মস্তিষ্ক কি সত্যিই মাল্টিটাস্কিং করতে পারে, বিজ্ঞান কী বলে

খুব মনোযোগ দিয়ে অফিসের একটা ই-মেইল লিখছেন। ঠিক সে সময় কানে ইয়ারফোন গুঁজে শুনছেন পছন্দের কোনো গান। ভাবছেন, ‘বাহ! আমি তো দারুণ মাল্টিটাস্কার! একসঙ্গে কত কাজ করে ফেলছি!’ কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। আপনি আসলে একসঙ্গে দুটি কাজ করছেন না, বরং আপনার মস্তিষ্ক বিদ্যুৎ–গতিতে এক কাজ থেকে আরেক কাজে শিফট করছে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে টাস্ক-সুইচিং। আর সত্যিই যদি দুটি কাজ একসঙ্গে করার চেষ্টা করেন, সেটাকে বলে ডুয়াল-টাস্কিং। প্রশ্ন হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কি আদৌ এভাবে কাজ করতে পারে? আমরা যদি জোর করে এভাবে কাজ করি, তাহলে মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে?

আমাদের মস্তিষ্ক কোনো সুপারকম্পিউটার নয় যে একই সঙ্গে প্যারালাল প্রসেসিং বা সমান্তরালে একাধিক কাজ করবে
মডেল: নাজিফা তুশি। ছবি: প্রথম আলো

প্রথমে একটা ভুল ধারণা ভাঙা যাক। আমাদের মস্তিষ্ক কোনো সুপারকম্পিউটার নয় যে একই সঙ্গে প্যারালাল প্রসেসিং বা সমান্তরালে একাধিক কাজ করবে। নেচার নিউরোসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ডুয়াল-টাস্কিং ও টাস্ক-সুইচিংয়ের জন্য মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা দায়ী।

আমাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশের নাম প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এই অংশই সবকিছুর কলকাঠি নাড়ে। মজা করে একে মস্তিষ্কের সিইও বলতে পারেন। আপনি যখন ই-মেইল লেখা বাদ দিয়ে গানে মন দেন, তখন এই সিইওকে অর্ডার দিতে হয়। মস্তিষ্ক তখন ই-মেইল লেখা বন্ধ করে গানের কথায় মন দেয়। আবার গানে মন দিলে ই-মেইল লেখা থেমে যায়।

সমস্যা হলো, এই আসা-যাওয়ার পথে একটা সরু পথ তৈরি হয়। অনেকটা যানজটের মতো। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মস্তিষ্ক যখন এক কাজ থেকে আরেক কাজে শিফট করে, তখন তার প্রচুর শক্তি খরচ হয়। ফলে কাজের গতি কমে যায় এবং ভুলের আশঙ্কা বাড়ে।

আরও পড়ুন

কিছু প্রশ্ন

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ‘তাহলে আমি যে গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলি, সেটা কীভাবে সম্ভব?’ এ কাজ করে মূলত আপনার ওয়ার্কিং মেমোরি। এটি অনেকটা কম্পিউটারের র‍্যামের মতো। এটি সাময়িকভাবে তথ্য ধরে রাখে।

গবেষণায় দেখা গেছে, টাস্ক-সুইচিংয়ের সঙ্গে ওয়ার্কিং মেমোরির গভীর সম্পর্ক আছে। আপনি যখন কাজ বদলান, তখন মস্তিষ্ককে আগের কাজের নিয়মগুলো মেমোরি থেকে মুছে ফেলে নতুন কাজের নিয়ম লোড করতে হয়।

যেমন আপনি যখন অঙ্ক করছেন, তখন আপনার মস্তিষ্কে অঙ্কের সূত্র লোড করা আছে। হঠাৎ কেউ আপনাকে বাজারের ফর্দ ধরিয়ে দিলে মস্তিষ্ককে অঙ্কের সূত্র সরিয়ে ফর্দের হিসাব লোড করতে হয়। এই যে লোড-আনলোডের খেলা, এটাই মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়।

গাড়ি চালাতে চালাতে ফোনে কথা বলার সময় আপনার ওয়ার্কিং মেমোরি কাজ করে
ছবি: পেক্সেলস

যাঁদের ওয়ার্কিং মেমোরি শক্তিশালী, তাঁরা এই সুইচিংটা একটু ভালো করতে পারেন। কিন্তু যাঁদের এটা দুর্বল, তাঁরা সহজেই খেই হারিয়ে ফেলেন।

আমরা যখন কোনো কিছুর দিকে তাকাই বা কোনো কিছু নিয়ে ভাবি, তখন আমাদের মনোযোগের একটা স্পটলাইট সেখানে পড়ে। পাবমেডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের মনোযোগ সব সময় বাইরের জগৎ এবং ভেতরের জগতের মধ্যে আসা-যাওয়ার ওপর থাকে।

অর্থাৎ আপনি যখন ক্লাসে স্যারের লেকচার শুনছেন, তখন হয়তো মনে মনে ভাবছেন, দুপুরে কী খাবেন। এই দুইয়ের মধ্যে মনোযোগের শিফটিং ঘটাতে গিয়েই আমরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস করে ফেলি। এটাকে বিজ্ঞানীরা বলেন কগনিটিভ কন্ট্রোল বা বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ। যাঁরা এই নিয়ন্ত্রণ যত ভালো করতে পারেন, তাঁরা তত বেশি ফোকাসড থাকতে পারেন।

আরও পড়ুন

সমাধান কী

এতক্ষণ তো সমস্যার কথা শুনলেন। এবার আসি সমাধানের কথায়। আমরা কি আমাদের এই ওয়ার্কিং মেমোরি বা মনোযোগের ক্ষমতা বাড়াতে পারি? সুখবর হলো, হ্যাঁ, পারি। বিজ্ঞানীরা ডুয়াল এন-ব্যাক নামে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এটি এমন এক ধরনের মগজের ব্যায়াম, যা আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। এটা একটা গেমের মতো। এই গেমে আপনাকে একই সঙ্গে দুটি জিনিস মনে রাখতে হবে। একটি শব্দ ও একটি অবস্থান। অর্থাৎ শব্দ হলো অডিও এবং অবস্থান হলো ভিজ্যুয়াল। ধরুন, স্ক্রিনে একটি বাক্স বিভিন্ন জায়গায় লাফাচ্ছে এবং একই সঙ্গে কানে বিভিন্ন অক্ষর শোনা যাচ্ছে। আপনাকে মনে রাখতে হবে, ঠিক দুই ধাপ আগে বাক্সটা কোথায় ছিল এবং কোন অক্ষরটা বলা হয়েছিল।

শুনে কি কঠিন মনে হচ্ছে? এটা আসলেই কঠিন! কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত এই ডুয়াল এন-ব্যাক প্র্যাকটিস করেন, তাঁদের মনোযোগের গভীরতা বাড়ে। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের ওয়ার্কিং মেমোরিও শক্তিশালী হয়। অনেকটা জিমে গিয়ে পেশি শক্তিশালী করার মতো ব্যাপার।

একসঙ্গে একাধিক কাজ না করে একটি কাজে মনোযোগ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ
ছবি: পেক্সেলস

মেমোরি ট্রেইনিং কেন ভালো

বয়স বাড়লে মানুষের ভুলে যাওয়ার রোগ বাড়ে, মনোযোগ কমে যায়। একে বলা হয় কগনিটিভ ডিক্লাইন। কিন্তু ডুয়াল-টাস্কিং ও ওয়ার্কিং মেমোরি ট্রেইনিং প্রবীণদের জন্য জাদুর মতো কাজ করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্করা যদি নিয়মিত এ ধরনের মস্তিষ্কের ব্যায়াম করেন, তবে তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতা ভালো থাকে। এমনকি আলঝেইমার্স ডিজিজের মতো রোগকে দূরে ঠেলে দিতেও এটি সাহায্য করতে পারে। কারণ, মস্তিষ্ক যখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন নতুন নতুন নিউরাল পাথওয়ে তৈরি করে।

অর্থাৎ মাল্টিটাস্কিং শব্দটা শুনতে স্মার্ট মনে হলেও এটি আদতে আপনার মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আমরা আদতে মাল্টিটাস্কিং করি না, আমরা করি টাস্ক-সুইচিং। আর এই সুইচিংয়ের খেলায় জিততে হলে দরকার শক্তিশালী ওয়ার্কিং মেমোরি। তাই একসঙ্গে একাধিক কাজ না করে একটি কাজে মনোযোগ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: নেচার নিউরোসায়েন্স, নিউরাল অ্যাভিডেন্স ও পাবমেড ডটকম

আরও পড়ুন