পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মৃত্যুর পথে, পরীক্ষা কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ?

এসএসসি, এইচএসসি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির জন্য যুদ্ধ নিঃসন্দেহেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরীক্ষার ফলাফলের পর হতাশা ঘিরে ধরতে পারে উচ্ছল শিক্ষার্থীকে, এই হতাশা আর গ্লানি বইতে হতে পারে বহু বছর। আত্মহননের পথও বেছে নেয় কেউ কেউ। তবে জীবনের চেয়ে সত্যিই কি কোনো কিছু বড় হয়ে উঠতে পারে? নিশ্চয়ই নয়।

পরীক্ষায় জিপিএ পেলেও নম্বর কম এসেছে, তাই মন খারাপ এই শিক্ষার্থীর। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়
ছবি: সৌরভ দাশ

এ কথা ঠিক যে পরীক্ষার ফলাফলের ওপর জীবনের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করে। তবে এটাই জীবনের সবকিছু নয়। কেউ পড়ালেখা শেষে দেশেই চাকরি করবেন, কেউ হবেন উদ্যোক্তা, কেউ হয়তো ঠিকানা খুঁজে নেবেন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য কোথাও। কিন্তু কোনো পরীক্ষার ফলাফলের জন্য জীবন থমকে যাবে না।

ভয় আর ভয়

পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ না হলে কপালে জুটবে বকাঝকা কিংবা মার। এ দেশের বহু পরিবারের গল্পটাই এমন। খোঁটা দিয়েও কথা বলেন অনেক অভিভাবক। তুলনা করেন অন্য কারও সঙ্গে, অপমান করেন।

ফলে নিজ পরিবারেই অপমানিত হয়ে অথবা অপমানিত হওয়ার ভয়ে কোনো কোনো শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

অন্যদিকে অভিভাবক চান, সন্তান কিংবা সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীর কল্যাণ হোক। সে ভালো ফলাফল করুক। ভবিষ্যতে পেশাজীবনে সফল হোক। ফল খারাপ হলে সে পিছিয়ে পড়বে, এই হলো তাঁদের ভয়।

বিশেষত অনেক সাধারণ পরিবারের অভিভাবকেরা বিষয়টাকে এভাবেই দেখেন।

নির্মম এক সত্য

পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ না হলে কপালে জুটবে বকাঝকা কিংবা মার। এ দেশের বহু পরিবারের গল্পটাই এমন
ছবি: প্রথম আলো

আরও একটা ভয় আছে অবশ্য। তা হলো আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা অন্য কোনো অভিভাবকের কথা শোনার ভয়। একজনের ব্যর্থতার খবর শুনে অন্য কারও সাফল্যের কথা রসিয়ে রসিয়ে বলেন, এমন মানুষ আছেন আমাদের আশপাশেই।

ভবিষ্যতেও কোনো উৎসব-আয়োজনে যখনই কেউ জানতে চাইবেন সন্তানের একাডেমিক ক্যারিয়ারের কথা, হয়তো সত্যটা বলতে গিয়ে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে এই অভিভাবকের।

এমন সব আশঙ্কায় এবং রাগে-দুঃখেও সন্তানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফেলতে পারেন তিনি। তাই সমস্যাটা কেবল পরিবারে নয়, বরং সমস্যাটা এই সমাজেই। সমাজের এই আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ভয়টাও একজন শিক্ষার্থীর আত্মহননের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরও পড়ুন

বয়সটাই টালমাটাল

জীবনের এতসব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় যখন অংশ নিচ্ছে কেউ, কতই-বা বয়স তখন তার?
মডেল: সাঁঝবাতি ও তার মা বুড়ি আলী। ছবি: কবির হোসেন

জীবনের এতসব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় যখন অংশ নিচ্ছে কেউ, কতই-বা বয়স তখন তার? মনের জোরই-বা কতটা! এই বয়সে হরমোনজনিত কারণেও অল্পতেই অভিমান হতে পারে। তাই এমন ‘বড়’ পরীক্ষায় খারাপ করলে আবেগের বশবর্তী হয়ে হুট করেই গুরুতর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে সে।

তাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়

সন্তানকে গড়ে তোলার দায়িত্ব অভিভাবকেরই। একই সঙ্গে জীবনকে চেনানোর দায়িত্বও তাঁরই। জীবনে নানা কিছু সামনে আসবে। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যর্থতা তো জীবনেরই অংশ।

একটা পরীক্ষা যত ‘বড়’ই হোক না কেন, জীবনের বিশালতার কাছে তা সামান্যই। এই বোধ যেমন নিজের মধ্যে ধারণ করতে হবে, তেমনি সন্তানকেও শেখাতে হবে। জীবনের আনন্দগুলোকে খুঁজে নিতে শেখাতে হবে।

আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি, রংধনু, অরণ্য, সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা কিংবা বৈচিত্র্যময় প্রাণিকুলের সঙ্গে আপনার সন্তানের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তো? আমাজনের গহিন অরণ্যে ঘুরতে না গেলেও পৃথিবীর বিশালতাকে চেনান। জীবনকে উপভোগ করতে শেখান।

বৃষ্টিতে ভিজে গল্প করতে করতে গন্তব্যে যাচ্ছে তিন শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়
ছবি: সাজিদ হোসেন

পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে? ঝুম বৃষ্টিতে না হয় ভিজুন তাঁকে নিয়ে। বৃষ্টির ধারায় দুজনের কষ্টই মুছে যাক।

আশার কথা বলুন, নিরাশার নয়। একটা ফল খারাপ হয়েছে, আরেকটা ভালো হবে। কীভাবে ভালো হতে পারে, কিসে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য, অভিভাবক হিসেবে তা জানতে চেষ্টা করুন।

সন্তানকে তাঁর পছন্দের কাজ করতে উৎসাহ দিন। শেখান নৈতিকতা ও শিষ্টাচার। ভুল কিছু করতে চাইলে বা করে ফেললেও ভালোমন্দের ফারাক বুঝিয়ে দিন সুন্দরভাবে। ধরে নেবেন না যে বকাঝকা করে আপনি তাকে ‘ঠিক’ করতে পারবেনই।

আরও পড়ুন

অভিভাবক যখন সহযোগী

সন্তানকে জীবনের আনন্দগুলোকে খুঁজে নিতে শেখাতে হবে
মডেল: আশফা, জাকির হোসেন, রিভু, তানভীরা আশরাফ। ছবি: প্রথম আলো

বকাবকি বা দুর্ব্যবহার না করে তার পড়ালেখায় সহযোগী হয়ে উঠতে হবে। তাহলে সন্তানের জীবনটা সুন্দর হয়ে উঠবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন। যেকোনো কাজে ভালো করতে হলে সুস্থতার বিকল্প নেই।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে একাডেমিক ফলাফল আশানুরূপ না-ই হতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সঙ্গে এই হরমোনের সরাসরি যোগসূত্র আছে।

আবার রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত একজন শিক্ষার্থী অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। ফলে সে পড়ালেখার জন্য পর্যাপ্ত শ্রম দিতে সক্ষম না-ও হতে পারে।

একইভাবে মানসিক চাপ কিংবা বিষণ্নতায় ভুগলে শিক্ষার্থীর ফলাফল খারাপ হতে পারে। বুঝতেই পারছেন, ক্লাসের সময়, পরীক্ষার আগে, পরীক্ষার সময় কিংবা পরীক্ষার পর—যেকোনো সময়ই তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটা খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকের।

আরও লক্ষ্য রাখতে হবে, শিক্ষার্থীর আশপাশের পরিবেশে এমন কিছু আছে কি না, যা তাকে মনোযোগী হতে দিচ্ছে না।

রাফিয়া আলম: গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন