অঙ্কুর ওঠা ঠেকাতে আলুর সঙ্গে আপেল রাখার পদ্ধতি কি আসলেই কাজ করে?
বাজার থেকে একসঙ্গে বেশ কিছু আলু কিনে আনি আমরা অনেকেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় কয়েক দিন পর, যখন হঠাৎ আলুতে ‘চোখ’ গজাতে শুরু করে, কখনো কখনো সবুজ ছোপও দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঝামেলা এড়ানোর একটি সহজ ‘ট্রিক’ মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে। আলুর সঙ্গে একটি আপেল রেখে দিলে নাকি আলুতে অঙ্কুর ওঠে না। কিন্তু সত্যিই কি এ পদ্ধতি কাজ করে? বিজ্ঞান কী বলে আর বাস্তবে কী হয়, সেটাই দেখা যাক।
এটা আমরা ভালোভাবেই জানি, আলু ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে খুব তাড়াতাড়ি অঙ্কুর গজায়। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির আলু গবেষণা কর্মসূচির পোস্টহারভেস্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, আলু রাখতে হয় ঠান্ডা, অন্ধকার এবং বাতাস চলাচল করে, এমন জায়গায়। না হলে আলু ‘জেগে ওঠে’।
অঙ্কুর ওঠা আলু পুরোপুরি ফেলেই দিতে হবে, তা নয়। অঙ্কুরের অংশটা ভালো করে কেটে ফেললে আলু খাওয়া যায়। তবে আলু যদি সবুজ হয়ে যায়, তখন আর খাওয়া নিরাপদ নয়।
আপেল–আলুর ট্রিকের পেছনের বিজ্ঞান
এই ট্রিকের পেছনে আছে একধরনের গ্যাস—ইথিলিন। আপেল, কলা, টমেটোর মতো ফল স্বাভাবিকভাবেই এই গ্যাস ছাড়ে। এই ইথিলিন ফল পাকাতে সাহায্য করে, আবার কিছু সবজির বয়স বাড়ার গতি ধীরও করতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট মাত্রায় ইথিলিন গ্যাস দিলে ঠান্ডা পরিবেশে রাখা আলুর অঙ্কুর গজাতে দেরি হয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘জার্নাল অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’তে।
এ কারণেই ইউরোপে আলু সংরক্ষণের পুরোনো কেমিক্যাল (সিআইপিসি) নিষিদ্ধ হওয়ার পর বড় বড় আলু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইথিলিন ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তবে স্টেট ইউনিভার্সিটির আলু গবেষণা কর্মসূচির পোস্টহারভেস্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও বিষয়টি ঠিকমতো কাজ করানো কঠিন।
তাহলে ঘরে শুধু একটা আপেল রাখলেই হবে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষকেরা রান্নাঘরে ছোট্ট পরীক্ষা চালান। এক ব্যাগ আলু ভাগ করা হয় দুই অংশে—একটি অংশে রাখা হয় একটি আপেল, অন্যটিতে কিছুই নয়। দুটিই রাখা হয় অন্ধকার ও তুলনামূলক ঠান্ডা জায়গায়।
ফলাফল? অবাক করার মতো। আপেল রাখা ব্যাগের আলুতেই আগে অঙ্কুর গজায়, তা–ও আবার সাত দিনের মাথায়। অন্য ব্যাগে অঙ্কুর গজায় এক দিন পরে।
এর কারণ কী?
গবেষকেরা বলেন, ইথিলিন কাজ করবে কি না, তা নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর—
বাতাসে ইথিলিনের পরিমাণ
আলুর জাত
পরিবেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা
আলু আগে কোনো সংরক্ষণ–প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছে কি না
বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই নিয়ন্ত্রণগুলো ঘরে রাখা বেশ কঠিন।
কলা কি আপেলের চেয়ে ভালো?
মজার একটি তথ্য হলো, একবার একটি বিজ্ঞান মেলায় এক শিক্ষার্থী পরীক্ষা করে দেখেছিল, আলুর সঙ্গে আপেল ভালো কাজ করে, নাকি কলা। শেষমেশ দেখা গেছে, কলা বেশি ইথিলিন ছাড়ে, তাই কিছু ক্ষেত্রে কলা তুলনামূলক বেশি কার্যকর। তবে এখানেও একই কথা—আলুর সঙ্গে রাখা ফল ও পরিবেশভেদে ফলাফল বদলাতে পারে।
তাহলে আলু ভালো রাখার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় কী?
আপেল বা কলা রাখলে ক্ষতি নেই, কিন্তু ভরসা করার মতো পদ্ধতি নয়। আলু দীর্ঘদিন ভালো রাখতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা যা বলেন—
১. ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায় রাখুন
বাংলাদেশে ফ্রিজের বাইরে সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো বাতাস চলাচল করে, এমন অন্ধকার কোণ বা আলমারির নিচের তাক।
২. বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন
প্লাস্টিকের ব্যাগে আলু রাখবেন না। ঝুড়ি, নেট ব্যাগ বা কাগজের বস্তা ভালো।
৩. পেঁয়াজের সঙ্গে রাখবেন না
পেঁয়াজ এমন গ্যাস ছাড়ে, যা আলু দ্রুত নষ্ট করে।
৪. ফ্রিজে রাখা ঠিক নয়
ফ্রিজে রাখলে আলুর স্টার্চ চিনি হয়ে যায়, স্বাদ ও রান্নার মান—দুটিই নষ্ট হয়।
৫. খারাপ আলু আলাদা করে ফেলুন
একটি পচা আলুই পুরো ঝুড়ি নষ্ট করতে পারে।
শেষ কথা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রিক শুনতে সহজ আর আকর্ষণীয় হলেও সব সময় তা বাস্তবে কাজ করবে, এমন নয়। আলু ভালো রাখতে চাইলে সঠিক অভ্যাসই সবচেয়ে বড় ভরসা।
সূত্র: অল রেসিপিস