প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিকের পার্থক্য কী?
প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক শব্দ দুটি নিয়ে অনেকে দ্বিধায় ভোগেন। দুটিই আদতে আমাদের অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি হলো ভালো ব্যাকটেরিয়া নিজে আর অন্যটি হলো সেই ব্যাকটেরিয়ার খাবার। তাই হজম ভালো রাখা, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
প্রিবায়োটিক কী?
প্রিবায়োটিক হলো এমন কার্বোহাইড্রেট, যেসব আপনার শরীর হজম করতে পারে না। প্রিবায়োটিক আপনার শরীরে থাকা প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার খাবার হিসেবে কাজ করে। প্রিবায়োটিকে আদতে কোনো ব্যাকটেরিয়া থাকে না; বরং এসব এমন উপাদান, যা ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়তে সাহায্য করার খাবার বা জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। সব প্রিবায়োটিকই মূলত একধরনের খাদ্য আঁশ বা ফাইবার।
ইনসুলিন নামের একটি ফাইবার আছে, যা চিকোরি রুট, কলা ও অ্যাসপারাগাসে পাওয়া যায়। এই ইনসুলিন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিবায়োটিক। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে এবং তাদের বৃদ্ধিতে সহায়ক। এ ছাড়া পেঁয়াজ, রসুন, আর্টিচোক এবং ডালজাতীয় খাবারও প্রিবায়োটিকের ভালো উৎস।
যখন কোনো খাবারে প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক—দুটিই একসঙ্গে থাকে, তখন সেই সংমিশ্রণকে বলা হয় ‘সিনবায়োটিক’। সিনবায়োটিক খাবারের মধ্যে চিজ, কেফির এবং কয়েক ধরনের দই উল্লেখযোগ্য।
শুধু প্রিবায়োটিক একা খুব বেশি উপকারী বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি দেখা গেছে, শিশুখাদ্যে প্রিবায়োটিক যোগ করলে সেটি মায়ের দুধের পুষ্টিগুণের কাছাকাছি হয়ে যায়। সাধারণভাবে বলা যায়, প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক একসঙ্গে ব্যবহার করলে তবেই সবচেয়ে কার্যকর ফল পাওয়া যায়।
প্রোবায়োটিক কী?
প্রোবায়োটিক হলো উপকারী অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া, যা আপনাকে খাবার ভাঙতে সহায়তা করে। মানুষ যখন প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কথা বলে, তখন সাধারণত দুটি পরিবারের ব্যাকটেরিয়াকে বোঝায়। যেমন ল্যাকটোবেসিলাস ও বাইফিডোব্যাকটেরিয়াম।
এই ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের অন্ত্রের জন্য উপকারী এবং খাবার হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হালকা গাঁজানো অনেক খাবারে প্রাকৃতিকভাবে প্রোবায়োটিক থাকে । যেমন—
সাওয়ারক্রাউট (গাঁজনপ্রক্রিয়ায় তৈরি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও প্রোবায়োটিক-সমৃদ্ধ একধরনের সংরক্ষিত বাঁধাকপি)
কিমচি
দই
আচার (গাঁজানো)
কটেজ চিজ
এসব ব্যাকটেরিয়া প্রিবায়োটিক খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই এসব খাবারে থাকা ভালো ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে। প্রোবায়োটিক ফুড গ্রেড হেলথ সাপ্লিমেন্ট হিসেবেও পাওয়া যায়। এসব সাধারণত পাউডার বা তরল আকারে বাজারে পাওয়া যায়। বেশির ভাগ প্রোবায়োটিক ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়, যাতে ব্যাকটেরিয়াগুলো জীবিত থাকে এবং বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকে।
প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিকের উপকারিতা
২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রোবায়োটিক ব্যবহার করেছেন। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার উপকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন গবেষণায় প্রোবায়োটিকের উল্লেখযোগ্য কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক নিচের কিছু সমস্যায় কার্যকর হতে পারে—
ডায়রিয়া
আইবিএস
অ্যালার্জি
সাধারণ সর্দি-কাশি
এ ছাড়া গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ বা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। এসব ক্যানসারের বিস্তার প্রতিরোধের উপায় হিসেবেও গবেষণা করা হচ্ছে। কিছু আশাব্যঞ্জক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিস চিকিৎসায় প্রোবায়োটিক উপকারী হতে পারে।ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, বাণিজ্যিক প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক সাধারণত সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রোবায়োটিক কোনো ওষুধ নয়, তাই যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এসব ওষুধের মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না। সে জন্য এসব ব্যবহারের সময় সচেতন থাকা জরুরি।
সিনবায়োটিক (প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক) গ্রহণ শুরু করলে প্রথম দিকে কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে, যেমন: গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, পাতলা পায়খানা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, পেট ফাঁপা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স।
প্রোবায়োটিক খেলে অনেক সময় অ্যালার্জি রিঅ্যাকশন হতে পারে। যদি প্রিবায়োটিক বা প্রোবায়োটিক গ্রহণের পর শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।গর্ভাবস্থায় ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক সাধারণত নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবু নতুন কোনো সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
শেষ কথা
প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক একসঙ্গে ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। ব্যাকটেরিয়ার ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কারণে প্রতিটি প্রোবায়োটিক আলাদা। সব প্রোবায়োটিক সবার জন্য একইভাবে কাজ করে না এবং সবার প্রোবায়োটিক নেওয়ার প্রয়োজনও নেই। যদি আপনার ল্যাকটোজে সমস্যা হয়, তাহলে দুধবিহীন প্রোবায়োটিক বেছে নিন।
ইস্টে অ্যালার্জি থাকলে এমন প্রোবায়োটিক নির্বাচন করুন, যাতে ইস্ট না থাকে। এ ছাড়া যাঁরা অ্যান্টিবায়োটিক নিচ্ছেন, তাঁরা প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক একসঙ্গে নিলে সবচেয়ে বেশি উপকার পেতে পারেন। কারণ, সিনবায়োটিক মৃত উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। সুতরাং প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক হলো একটি স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়, কার্যকর ও নিরাপদ সহায়ক পদ্ধতি।
সূত্র: হেলথলাইন