আপনি অবসেসিভ লাভ ডিজঅর্ডারে ভুগছেন না তো? মিলিয়ে নিন লক্ষণগুলো

ভালোবাসা মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর একটি। তবে এই ভালোবাসাই যখন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ ও নির্ভরশীলতায় রূপ নেয়, তখন সেটি হয়ে উঠতে পারে মানসিক সমস্যার কারণ। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের আচরণকে প্রায়ই অবসেসিভ লাভ ডিজঅর্ডার (ওএলডি) বলা হয়।

অবসেসিভ লাভ ডিজঅর্ডার হলো এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি তাঁর প্রিয় মানুষটির প্রতি অস্বাভাবিক মাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েন
মডেল: বাপ্পা ও জুঁই। ছবি: প্রথম আলো

অবসেসিভ লাভ ডিজঅর্ডার হলো এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি তাঁর প্রিয় মানুষটির প্রতি অস্বাভাবিক মাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েন। তিনি সব সময় সেই ব্যক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান এবং মনে করেন, তাঁকে ছাড়া জীবন অসম্ভব।

সঙ্গীকে অনেক সময় তিনি নিজের ‘ব্যক্তিগত সম্পদ’ মনে করেন। ফলে ভালোবাসার জায়গায় তৈরি হয় ভয়, সন্দেহ ও অধিকারবোধ।

লক্ষণগুলো কেমন

এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়। যেমন—

  • প্রিয় মানুষটির প্রতি অতিরিক্ত নজরদারি করা। সব সময় জানতে চাওয়া তিনি কোথায়, কার সঙ্গে আছেন। বারবার ফোন, মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় খোঁজ নেওয়া। আবার সঙ্গী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী করেন, কার পোস্টে ‘লাইক’, লাভ দেন, কী মন্তব্য করেন, কী সার্চ দেন, এসবে নজরদারি রাখেন।

  • অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেও ঈর্ষা বা রাগ হওয়া। সঙ্গীর অনুভূতি এখানে খুব কমই প্রাধান্য পায় অপরপক্ষের কাছে। বরং ওএলডিতে আক্রান্তের কাছে কেবল নিজের অযৌক্তিক অনুভূতিটাই মুখ্য।

  • সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অযৌক্তিক ভয়। সব সময় সম্পর্ক নিয়ে একটা ‘ইনসিকিউরিটি’তে ভোগা। অবাস্তব বা যা ঘটেনি, তা কল্পনা করে নিজেই হতাশ হয়ে যাওয়া।

আরও পড়ুন
  • সঙ্গীর ওপর অস্বাভাবিক রেগে যাওয়া, রাগ করে উল্টাপাল্টা আচরণ করা।

  • অপরপক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত, অবাস্তব, অবাঞ্ছিত প্রত্যাশা রাখা।

  • নিজের স্বাভাবিকতা, আত্ম উন্নয়নের চেয়ে সঙ্গীর প্রতি অনুভূতিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া। এখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান আর আস্থার চেয়ে নিরাপত্তাহীনতা থেকে উদ্ভূত অবিশ্বাস আর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাই মুখ্য।

  • ট্রমা বন্ডিং অর্থাৎ সঙ্গীর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত কষ্ট পাওয়া, সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক ও মানসিক আঘাত বা সঙ্গীর অন্য কোথাও সম্পর্ক থাকার পরও সেই টক্সিক সম্পর্ক থেকে বের হতে না পারা।

  • সঙ্গী যদি অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তাহলে সেই ব্যক্তির ক্ষতি করা।

  • সঙ্গীর কোনো বিষয় মেনে নিতে না পারলে হাত কাটা, ঘুমের ওষুধ খাওয়ার মতো ‘সেলফ হার্ম’ করতে পারেন। অপরপক্ষের কোনো বিষয় নিজের মনের মতো না হলে ব্যক্তি কেবল অপরপক্ষের জন্যই নয়, নিজেই নিজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারেন।

  • প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে না পারা। প্রত্যাখ্যানে নিয়ন্ত্রণহীন অস্বাভাবিক আচরণ করা, নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়া বা সঙ্গীর প্রত্যাখ্যানে অপরপক্ষ আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারেন। এমনকি সঙ্গীর বড় ক্ষতিও করতে পারেন। যেমন সঙ্গীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ছবি, তথ্য বা ভিডিও ফাঁস বা সঙ্গীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা ইত্যাদি।

আরও পড়ুন

কেন এমন হয়

অবসেসিভ লাভ ডিজঅর্ডারকে সহজ করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি খুবই জটিল, মারাত্মক মানসিক অবস্থা। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এমন আচরণের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে—

  • শৈশবের মানসিক আঘাত

  • ছোটবেলায় অতিরিক্ত শাসন

  • মা–বাবা বা পরিবারের সঙ্গে অর্থপূর্ণ গভীর সম্পর্ক না থাকা

  • আত্মবিশ্বাসের অভাব

  • একাকিত্ব বা অতিরিক্ত নিরাপত্তাহীনতা

অনেক সময় এটি অন্য মানসিক সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারে। পপ কালচারের বিভিন্ন উপাদানে, বিশেষ করে সিনেমায় এ ধরনের পুরুষ চরিত্রকে ‘আলফা মেন’ ক্যাটাগরিতে ফেলে মূল চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়।

বড় পর্দার ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্রগুলো মাঝেমধ্যে ওএলডিতে আক্রান্ত থাকে, যা সমাজে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে।

সমাধান কী

অবসেসিভ ভালোবাসা কখনোই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। তাই সম্পর্কের মধ্যে যদি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা সন্দেহ দেখা যায়, তবে খোলামেলা আলোচনা জরুরি।

অনেক সময় মনের যেকোনো অনুভূতি কেবল সুন্দরভাবে প্রকাশের মাধ্যমেই মনের অনেক জটিলতা ছাড়ানো সম্ভব হয়।

মনের গভীরের কোনো আঘাত কেবল প্রকাশের মাধ্যমেই সেরে উঠতে পারে। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নিতে হবে।

ভালোবাসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান। যখন এই তিনটি শর্ত বজায় থাকে, তখনই সম্পর্ক হয় সত্যিকারের সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর।

সূত্র: হেলথলাইন

আরও পড়ুন