শোবার ঘরই আপনার রোগের কারণ নয় তো?
সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে শোবার ঘরেই আমরা পাই প্রশান্তি। তবে কখনো কখনো এই ঘরও হয়ে উঠতে পারে আপনার রোগের কারণ। কিংবা বাড়িয়ে দিতে পারে কোনো রোগের ভোগান্তি। এ সম্পর্কে ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম
শোবার ঘরের দেয়াল, বিছানা, বালিশ, কার্পেট, এমনকি সুগন্ধিও আপনার স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গের ব্যবহারের ভুলের কারণেও। তবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখলেই এই ঝুঁকি কমিয়ে ফেলা সম্ভব।
বিছানা-বালিশ ঠিকঠাক তো?
ভুল বালিশ ব্যবহারে ঘাড়ব্যথা হতে পারে। ভুল বিছানায় ঘুমালে বাড়ে কোমরব্যথার ঝুঁকি। এসব অনুষঙ্গ কেনার সময় স্বাস্থ্যের দিকটা মাথায় রাখুন। কখন বদলে ফেলতে হবে, তা-ও জেনে রাখুন।
বালিশ হতে হবে আরামদায়ক। তবে এতটাও নরম নয়, যা মাথার চাপে নিচু হয়ে যায়।
খুব উঁচু বা খুব নিচু বালিশ নেবেন না। এমন উচ্চতার বালিশ বেছে নিন, যাতে ঘাড়ের স্বাভাবিক বক্রতা (কার্ভ) বজায় থাকে।
বিছানা হতে হবে একটু শক্তপোক্ত (মাঝারি দৃঢ়তার), যেন শরীরের ভারে সহজে নিচু হয়ে না যায়। শক্ত জাজিমের ওপর নরম তোশক বিছিয়ে নিলে কিন্তু লাভ হবে না। বিছানায় শোবার সময় মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বক্রতা বজায় থাকতে হবে। তবে অতিরিক্ত শক্ত বিছানা ব্যবহার করাও উচিত নয়।
যত্ন নিন, বদল আনুন
বালিশ, জাজিম, তোশক, ম্যাট্রেস সময়মতো বদলে ফেলুন। এসবের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হলে, অর্থাৎ অল্প চাপেই আকৃতি বদলে গেলে বুঝতে হবে, বদলে নেওয়ার সময় হয়ে গেছে।
তবে যত্নের সঙ্গে ব্যবহার করলে জাজিম, তোশক ও ম্যাট্রেস বহুদিন টেকে।
জাজিম, তোশক বা ম্যাট্রেস—শোবার জন্য যেটিই ব্যবহার করুন না কেন, মাস তিনেক পরপর (কিংবা নির্দেশনা অনুযায়ী) সেটির অবস্থান বদলে ফেলুন। অর্থাৎ মাথার দিক ঘুরিয়ে পায়ের দিকে আনুন।
একই সঙ্গে তা পুরোপুরি উল্টে দিন (যদি ওলটানো যায়)। অর্থাৎ নিচের পৃষ্ঠকে ওপরের দিকে নিয়ে আসুন। তবে মেমোরি ফোম ম্যাট্রেস বা পিলো-টপ ম্যাট্রেসের মতো আধুনিক ম্যাট্রেস ওলটানোর সুযোগ নেই।
তুলার বালিশ, জাজিম বা তোশক বছরে অন্তত একবার কড়া রোদে দেওয়া ভালো।
ঘরের যত কাপড়
বিছানার চাদর, বালিশের কভার, পর্দা, কার্পেট, শতরঞ্জি, পাপোশ প্রভৃতি অনুষঙ্গ অবশ্যই পরিষ্কার রাখুন। এসবে লুকিয়ে থাকতে পারে নানা অণুজীব এবং বাতাসে ভেসে আসা বিভিন্ন কণা।
এসবের কারণে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষত কারও যদি হাঁপানি থাকে কিংবা অ্যালার্জিজনিত অন্যান্য সমস্যা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেকটাই বেশি।
তবে সচেতন থাকা প্রয়োজন সবারই। পরিষ্কার দেখালেও প্রতি সপ্তাহেই অন্তত বিছানার চাদর ও বালিশের কভার বদলে ফেলা উচিত।
ঘরের পরিবেশ
ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের ওপর আলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। আলো, শব্দ ও অস্বস্তিকর তাপমাত্রার কারণে গভীর ঘুমে বাধা আসতে পারে।
ভালো ঘুম না হলে দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বাতাসে রাসায়নিকের উপস্থিতি কিংবা ঘরে ছত্রাকের উপস্থিতির কারণে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে (বিশেষত যাঁদের হাঁপানি বা অ্যালার্জি আছে)।
তাই খেয়ালে রাখুন এসব বিষয়
বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন, যাতে ঘর আর্দ্র বা স্যাঁতসেঁতে হয়ে না পড়ে। প্রয়োজনে ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন।
দেয়াল, ছাদ বা আসবাব স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলে বা এসবে ছত্রাক দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করুন।
ঘুমের সময় ঘর অন্ধকার রাখুন। বাইরের আলো ঠেকাতে ‘ব্ল্যাকআউট’ পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। ডিমলাইটের আলোও ভালো ঘুমের অন্তরায় হতে পারে।
বাইরে শব্দ থাকলে ঘুমের সময় জানালা আটকে দিন। তবে ঘরের ভেতর বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও রাখুন। এ ক্ষেত্রে দরজা কিছুটা খোলা রাখতে পারেন।
ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখতে চেষ্টা করুন।
মশা তাড়াতে কয়েল, স্প্রে বা অন্যান্য রাসায়নিক পণ্যের পরিবর্তে মশারি ব্যবহার করুন।
সুগন্ধ আনতে চাইলে প্রাকৃতিক উপায় (যেমন ধোঁয়ায় অ্যালার্জি না থাকলে প্রাকৃতিক মোম, পরাগরেণুতে অ্যালার্জি না থাকলে ফুল) বেছে নেওয়া ভালো।
ঘরে, বারান্দায় বা বাথরুমে ধূমপান করবেন না।
অনুষঙ্গের সঠিক ব্যবহার
বিছানায় শুয়ে টেলিভিশন দেখা ঠিক নয়। দীর্ঘক্ষণ ঘাড় বাঁকা করে থাকলে ঘাড়ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া ভালো ঘুমের জন্য বিছানা কেবল বিশ্রামের জন্য রাখাই ভালো।
বিছানায় খাবার নেবেন না। খাবারের কণা ঘুমের সময় অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
অপরিষ্কার বা ভেজা পায়ে বিছানায় উঠবেন না। পাপোশ ব্যবহার করুন।