বড় হয়েও মায়ের ওপর অতিনির্ভরশীল? ‘মাদার কমপ্লেক্স’ সম্পর্কে জানুন

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তাঁর মায়ের মতামতকে সম্মান করেন, এটি স্বাভাবিক। তবে কখনো কখনো মায়ের মতামতের বাইরে গিয়েও নিজের জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। তা না পারলে জীবনের গতি হতে পারে বাধাগ্রস্ত। এই অতিনির্ভরশীলতার পেছনে দায়ী হতে পারে ‘মাদার কমপ্লেক্স’। এ বিষয়ে জানালেন শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের সঙ্গে।

শৈশব থেকে সন্তানকে আগলে রাখেন একজন মামডেল: চৈতি ও লিও। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

শৈশব থেকে সন্তানকে আগলে রাখেন একজন মা। তিনি চাইতেই পারেন, সব সময় যেন তাঁর সন্তান সেরা জিনিসটা পায়। সেভাবেই বড় করে তোলেন তাকে। নানান দিকনির্দেশনাও দেন।

এভাবেই তাঁর উপস্থিতির একটা ছাপ পড়ে সন্তানের জীবনে। এমনকি মায়ের অনুপস্থিতিতেও সেই ছাপ থেকে যায় তাঁর মধ্যে। মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতি জমা হতে থাকে মস্তিষ্কে।

মাকে নিয়ে আবেগ, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, প্রত্যাশা, ভয়—এসবের একটা ছাপ পড়ে শিশুর অবচেতন মনে। সহজভাবে বলতে গেলে এই বিষয়টাই ‘মাদার কমপ্লেক্স’। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের ধরনও প্রভাব রাখে এতে।

মা যেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হিসেবে বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে কাছে পান।
মডেল: শুভ ও উল্কা হোসেন। ছবি: সুমন ইউসুফ

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও রয়ে যায় এই ‘মাদার কমপ্লেক্স’। এটি কিন্তু কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগ নয়; বরং এটি একটি মনোবিশ্লেষণমূলক ধারণা (সাইকোঅ্যানালিটিক্যাল কনসেপ্ট)।

যেসব শিশু মা ছাড়া অন্য কারও তত্ত্বাবধানে বড় হয়, তাদের বেলায় ওই মানুষটাকে নিয়েই তৈরি হয় ‘মাদার কমপ্লেক্স’।

যেমন হয় ‘মাদার কমপ্লেক্স’

‘মাদার কমপ্লেক্স’-এর দুটি মেরু থাকে। একটি মেরু ইতিবাচক অনুভূতি দেয়। অন্যটি দেয় কিছুটা নেতিবাচক অনুভূতি।

বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলা যাক। একটি শিশু যখন আঘাত পায়, তখন মা তার আশ্রয়। কিংবা মাতৃস্থানীয় কেউ। কিন্তু এই আঘাত যদি সে পায় তারই অবাধ্য হতে গিয়ে, তাহলে সেই আশ্রয়টুকু পেতেও একটা ভয় কাজ করে মনে।

মনে হয়, মা হয়তো বকবেন। কিংবা কঠিন মার মারবেন। ভয় পাওয়া অবুঝ সন্তান এটা বোঝে না যে তাকে শাসন করাও মায়ের দায়িত্ব। মায়ের ওই রূপটাও মনে গেঁথে যায়।

সন্তানকে ভালো–মন্দ চেনানোর দায়িত্ব মায়ের। হাজার জিনিসের ভিড়ে সেরা জিনিসটাই তার জন্য বাছাই করে দিতে চান তিনি। একটা বয়স পর্যন্ত এটা ঠিক। তবে বাড়াবাড়ি করলে মুশকিলও আছে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি মায়ের ওপর অতিনির্ভরশীল রয়ে যায়, এর প্রভাব পড়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনে
মডেল: উল্কা হোসেন ও শুভ। ছবি: সুমন ইউসুফ

গলদ যখন গোড়ায়

সন্তানের সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মানসিকতা যদি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে সন্তান অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি মায়ের ওপর অতিনির্ভরশীল রয়ে যায়, এর প্রভাব পড়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনে।

খুব ছোট ছোট বিষয় দিয়েই এ সমস্যার শুরু হয়। ধরা যাক, একটি শিশুকে তার মা সব সময়ই পোশাক বা খাবার ঠিক করে দেন। শিশুর নিজের পছন্দটা গুরুত্ব পায় না কখনোই। পড়ালেখা বা খেলাধুলার রুটিনের ব্যাপারেও এমন হতে পারে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিশুটি মতপ্রকাশের মনের জোরটাও একসময় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে।

আরও পড়ুন

সমস্যাটা কোথায় হয়

সন্তান বড় হতে হতে মা তাকে যত ভালো বুঝবেন এবং তার সঙ্গে যত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারবেন, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কে সে ততটাই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে থাকতে পারে। ‘মাদার কমপ্লেক্স’-এর ইতিবাচকতা রয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেই সন্তানের জীবনজুড়ে। এর অন্যথা হলে মুশকিল।

সে ক্ষেত্রে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে না–পারাটা একটা মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিনি হয়তো মধুচন্দ্রিমার স্থানটিও মায়ের মতামত ছাড়া চূড়ান্ত করতে পারেন না। তাঁর নিজের সাংসারিক জীবনের আরও নানান বিষয়েও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে পারেন।

কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল—তা শিশুকে বোঝান
ছবি: প্রথম আলো

তাই ‘অতি যত্ন’ এড়িয়ে চলুন

বুঝতেই পারছেন, বাড়ন্ত শিশুর সবকিছুতেই মা হিসেবে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে নেই। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল—তা শিশুকে বোঝান। পরিবার ও সমাজের নিয়মনীতি, মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং আদর্শের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে শিখিয়ে দিন। অল্প অল্প করেই এসবের চর্চা করুন।

ছোট বয়স থেকেই শিখিয়ে দিন, বন্ধু বা সহপাঠীদের সঙ্গে মারামারি করতে নেই। একটা বিড়াল বা কুকুরকে ত্যক্ত করতে নেই। একটা পিঁপড়াকেও ইচ্ছে করে মাড়িয়ে যেতে নেই। একটা গাছের পাতাও অকারণে ছিঁড়তে নেই।

এই শিশুর ভবিষ্যতে অন্য মানুষের সঙ্গে ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে সংঘাতে জড়ানোর আশঙ্কা কম। তবে সে কোন রঙের জামা পরবে, কখন খেলবে, কোন ধরনের সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নেবে—এ রকম বিষয়ে কিছুটা সিদ্ধান্ত নিতে দিন তাকে। ভুল করবে? করুক না। ভুল করতে করতে শিশু ভুলকে চিনবে। আর ভবিষ্যতে বাঁচবে ভুল থেকে। যখন আপনি আর তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী থাকবেন না। কিন্তু রয়ে যাবে আপনার প্রভাব—‘মাদার কমপ্লেক্স’।

আরও পড়ুন