সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া: এই রোগ হলে মানুষ লিটারে লিটারে পানি পান করেন

সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত পানি পানের বিকল্প নেই, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করা ক্ষতিকরছবি: পেক্সেলস

পানি ছাড়া আমাদের চলেই না। সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত পানি পানের বিকল্প নেই। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করা ক্ষতিকর। সাধারণত ডায়াবেটিস থাকলে বেশি তৃষ্ণা পায়। কিন্তু যখন কোনো শারীরিক রোগ ছাড়াই একজন মানুষ কেবল মানসিক তাড়না থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণে পানি পান করতে থাকেন, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় ‘সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া’।

সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া কী

সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া মূলত একটি মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা। এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির শরীরে পানির কোনো ঘাটতি না থাকলেও তাঁর মস্তিষ্ক তাঁকে বারবার পানি পানের সংকেত দিতে থাকে। এটি কোনো সাধারণ তৃষ্ণা নয়, বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক আচরণ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কম্পালসিভ বিহেভিয়ার’। অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগ যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা তীব্র উদ্বেগের রোগীদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

অতিরিক্ত পানি পানের ফলে ‘ওয়াটার ইনটক্সিকেশন’ বা পানি বিষক্রিয়া হতে পারে
ছবি: পেক্সেলস

বিপদ হতে পারে

অতিরিক্ত পানি পানের ফলে শরীরে যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় ‘ওয়াটার ইনটক্সিকেশন’ বা পানি বিষক্রিয়া। আমাদের রক্তে সোডিয়ামের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা থাকে, যা স্নায়ু ও পেশির কাজ সচল রাখে। যখন কেউ প্রচুর বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করেন, তখন রক্তে সোডিয়ামের ঘনত্ব আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘হাইপোনাট্রেমিয়া’ বা শরীরে লবণ কমে যাওয়া।
রক্তে সোডিয়াম কমে গেলে শরীরের কোষগুলো, বিশেষ করে মস্তিষ্কের কোষগুলো পানি শোষণ করে ফুলে যায় বা সেরেব্রাল ইডেমা হয়। এর ফলে মস্তিষ্কের ভেতরে চাপ বেড়ে যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, অনেক সময় মৃত্যুর কারণ।

কীভাবে বুঝবেন

সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়ার কারণে যখন শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:

  • তীব্র মাথাব্যথা ও বমি বমি ভাব।

  • সারাক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব বা মানসিক বিভ্রান্তি।

  • মাংসপেশিতে খিঁচুনি বা দুর্বলতা।

  • অস্বাভাবিক বেশিবার প্রস্রাব হওয়া।

  • গুরুতর অবস্থায় রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

আরও পড়ুন
ওজন কমানোর নেশায় যাঁরা অতিরিক্ত পানি পান করেন, তাঁরাও এই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন
ছবি: পেক্সেলস

কাদের ঝুঁকি বেশি?

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৫ থেকে ২০ শতাংশ এই সমস্যায় ভুগতে পারেন। এ ছাড়া কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও অতিরিক্ত তৃষ্ণা পেতে পারে। অনেক সময় ভুল ধারণা থেকে ওজন কমানোর নেশায় যাঁরা অতিরিক্ত পানি পান করেন, তাঁরাও এই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

প্রতিকার ও চিকিৎসা

এই সমস্যা নিরাময়ে কেবল পানি পানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনলেই হয় না, বরং এর পেছনের মানসিক কারণটি খুঁজে বের করা জরুরি।

১. বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।

২. তরল নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা।

৩. সোডিয়াম পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত রক্তে ইলেকট্রোলাইট বা সোডিয়ামের মাত্রা পরীক্ষা করা।

৪. আচরণগত থেরাপি: কাউন্সেলিং বা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি পানের অভ্যাস কমিয়ে আনা সম্ভব।

মনে রাখতে হবে, কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। পানি পানের ক্ষেত্রেও পরিমিতিবোধ বজায় রাখা জরুরি। পিপাসা না থাকা সত্ত্বেও জোর করে পানি পানের অভ্যাস থাকলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন