সিভিতে একটা ‘এমবিএ ডিগ্রি’ থাকা কি খুব জরুরি
লিখেছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বুশরা হুমায়রা।
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—যেকোনো বিষয়ে স্নাতক শেষে একটা এমবিএ ডিগ্রি না নিলে বোধ হয় ক্যারিয়ারে পূর্ণতা আসে না। বিশেষ করে চাকরির বাজারে নিজেকে যোগ্যতর প্রমাণ করার দৌড়ে সবাই সিভিতে একটা এমবিএ ট্যাগ লাগাতে মরিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবার জন্য এমবিএ করা যেমন জরুরি নয়, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে এটি সময় ও অর্থের অপচয়ও হতে পারে।
অনেকেই কেবল বন্ধুরা করছে বলে, কিংবা পরিবারের চাপে এমবিএতে ভর্তি হন। কিন্তু আপনি যদি টেকনিক্যাল বা প্রকৌশলে পড়ে (যেমন সফটওয়্যার প্রকৌশল বা বায়োটেকনোলজি) ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে প্রাথমিক অবস্থায় এমবিএ আপনার কোনো কাজে আসার সম্ভাবনা নেই। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই তাত্ত্বিক ম্যানেজমেন্ট শিখে তা প্রয়োগ করার সুযোগ পাওয়া কঠিন। বিশ্বের অনেক নামী বিজনেস স্কুলে অন্তত ২-৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া এমবিএ করার সুযোগ দেওয়া হয় না। বাস্তব কর্মক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে কাজ করার বা সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা না থাকলে ক্লাসরুমের কেস স্টাডিগুলো কেবল মুখস্থ বিদ্যার মতো মনে হবে। অভিজ্ঞতাহীন এমবিএ ডিগ্রিধারীদের চাকরি দিতে অনেক প্রতিষ্ঠান দ্বিধাবোধ করে।
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, একটি মানসম্মত প্রতিষ্ঠান থেকে এমবিএ করতে বেশ বড় অঙ্কের টাকা এবং অন্তত দুই বছর সময় লাগে। আপনি যদি সেই দুই বছর কোনো প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি-লেভেল কাজ করেন, তবে দুই বছর পর আপনার যে অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, তা অনেক সময় ডিগ্রির চেয়ে বেশি মূল্যবান।
বিকল্প পথ
আপনি যদি এমবিএ না করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়ার ভয় নেই। অনেক বিকল্প ডিগ্রি আছে। বিশেষায়িত পেশাদার সার্টিফিকেট কোর্স করার সুযোগ আছে। এমবিএ একটি সাধারণ ডিগ্রি, যা আপনাকে সব বিষয়ে কিছুটা ধারণা দেয়। কিন্তু আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো খাতে দক্ষ হতে চান, তবে পেশাদার কোর্স অনেক বেশি কার্যকর। ফিন্যান্সের জন্য সিএফএ, সিএ বা এসিসিএ; প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য পিএমপি। এখন তথ্যের (ডেটা) যুগ। আপনি যে বিষয়েই পড়েন না কেন, উপাত্ত বিশ্লেষণ (ডেটা অ্যানালাইসিস) শেখা আপনার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। পাইথন বা এক্সেলের ভালো কাজ জানলে আপনি এমবিএ ছাড়াই অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ভালো অবস্থানে যেতে পারবেন। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ আছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির দিনে, বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার ডিপ্লোমা করার সুযোগ দেয়।
সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ
পড়াশোনা শেষে দ্রুত চাকরিতে ঢুকে পড়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। দুই বছর কাজ করলে আপনি বুঝতে পারবেন, ক্যারিয়ারের জন্য আসলে কোন ডিগ্রিটি প্রয়োজন। হয়তো দেখা যাবে আপনার এমবিএ নয়, সাপ্লাই চেইন বা এইচআরএমে একটি ডিপ্লোমা করলেই কাজ চলছে।
কখন এমবিএ করবেন
এমবিএ একদমই অপ্রয়োজনীয় নয়, তবে তা করতে হবে সঠিক সময়ে। সঠিক সময়টা কখন?
যখন আপনার তিন থেকে পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা হবে।
যখন আপনি মিড-লেভেল ম্যানেজমেন্ট থেকে টপ-লেভেল ম্যানেজমেন্টে যেতে চাইবেন।
যদি আপনি ক্যারিয়ার পরিবর্তন করতে চান (যেমন প্রকৌশল থেকে পুরোপুরি ব্যাংকিং বা ব্যবসাসংক্রান্ত কাজে)।
শিক্ষার্থীদের প্রতি পরামর্শ
ক্যারিয়ার কোনো রেস বা দৌড় প্রতিযোগিতা নয় যে সবাইকে একই পথ অনুসরণ করতে হবে। আপনি যদি একজন ভালো কোডার হতে চান, তবে এমবিএর পেছনে সময় না দিয়ে নতুন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শিখুন। আপনি যদি সৃজনশীল কাজ করতে চান, তবে নিজের পোর্টফোলিও ভারী করুন। মনে রাখবেন, নিয়োগকর্তারা এখন আর আপনার সিভির নিচের দিকের ডিগ্রি অতটা দেখেন না, যতটা দেখেন আপনি তাদের কোম্পানির সমস্যা সমাধানে কতটা দক্ষ। তাই হুজুগে পড়ে এমবিএ করতে ভর্তি হওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই ডিগ্রিটি কি আমাকে আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে, নাকি এটি কেবল একটি কাগজের সনদ হয়ে থাকবে? দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ করুন, পৃথিবী এখন দক্ষ মানুষের সন্ধানেই ব্যস্ত।