ঢাকাই খাবারে মোগলাই স্বাদ
বাবরপুত্র হুমায়ুনের সময় থেকে খাবারেও শুরু হয় পরিবর্তন। পারস্য থেকে আনা হয় বাবুর্চি, রাজকীয় রান্নায় যুক্ত হতে থাকে বৈচিত্র্যময় সব খাবার। ইরানি পাচকদের গুণে রন্ধনে চলে আসে কিছু সূক্ষ্মতা।
মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের প্রিয় ছিল ঝলসানো খরগোশের মাংস। মোগলদের খাদ্যতালিকায় সেই মধ্য এশীয় ও তুর্ক পদ্ধতির ঝলসানো শুকনা মাংসের সঙ্গে থাকত অনেকটা গাজরভাজা। আরও থাকত পুর দেওয়া ভেড়ার মাংস, শিক কাবাব, তন্দুরে সেঁকা মুরগি, কোফতা ইত্যাদি।
বাবরপুত্র হুমায়ুনের সময় থেকে খাবারেও শুরু হয় পরিবর্তন। পিতার সাম্রাজ্য হারিয়ে ইরানের শাহর দরবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন বেচারা, তাঁরই সাহায্যে পরে নিজের সিংহাসনও ফিরে পান। ইরানে নির্বাসিত জীবনে পারস্যের খাবারের প্রেমে পড়ে যান তিনি। দিল্লি ফেরার পর মোগল পাকশালায় লাগে ইরানি হাওয়া। পারস্য থেকে আনা হয় বাবুর্চি, রাজকীয় রান্নায় যুক্ত হতে থাকে বৈচিত্র্যময় সব খাবার। ইরানি পাচকদের গুণে রন্ধনে চলে আসে কিছু সূক্ষ্মতা।
সম্রাট আকবর খুব একটা মাংসপ্রেমী ছিলেন না। দুধ বা দই দিয়ে শুরু করতেন খাবার। মাংস না খেলে পোলাও, খিচুড়ি, মসলায় ফোটানো ময়দা, আটা, ডাল, পালংশাক, হালুয়া, শরবত ইত্যাদি খেতেন।
সিংহাসনে আরোহণের আগে বড় একটা সময় পাঞ্জাব ও কাশ্মীরে কাটানোয় সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে মোগল বাবুর্চিখানায় ওই দুই প্রদেশের খাদ্য–প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণ ছিল।
আর শিল্পকলার মতো রন্ধনশৈলীরও বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। তাঁর সময়ে মোগল খাদ্যে যুক্ত হয় পর্তুগিজদের আনা মরিচ, আলু, টমেটো। ফলে লালকেল্লার বাদশাহি খাবারে যুক্ত হয় কোরমা, কালিয়া, বিরিয়ানি আর বিচিত্র সব কাবাব, নানা ধরনের সবজিতে আসে রঙের বাহার। রকাবখানায় (রুটি তৈরির ঘর) তন্দুরে তৈরি হতো নানা আকারের রুটি। শুরু হয় বুজুর্গি তন্দুরি (বড় তন্দুর), তনখ তবকি (তাওয়ায় সেঁকা রুটি), খেজুরি রোগান, মিঠি রোগানসহ নানা বাহারি রুটির চল।
সম্রাট আওরঙ্গজেবেরও ছিল সুখাদ্যের প্রতি দুর্বলতা। তাঁর প্রিয় ছিল ছোলার ডাল আর চালের কুবুলি। ছেলের কাছে একবার অনুযোগ করে লিখেছিলেন, ‘তোমার ওখানে খিচুড়ি আর বিরিয়ানি খেয়ে আমি তোমার বাবুর্চি সুলেমানকে চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি দাওনি। যাক, সুলেমানের যদি কোনো যোগ্য শাগরেদ পাও, আমার কাছে পাঠিয়ো। খাওয়ার লোভ আমাকে এখনো পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি।’
শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের রাজ্য দিল্লির লালকেল্লার চার দেয়ালের মধ্যে সীমিত হয়ে গেলেও দিল্লির সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বেশি বিকাশ তাঁর সময়েই ঘটেছিল। একাধারে তিনি ছিলেন কবি ও খাদ্যরসিক। প্রায় সময় পেটের অসুখে ভুগলেও বুড়ো বয়সেও ভালো খাবারের লোভ সামলাতে পারতেন না। তাঁর ভোজন তালিকায় থাকত খাসি করা মোরগ, হরিণের মাংসের কাবাব, ভাজা তিতির, ঝলসানো পাতিহাঁস ও অল্প আঁচে সারা রাত রান্না করা কচি ভেড়ার বুকের মাংস, টক দই, আলু–মসলায় রান্না করা মাছ। এ ছাড়া মোরগ পোলাও, বিরিয়ানি, নান, পরোটা, কুলচা, বাকরখানি ও নানা পদের ক্ষীরজাতীয় খাবার খেতেন। নিজেও নতুন ধরনের কিছু রান্না আবিষ্কার করেছিলেন বাহাদুর শাহ। এই পদগুলোর নাম শুনে অবাক হতে হয়—করলার হালুয়া, মরিচের হালুয়া, রাহাতজানি নামের একধরনের চাটনি। বাদশাহর পছন্দের মুগডালের পদের নাম ‘দালশাহ কি পাসন্দ’। এই ডাল খেয়ে বাদশাহর জন্য রীতিমতো এক চতুষ্পদী লিখে ফেলেছিলেন মির্জা গালিব।
লক্ষ্ণৌ হয়ে ঢাকা
উপমহাদেশে মুসলিম রন্ধন–ঐতিহ্য তিনটি ঘরানায় বিভক্ত—দিল্লি, লক্ষ্ণৌ ও হায়দরাবাদি। ঢাকাই খাবার লক্ষ্ণৌর প্রভাবাধীন। শুধু ঢাকাই না, মুসলিমপ্রধান ভারতের অন্য শহরগুলোকেও এটা প্রভাবিত ও অনুসরণীয় করেছিল। মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর ভারতীয় রান্নার সঙ্গে মোগল রন্ধনশৈলীর সংমিশ্রণে জনপ্রিয় ও নতুন নতুন খাবার তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন লক্ষ্ণৌর নবাবরা। কাশ্মীর, পাঞ্জাব, হায়দরাবাদের নবাবদের অবদানও কম নয়। কাবাব, কোরমা, কালিয়া, বিরিয়ানি, শিরমাল, নেহারি, তাফতান, রুমালি রুটি, জর্দার ভিন্ন ভিন্ন প্রকার—সবই তাঁদের সময়ের দান।
দীর্ঘ সময় ধরে বাংলার মোগল রাজধানী ছিল ঢাকা। ফলে ঢাকাই খাবারের মূল বৈশিষ্ট্যই হয়ে ওঠে মোগল রন্ধনকলা। নবাবি আমল ও ইরানি, আর্মেনীয় ও উত্তর ভারতের বণিক-বেনিয়াদের অবস্থানের কারণে তারাও এই অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে সুস্পষ্ট ছাপ রেখে যায়। পাশাপাশি সময়ের ধারাবাহিকতায় এই মোগলাই ঘরানার খাবারের সঙ্গে বিবর্তিত রূপে যুক্ত হতে থাকে ইংরেজ আমল এবং স্থানীয় ও বিভিন্ন সংস্কৃতির খাবার। এই সামষ্টিক খাবার থেকেই ঢাকা তৈরি করে নিয়েছে তার খাবারের নিজস্ব এক রূপ। যেটি বিশেষ এক ঘরানার জন্ম দিয়েছে, যাকে আমরা বলি ঢাকাই খাবার।
কাবাব থেকে বিরিয়ানি কিংবা কোরমা থেকে মিঠাই—সব বিভাগেই ঢাকার রয়েছে ভিন্নতা। তার নমুনা এই শহরের খাবারের মধ্যে লুকিয়ে আছে। নাম বা শব্দবিশেষে যুক্ত হয়েছে শাহি খাবার। ফারসি অর্থে রাজকীয়বিশেষ। ঢাকার প্রধান কাবাব ‘পাসন্দের কাবাব’ বা ‘সুতি কাবাব’। এটি ঢাকার সৃষ্টি। এক শিকে ১৫ থেকে ২০ কেজি গরুর মাংসের তৈরি এই কাবাব সত্যি বিস্ময়কর। উৎসবপ্রধান কাবাব মুর্গ মোসাল্লম। তাওয়ানির্ভর আস্ত মোরগের এই কাবাবকে ঢাকাই বৈশিষ্ট্য দান করেছে এর মসলাগত উপাদানের পার্থক্য।
ঢাকার বিশিষ্ট পোলাও হলো মোরগ পোলাও, যার আরেক নাম খাচ্চা পোলাও। ঢাকার সাদা পোলাওকে বলা হয় হোগলা পোলাও। আর সবচেয়ে সহজলভ্য ও জনপ্রিয় খাবারটি হলো তেহারি। সকালের মন ভালো করা খাবার, যা নবাবের ফৌজিদের সকালের নাশতা হিসেবে তৈরি করা হতো। কাচ্চি ঢাকার উৎসবপ্রধান খাবার। তবে ঢাকা শহরময় কাচ্চি বিরিয়ানির ভাই-ব্রাদারের এত যে জনপ্রিয়তা, তা কিন্তু মূলত ঢাকাই কাচ্চি নয়। বাসমতী নয়, ঢাকাই কাচ্চিতে ব্যবহৃত হয় সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল। প্রচুর মসলাসহযোগে রাজকীয় এই খাবার এখানকার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় উপযুক্ত নয়, তাই রান্না হয় শীতকালে। আদি কাচ্চি বিরিয়ানিতে আলু ব্যবহার করা হতো না। নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর নামে কলকাত্তাইয়া কাচ্চিতে আলুর মিশ্রণ ঘটে। ঢাকার বাহারি পোলাওগুলোর মধ্যে আখনি পোলাও, মাহি পোলাও (মাছবিশেষ), সোয়াই পোলাও (শাকবিশেষ), খিচুড়ি রান্নায় নতুনত্ব ও উদ্ভাবনী ব্যাপারগুলো ঢাকার গৃহিণীরা তাঁদের প্রাত্যহিক রন্ধনকাজের মাধ্যমে বিকশিত করেন।
আরও কিছু ঢাকাই খানা
ঢাকার মসলাদার কোফতা, কিমা, কালিয়া, দোলমা রান্নায়ও রয়েছে বিশেষত্ব। জাহাজি কালিয়া, শবডেগ, শিশরাঙা আজ বিলুপ্তপ্রায়। শির খুরমা, শাহি টুকরা, ফালুদা, মোরব্বা, বরফি, জিলাপি, মাকুতি, জর্দা—এসব মোগলীয় দানও ঢাকার নিজস্ব ঢঙে বদলে গেছে। মোগল আমল থেকেই ঢাকার পনির বিখ্যাত। ঢাকাই পনির উপমহাদেশে অন্য পনিরের মতো নয়। ঢাকার নামে হলেও উৎপাদিত হতো কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে।
ঢাকার অধিবাসীদের খাদ্য ও নাশতায় অতি পছন্দনীয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ বাকরখানি। ভারতের মোগল সমকালীন কোনো শহরের সঙ্গে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই রুটির কোনো সম্পর্ক ছিল না। ঢাকা ছাড়াও ভারতের কাশ্মীর, লক্ষ্ণৌ আর পাকিস্তানে বাকরখানির চল রয়েছে। মোগল আমলে কাশ্মীরিদের মাধ্যমে ঢাকায় বাকরখানির আগমন। তবে ঢাকার বাকরখানি কাশ্মীরের অনুরূপ নয়। লক্ষ্ণৌতে বাকরখানি রুটিকে বলে শিরমাল, সেটি তৈরির প্রক্রিয়াও ভিন্ন। যদিও বাকরখানি তাদের খাবারের প্রধান বা অন্যতম রুটি ছিল না। ঢাকার তৈরি বাকরখানি তৎকালে তৈরি হওয়া রুটির স্বাদ, মান ও বৈচিত্র্যের কারণে অন্য যেকোনো রুটির সমতুল্য ছিল না। এর প্রসিদ্ধি এতটাই ছিল যে সমগ্র বাংলায় এখান থেকে উপঢৌকন হিসেবে এই রুটি পাঠানো হতো।
ঢাকার খাদ্যাভ্যাসে উত্তর ভারতীয় ও বহির্ভারতীয় প্রভাব মোগল আমলেই প্রথম ঘটেনি। আরও আগে, সুলতানি আমলে স্থানীয় ও আফগান–অধ্যুষিত এই জনপদে ধারাটি সৃষ্টি হয়েছিল। পরে মোগল আমলে তা সম্পূর্ণতা পায়। প্রাথমিক কালে মোগল কৃষ্টি অনুসরণ করলেও কালক্রমে স্থানীয় প্রচেষ্টা খাদ্যাভ্যাসকে ঢাকাই রীতিতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করতে সাহায্য করেছে।
লেখক: ঢাকা গবেষক