বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই চলে আসে জামাল নজরুল ইসলামের নাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপকের মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা আছে। তিনি কাজ করেছেন কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে (বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি)। ১৯৮৩ সালে ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ লেখার পর দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম।
করোনাকালে যাত্রা শুরু হওয়ায় অফলাইনের চেয়ে অনলাইন কার্যক্রমকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ক্লাবের সদস্যরা। দেড় বছরে প্রায় ৪৩টি আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার করেছেন তাঁরা। এসবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একেবারে প্রাথমিক থেকে শুরু করে জটিল বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন খ্যাতনামা বিদেশি বিজ্ঞানীরা। নানা সময়ে এই ক্লাবের ওয়েবিনারে অংশ নিয়েছেন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা থেকে চারবার পদকজয়ী বিজ্ঞানী গ্যারি হান্ট, নাসায় কর্মরত বিজ্ঞানী জোনাথন জিয়াং, প্ল্যানেটরি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী পামেলা এল গাই, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের অধ্যাপক জ্যান কার্লটনের মতো বিদেশি বিজ্ঞানীরা। তনিমা তাসনিমের মতো বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সঙ্গেও কাজ করেছেন ক্লাবের শিক্ষার্থীরা।

নতুন একটি ক্লাবের জন্য এত ব্যস্ত মানুষদের সময় পাওয়াটা কতটা কঠিন ছিল? ক্লাবের সভাপতি আল মুজাহিদ আফ্রিদি বলেন, ‘আমরা নিজেরাও অবাক হয়েছি। যখন জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে বিদেশি অধ্যাপক বা বিজ্ঞানীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ই-মেইল করেছি, খুব আগ্রহের সঙ্গে সায় দিয়েছেন তাঁরা। বরং দেশে যাঁরা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের অনেকের কাছ থেকে প্রত্যাশানুযায়ী সাড়া পাইনি।’
ওয়েবিনারের আলোচকেরা শুধু যে আলোচনা করছেন তা নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ক্লাবের সদস্যদের আগ্রহ দেখে তাঁদের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের আমন্ত্রণও জানাচ্ছেন। এই যেমন গ্যারি হান্টের একটি প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছেন ক্লাবের কয়েক সদস্য। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি) দলের বাংলাদেশি সদস্য, জ্যোতির্পদার্থবিদ লামিয়া আশরাফ মওলার সঙ্গেও কাজ করছেন ক্লাবের সদস্যরা।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাগর সরকার বলেন, ‘ক্লাবের শুরুর দিকে আমরা যখন ওয়েবিনারগুলো করতাম, তখন নিজেরাও ঠিক বুঝতাম না, অতিথিদের কী প্রশ্ন করব। কিন্তু এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকেই এত প্রশ্ন আসে যে অনেক প্রশ্ন আমরা নিতে পারি না। সব মিলিয়ে এটুকু বলতে পারি, শুধু পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ নয়, আমাদের ক্যাম্পাসে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।’

জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞানকে আরও সহজ করে তুলে ধরতে নানামুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ক্লাবটি। ‘মহাশূন্য’ নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করে তারা। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে নানা নিবন্ধ, অ্যাস্ট্রোফিকশন, অ্যাস্ট্রো–আর্টসহ জ্যোতির্বিজ্ঞানসম্পর্কিত বাৎসরিক ক্যালেন্ডারও প্রকাশিত হয় সেখানে। আল মুজাহিদ আফ্রিদি বলেন, ‘আমরা বাংলা ভাষায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞানকে আরও ছড়িয়ে দিতে চাই। সে লক্ষ্যে পরিকল্পনা করেছি, দেশি–বিদেশি বিজ্ঞানীদের সহায়তায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে অনলাইন কোর্স তৈরি করব। যেন সহজেই জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে সবাই জানতে পারে।’
ক্যাম্পাসের আশপাশের স্কুলগুলোয় ক্লাবের উদ্যোগে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানসম্পর্কিত সেমিনার, কুইজের মতো আয়োজন। সাগর সরকার বলেন, ‘আমাদের দেশের পাঠ্যপুস্তকগুলোয় জ্যোতির্বিজ্ঞানসম্পর্কিত জ্ঞান লাভের সুযোগ খুব বেশি নেই। তাই আমরা স্কুলগুলোয় সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়তে থাকলে সামনের দিনগুলোয় অ্যাস্ট্রো অলিম্পিয়াডেও শিক্ষার্থীরা ভালো করবেন, পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁদের সামনে নতুন দুয়ার খুলে যাবে।’
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আলমগীর বাদশা বলেন, ‘আমাদের উদ্যমী শিক্ষার্থীরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে যেসব কাজ করছেন, নিঃসন্দেহে তা প্রশংসনীয়। তবে তাত্ত্বিক কাজের পাশাপাশি ব্যবহারিক কাজ আরও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা দরকার।’

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন