ব্যাগ নিয়ে নতুন এই ট্রেন্ড কি বাংলাদেশে বাস্তবসম্মত

সিঙ্গাপুরের মতো শহরে, যেখানে দৈনন্দিন জীবন তুলনামূলকভাবে শান্ত ও নিরাপদ, সেখানে খোলা টোট ব্যাগ বা ঢিলেঢালা মুখ খোলা ব্যাগ বহনের ধারণা নতুন নয়। স্প্রিং/সামার ২০২৬-এর রানওয়েগুলো দৈনন্দিন এই স্বাচ্ছন্দ্যকে তুলে এনে এক সচেতন ফ্যাশন স্টেটমেন্টে দেওয়ার চেষ্টায় আছে।

বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই খোলা ব্যাগ বহনের ধারণা ঠিক বাস্তবসম্মত নয়মডেল: কেয়া, ব্যাগ: গুটিপা। ছবি: সুমন ইউসুফ

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ভিড় ঠেলে যখন অফিসের দিকে যাই, মনোযোগ থাকে ব্যাগে। ব্যাগের একটা দিক খোলা থাকায় দুই হাত দিয়ে কসরত করে ঢেকে রাখার একটা আপ্রাণ চেষ্টা চলতে থাকে। এ অঞ্চলের পকেটমাররা বেশ চটপটে। বুঝে ওঠার আগেই ব্যাগ থেকে জিনিস নিয়ে নিতে পারে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, অনেক দেশেই খোলা ব্যাগ বহনের ধারণা অস্বস্তিকর। বিশেষ করে শহুরে জীবনে ব্যাগটিকে কীভাবে সব সময় সুরক্ষিত রাখা যায়, এই চিন্তা ও চেষ্টায় আমরা অভ্যস্ত। বাস্তব জীবনের এই অভ্যাসের বিপরীতে যাচ্ছে পাশ্চাত্যের ফ্যাশন শোর রানওয়েগুলো। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ২০২৬ সালের জন্য নতুন একটা ধারা নিয়ে আসছে, সেটা হলো হাতের ব্যাগটি খোলা রেখে ঘোরা।

ডিজাইনাররা খোলা ব্যাগকে সংজ্ঞায়িত করছেন আত্মবিশ্বাস আর গতির প্রতীক হিসেবে
ছবি: এক্স থেকে

পাশ্চাত্যে ২০২৬ সালের স্প্রিং/সামার মৌসুমে ‘ওপেন ব্যাগ’ ধারণাটি হয়ে উঠেছে চলতি ধারা। এতে তুলে ধরা হচ্ছে একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা আর সহজাত ভঙ্গি। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে, ব্যবহারকারী জীবনে এতটাই এগিয়ে চলেছেন যে ব্যাগ বন্ধ করার জন্য যে সময়টুকু দরকার, সেটিও তাঁর নেই। ডিজাইনাররা খোলা ব্যাগকে সংজ্ঞায়িত করছেন আত্মবিশ্বাস আর গতির প্রতীক হিসেবে।

ফ্যাশন শোর রানওয়েতে এটি তুলে ধরেছে এমন এক নারীর ছবি, যিনি সব সময় চলমান, যাঁর হাত ব্যস্ত বা ভারী কাজের ভারে, মন অন্য কোথাও। তবে ব্যাগটি কিন্তু অবহেলিত নয়। ভেতরের জিনিসপত্র দৃশ্যমান; কারণ, এখানে লুকিয়ে রাখার কিছু নেই এবং এই খুঁটিনাটি বিষয়টি নিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজনও নেই জীবনে। অনেকের কাছে ব্যাগ খোলা রাখা দীর্ঘদিনের অভ্যাসের বিরুদ্ধে যাওয়া।

আরও পড়ুন

কোন ব্র্যান্ডে এই ধারা এসেছে

ব্র্যান্ড ডিওরের জনাথন অ্যান্ডারসন এই ট্রেন্ডে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন
ছবি: লোফিসিয়েল থেকে

মৌসুমজুড়েই এই ভাবনা বারবার ফিরে এসেছে ব্র্যান্ডগুলোর রানওয়ে উপস্থাপনায়। যেখানে বিলাসবহুল হাতব্যাগগুলো ইচ্ছা করেই খোলা অবস্থায় বহন করা হয়েছে। শ্যানেলের জন্য মাতিয়ু ব্লাজি নতুনভাবে উপস্থাপন করেন ২.৫৫ ব্যাগ, যার মুখ ধাতব তার দিয়ে এমনভাবে শক্ত করা যে তা সব সময় খোলা থাকবে। নকশাটির ভেতরে আছে অন্তরঙ্গ মনোভাব, যেন ব্যবহারকারীর সম্পর্কে ব্যাগ নীরবে কিছু জানিয়ে দিচ্ছে। ব্লাজি বলেন, ‘আমি সময় আর আমরা কী করছি—এসব বিষয়ের প্রতি আগ্রহী।’

ফেন্ডি ব্যাগের ভেতরের চুমকির নকশা হয়ে উঠেছে ব্যাগটির মূল আকর্ষণ
ছবি: লোফিসিয়েল থেকে

এই ভাবনা গুচির জ্যাকি ব্যাগে প্রতিফলিত করেছেন ব্র্যান্ডটির ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ডেমনা গিভাসালিয়া। ইচ্ছা করেই ব্যাগের নকশায় পুরোনো আর আঁচড়ের দাগ নিয়ে এসেছেন। দেখলেই মনে হয়, ব্যাগের গায়ে জমে আছে স্মৃতির অসংখ্য দাগ।

ব্র্যান্ড ডিওরের জনাথন অ্যান্ডারসন এই ট্রেন্ডে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন। অপ্রতিসম বা দুই প্রান্ত সমান নয়, এমন ব্যাগে স্ট্র্যাপের কারণে ব্যবহারকারীর শরীর থেকে সামান্য হেলে থাকে। তবে মুখ বন্ধ করা থাকে। সম্পূর্ণ উন্মুক্ত না হয়েও এতে থাকে একধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ খোলামেলাভাব।

লোয়ে ব্র্যান্ডের ব্যাগ
ছবি: লোফিসিয়েল থেকে

বিপরীতে, লোয়ে ব্র্যান্ডে জ্যাক ম্যাককালো ও লাজারো হার্নান্দেজ চামড়ার পোলো শার্ট, টাওয়েল ড্রেস, জেলি শু থেকে শুরু করে এক স্ট্র্যাপের আমাজোনা ব্যাগ—সবকিছুই রেখেছেন খোলা ও অরক্ষিত।

এই ভাবনার সবচেয়ে আবেগময় প্রকাশ দেখা যায় ফেন্ডিতে, যেখানে সিলভিয়া ভেনচুরিনি ফেন্ডির ফ্যাশন হাউসটির জন্য শেষ সংগ্রহে পিকাবু ব্যাগগুলোর নকশায় এই খোলা ভাবটি রেখেছেন। ভেতরের ফুলের নকশা, চুমকি, পলকা ডট হয়ে উঠেছে ব্যাগটির মূল আকর্ষণ।

আরও পড়ুন

তারকাদের ব্যাগও খোলা

প্যারিসে নিজের স্প্রিং ২০২৬ সংগ্রহ উপস্থাপনের সময় ভিক্টোরিয়া বেকহাম বহন করেছিলেন হালকা বাদামি রঙের একটি আর্মেস কেলি, পুরোপুরি খোলা অবস্থায়
ছবি: লোফিসিয়েল থেকে

রানওয়ের বাইরে, বাস্তব জীবনেও এই ধারা বহন করছেন অনেক তারকা। জেনিফার লরেন্স, ভিক্টোরিয়া বেকহাম ও আরিয়ানা গ্রান্ডে—তিনজনই ওপেন-টপ হ্যান্ডব্যাগ বেছে নিয়েছেন। প্যারিসে নিজের স্প্রিং ২০২৬ সংগ্রহ উপস্থাপনের সময় ভিক্টোরিয়া বেকহাম বহন করেছিলেন হালকা বাদামি রঙের একটি আর্মেস কেলি, পুরোপুরি খোলা অবস্থায়।

নিউইয়র্কে জেনিফার লরেন্সকে দেখা যায় একটি কালো কেলি ব্যাগ খোলা রেখেই ভেতরে কিছু খুঁজছিলেন। আর আরিয়ানা গ্রান্ডে বেছে নেন জনাথন অ্যান্ডারসনের ডিজাইন করা একটি ডিওর ব্যাগ। খোলা থাকলেও ব্যাগটিকে বেশ অভিজাতভাবেই বহন করছিলেন।

ঢাকাবাসীর জন্য ব্যাগ খোলা রেখে চলা নিরাপদ নয় মোটেও
মডেল: রাব্বি, ব্যাগ: গুটিপা। ছবি: সুমন ইউসুফ

সবশেষে বলা যায়, ওপেন-টপ হ্যান্ডব্যাগ বা ব্যাগ খোলা রেখে চলার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাসের বার্তাই প্রচার করা হচ্ছে। যিনি এভাবে ব্যাগ বহন করবেন, তিনি ইতিমধ্যেই পরের গন্তব্যে চলে গেছেন। ব্যাগ বন্ধ করা, তা পরে করলেও চলবে। তবে ঢাকাবাসীর জন্য এটি কতটা নিরাপদ হবে, সেটা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: লোফিসিয়েল

আরও পড়ুন