নখের কোনা দেবে যায় কেন, এমন হলে কী করবেন
নখের কোনা দেবে গেলে ভোগান্তি কম নয়। স্বাভাবিক চলাফেরার সময়ও ব্যথায় কষ্ট হয়। কেন হয় এমন সমস্যা? ভোগান্তি কমাতে কি অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিত? নাকি শল্যচিকিৎসাই সমাধান? এ প্রসঙ্গে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন ডা. রেজা আহমদ-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম
নখ দেবে যাওয়ার কারণ
নখের কোনা বা নখের একটা পাশ দেবে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো বেশ গভীরভাবে নখ কাটা কিংবা নখ কাটার সময় কোনার দিকটা গোলাকার করে কাটা। এভাবে নখ কাটা হলে পরবর্তী সময়ে সেই নখ বাড়ার সময় নখের পাশের নরম অংশের ভেতর দেবে যেতে পারে।
নখে আঘাত পেলেও এমনটা হতে পারে।
জুতা পরলে যদি তা পায়ের সামনের দিকের আঙুলগুলোকে খুব চেপে থাকে, তাহলেও এ সমস্যা হতে পারে।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
যাঁদের ডায়াবেটিস আছে।
যাঁদের পা অতিরিক্ত ঘামে (গরম আবহাওয়ায় লম্বা সময়ের জন্য বদ্ধ জুতা পরে থাকলে পা বেশি ঘামতে পারে)।
যাঁদের পা দীর্ঘ সময় ভেজা থাকে কিংবা যাঁরা পায়ের আঙুলের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারেন না (যেমন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি), তাঁদের ক্ষেত্রে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সংক্রমণের জটিলতা হিসেবেও পায়ের নখ দেবে যেতে পারে।
যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে
নখ দেবে যাওয়ার সমস্যায় সাধারণত পায়ের বুড়ো আঙুল আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত আঙুলে যেসব সমস্যা হতে পারে—
নখের কোনায় বা নখের এক পাশে ব্যথা (বিশেষ করে হাঁটাচলার সময় ব্যথা বাড়তে পারে)।
নখের আশপাশ ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া, কিছুটা গরম হয়ে যাওয়া।
নখের কোণে পুঁজ জমা (যদি সংক্রমণ থাকে)।
চিকিৎসার প্রথম ধাপ বাড়িতেই
নখের কোনো অংশ দেবে যাওয়ার কার্যকর প্রাথমিক চিকিৎসা হলো লবণ মেশানো উষ্ণ পানিতে পা ডুবিয়ে রাখা। প্রতি বেলায় ১০-১৫ মিনিট করে সারা দিনে দু-তিন বেলা এই চিকিৎসা নিলে উপকার মিলবে।
বিশ্রাম নিলেও আরাম পাবেন।
নখের আশপাশ ফুলে গেলে পা কিছুটা উঁচু করে রাখতে পারেন।
ঘরোয়া চিকিৎসায় একটু সাবধান
নখ দেবে গেলে অনেকে নানা ধরনের ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কেউ ‘পটাশ’ পানিতে মিশিয়ে আঙুল ভেজান, আবার কেউ বেগুনের মাথা কেটে ভেতরটা ফাঁকা করে আক্রান্ত আঙুলে ক্যাপের মতো পরিয়ে রাখেন। এসব পদ্ধতির কিছু লোকমুখে প্রচলিত হলেও সবগুলোর কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিশেষ করে ‘পটাশ’ বলতে যদি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বোঝানো হয়, এটি একটি রাসায়নিক পদার্থ। খুব পাতলা দ্রবণ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু ত্বকের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শে এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ঘনত্ব ঠিক না হলে ত্বকে জ্বালা এমনকি রাসায়নিক পোড়াও হতে পারে। তাই ‘পটাশ’–এর দানা সরাসরি আক্রান্ত স্থানে লাগানো বা আন্দাজে ঘন দ্রবণ তৈরি করে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বেগুনের ক্ষেত্রে নখ দেবে যাওয়া সারানোর কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আক্রান্ত আঙুলে কাঁচা বেগুন পরিয়ে রাখলে জায়গাটি দীর্ঘ সময় আবদ্ধ ও ভেজা থাকতে পারে। এতে বরং সংক্রমিত জায়গার পরিচর্যা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে?
পুঁজ জমা হলে প্রাথমিক অবস্থাতেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। এ ছাড়া এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে—
প্রাথমিক চিকিৎসায় উন্নতি না হলে।
তীব্র ব্যথা হলে কিংবা ব্যথা অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে।
ফোলা বা লালচে ভাব অনেকটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে।
নখ ভঙ্গুর হয়ে গেলে বা ভেঙে গেলে।
নখের রং বদলে গেলে।
চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয়?
চিকিৎসকের কাছে গেলেই নখ কেটে ফেলতে হবে ভেবে ভয় পান কেউ কেউ কেউ। তবে বাস্তবতা হলো, নখ কেটে ফেলা বা শল্যচিকিৎসাই এ ধরনের সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়।
চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি আক্রান্ত স্থানটি পরীক্ষা করবেন। সমস্যাটি আদতেই নখ দেবে যাওয়া নাকি পায়ের নখের সংক্রমণের কারণে এমনটা হয়েছে, তা নির্ণয় করবেন। প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন।
কেবল অল্প কিছু ক্ষেত্রে নখের কিছু অংশ কেটে ফেলার (পারশিয়াল নেইল অ্যাভালশন) প্রয়োজন হয়। এই শল্যচিকিৎসায় নখের নিচের ভিত্তি (নেইল বেইজ) এবং জার্মিনাল টিস্যুসহ (যে কোষগুচ্ছ থেকে নতুনভাবে নখ বের হয়) নখের নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা হয়। তাহলে নখ আর ভেতরের দিকে, অর্থাৎ আঙুলের নরম অংশের দিকে বাড়তে পারে না। ফলে পরবর্তী সময়ে নখ দেবে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে।
প্রতিরোধে খেয়াল রাখুন এসব বিষয়
নখ কাটুন সাবধানে। খুব গভীর করে নখ কাটবেন না। পায়ের নখের কোনা গোলাকার করে কাটবেন না। সমান করেই কাটুন। নখ কাটার সময় তাড়াহুড়া করবেন না।
পেডিকিওর করাতে গেলেও এসব বিষয় খেয়াল রাখুন।
এমন জুতা পরবেন না, যাতে পায়ের সামনের অংশ বা আঙুলগুলো চেপে থাকে।
যেসব কাজ করতে গিয়ে নখে আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে (যেমন ফুটবল খেলা), সেসব করার সময় ভালো মানের জুতা পরুন। তাতে আঘাত থেকে সুরক্ষা পাবেন।
নখ খুব বেশি বড় না রাখাই ভালো। বড় নখ থাকলে তা দৈনন্দিন কাজের সময়ও মুহূর্তের অসাবধানতায় ভেঙে যেতে পারে।
পা খুব বেশি ঘামলে লম্বা সময়ের জন্য বদ্ধ জুতা না পরে থাকাই ভালো। আনুষ্ঠানিক কাজের সময় এ ধরনের জুতা পরে বাকি সময় ভিন্ন ধরনের জুতা পরতে পারেন, যাতে অন্তত পায়ের সামনের দিকটা খোলা থাকে।
পায়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। বাড়িতে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি থাকলে তিনি তা পারছেন কি না, সেদিকে খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনে সাহায্য করুন।
পা ভিজে গেলে ঝটপট মুছে ফেলুন। খেয়াল রাখুন, পায়ের আঙুলের ফাঁকের কোনো অংশও যেন ভেজা না থাকে।র ফাঁকের কোনো অংশও যেন ভেজা না থাকে।