ‘একসঙ্গে গায়েহলুদ করার ইচ্ছা আমার অনেক আগে থেকেই। দুজন মিলিয়ে পোশাক পরেছি, আমাদের দুজনের পরিবার, বন্ধুবান্ধব সবাই এসেছিলেন। আমাদের কাজিনরা কেউ নেচেছেন, কেউ গান গেয়েছেন। আমার তো সবচেয়ে ভালো লেগেছে গায়েহলুদের বউ সাজতে।’
খরচের প্রসঙ্গে সেতু জানান, হলভাড়া থেকে শুরু করে অন্য সব খরচই দুই পরিবার ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। এতে একদিকে যেমন খরচ কিছুটা কম হয়েছে, অন্যদিকে দুই পরিবারের মধ্যে বোঝাপড়া ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।
হলুদ ছাড়া গায়েহলুদ!
গায়েহলুদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাঁচা হলুদের রং। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধারণাতেও এসেছে পরিবর্তন। আজকাল অনেক বর-কনেই গায়ে কাঁচা হলুদ মাখতে চান না। কেউ ত্বকের সমস্যার কথা ভাবেন, কেউবা বিয়ের দিনের মেকআপের কথা মাথায় রাখেন।
মাহফুজা সারাহও তাঁর গায়েহলুদে হলুদ ব্যবহার করেননি। তাঁর গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে বাটা হলুদের মতো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল পানি মেশানো মুলতানি মাটি।
কারণ জানতে চাইলে সারাহ বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল, বেশি হলুদ মাখা হলে বিয়ের দিন আমার ত্বকে মেকআপ ঠিকমতো বসবে না। তবে হলুদ না হোক, কিছু না কিছু তো আমার মুখে লাগাতে চাইবে অতিথিরা। সে জন্যই হলুদের বদলে মুলতানি মাটি রেখেছিলাম।’
আবার কেউ কেউ আগে কখনো কাঁচা হলুদ ব্যবহার না করায় হঠাৎ ব্যবহার করলে ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে, এই আশঙ্কায় উপটান, বেসন বা মুলতানি মাটির মতো বিকল্প বেছে নিচ্ছেন।
ফলে গায়েহলুদের প্রতীকী অর্থ বজায় থাকছে, কিন্তু ব্যবহৃত উপাদানে আসছে বৈচিত্র্য। কেউ আবার জোরাজুরিতে হলুদ মাখলেও সেটা শুধুই হাতের তালুতে বা ওপরের পিঠে অল্প করে হলুদ ছোঁয়ান।
গায়েহলুদের পোশাক
বেশির ভাগ হলুদে একসময় চিকন পাড়ের হলুদ শাড়ি পরতেন কনেরা, গায়ে একটা নতুন গামছা থাকত ওড়নার বিকল্প হিসেবে। এখন সেই ধারা বদলে গেছে। আলাদা করে সিল্ক-জর্জেটের শাড়ি, লম্বা ট্রেনের মতো ওড়না পরছেন।
বরের পোশাকেও নানা বাহার। পাঞ্জাবি-কোটি বেশি পরছেন। কনেকে যেমন ঐতিহ্যবাহী শাড়িতে দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় স্কার্ট, লেহেঙ্গা কিংবা সুতির টপের মতো আধুনিক পোশাকেও। বর-কনে দুজনের পোশাকেই থাকে হলুদ রঙের ছোঁয়া। কখনো তা গাঢ়, কখনো হালকা, আবার কখনো শুধু নকশা বা অনুষঙ্গে।
যত দিন যাচ্ছে, মানুষ তত সাধারণ জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছে। বাংলার খুব প্রাচীন একটা অনুষ্ঠান গায়েহলুদ। প্রাচীন ওই বাঙালিয়ানা ফুটিয়ে তোলার চল যেন আবার ফিরে এসেছে আজকালকার গায়েহলুদে। সুতির টপ কিংবা স্কার্টের মতো সাধারণ পোশাককেও গায়েহলুদের জন্য বেছে নিচ্ছেন কনেরা।ফারহানা হামিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও ডিজাইনার, খুঁত
এই প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যই এখন অনেক কনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হলুদ ও বাসন্তীর পাশাপাশি কমলা, লাল, গোলাপি, বেগুনি ও ম্যাজেন্টা রঙের পোশাকও এখন গায়েহলুদে বেশ জনপ্রিয়।
গায়েহলুদের গয়না
গায়েহলুদে কনের সাজ সম্পূর্ণ করতে বেশ বড় ভূমিকা রাখে গয়না। এ আয়োজনে ভারী অলংকারের বদলে কনেরা সাধারণত ফুলের গয়নাই বেছে নেন। কেউ নিজের পছন্দমতো নকশা করে বানানো তাজা ফুলের গয়না পরেন, কেউ আবার কাপড়ের ফুল দিয়ে তৈরি গয়নায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
এখন তো শীতকাল। এই শীতের আলাদা একটা ঘ্রাণ আছে। কনেরা অনেকে চাইছেন তাঁদের বিশেষ দিনে শীতের এই ঘ্রাণের সঙ্গে কাঁচা ফুলের ঘ্রাণটাও যোগ করে নিতে। ফুলের গয়না কনেকে করে তোলে স্নিগ্ধ। এ ছাড়া ফুলের গয়না পরলে কনেকে দেখতেও সবচেয়ে আলাদা মনে হয়। কনের পাশাপাশি বরেরাও গায়েহলুদে ফুল বা পাতার অনুষঙ্গ ব্যবহার করছেন।জেরিন তাসনিম খান, প্রতিষ্ঠাতা, সিক্স ইয়ার্ডস স্টোরি
হলুদের সাজগোজ
গায়েহলুদে এখন সবচেয়ে ট্রেন্ডি ‘নো মেকআপ’ লুক। ভারী মেকআপের বদলে ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য তুলে ধরতেই আগ্রহী কনেরা।
শোভন মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ও কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা বলেন, ‘খুব বেশি ভারী মেকআপ বা নিজের ত্বকের রঙের চেয়ে অনেক শেড হালকা মেকআপ করার চল এখন নেই বললেই চলে। এখন আমরা দেখি কনেরা নিজেদের ত্বকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সাজতে চাইছেন। এ ছাড়া বরও সব সময় নো মেকআপ লুকে থাকতেই পছন্দ করেন।’
চোখের সাজ অনেকটাই পোশাকের ওপর নির্ভর করে। খুব জমকালো পোশাকে চোখের সাজ খুব ন্যাচারাল বা নুড এবং পোশাক হালকা হলে গ্লিটারি আই মেকাআপ করা যেতে পারে।
সময় বদলেছে, বদলেছে গায়েহলুদের ধরন, পোশাক আর সাজগোজও। তবে যে বিষয়টি বহু বছর আগের মতোই রয়ে গেছে, তা হলো এই দিনটিকে ঘিরে নির্ভেজাল আনন্দ।
এখন শুধু অতিথিরাই নন, বর-কনেও মন খুলে উপভোগ করছেন নিজেদের গায়েহলুদের দিনটি। বন্ধু, কাজিন কিংবা পরিবারের বড়রা সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে রঙিন পোশাকে, গান আর নাচে এই আয়োজনকে করে তুলছেন স্মরণীয়। এই আনন্দই বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গায়েহলুদকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন ‘বর্ণিল বিয়ে’ জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)