একমাত্র সন্তান কি স্বার্থপর হয়
সমাজের প্রচলিত ধারণা যে একমাত্র সন্তান একটু স্বার্থপর বা আত্মকেন্দ্রিক হয়। আসলে কি তাই?
ছোট্ট শিশুকে আদরে, যত্নে, স্নেহে বড় করে তোলেন অভিভাবক। তবে সেই শিশুটি যদি হয় তাঁদের একমাত্র সন্তান, তাহলে সাধারণত আদরের মাত্রাটা একটু বেশিই হয়ে থাকে। বাড়িতে আর কোনো শিশু না থাকলে তার খেলনা, মজার খাবার কিংবা প্রিয় বইয়ে ভাগ বসানোর কেউ থাকে না। মা বাবার স্নেহ ভাগাভাগি করার অভিজ্ঞতাও তার তৈরি হয় না। সমাজের প্রচলিত ধারণা যে এভাবে বেড়ে ওঠা শিশু একটু স্বার্থপর বা আত্মকেন্দ্রিক হয়।
আসলে কি তাই?
শৈশব–কৈশোরেই গড়ে ওঠে একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের ভিত। ভাইবোন না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে কোনো জিনিস ভাইবোনদের মধ্যে ভাগাভাগি কিংবা একে অন্যের জন্য ছাড় দেওয়ার ব্যাপারটা থাকে না। তবে শুধু ভাইবোন না থাকার কারণেই যে একটি শিশু স্বার্থপর হয়ে উঠবে, ব্যাপারটা তেমন নয়।
বরং ভাইবোন থাকলেও একটি শিশুর মধ্যে হিংসা বা স্বার্থপরতা জন্মাতে পারে। শিশু কতটা সহানুভূতিশীল হবে, সেটি তার মা-বাবার অনুপ্রেরণা এবং পারিপার্শ্বিক নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। ভাইবোন থাকা বা না থাকার ওপর নয়। এ বিষয়ে কথা হলো শিশু–কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের সঙ্গে।
মিশতে পারা শেখা
শৈশবের প্রথম বন্ধু হতে পারে ভাই কিংবা বোন। তবে আপন ভাইবোন না থাকলেও মামাতো, ফুপাতো, খালাতো বা চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠতে পারে। কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেলে তো খুবই ভালো।
দূরে থাকলেও যদি পারিবারিকভাবে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের চল থাকে, অন্যের সঙ্গে মিশতে শেখে শিশু। প্রতিবেশী শিশু, খেলার সঙ্গী, সহপাঠী—নানান শিশুর সঙ্গে মিশতে গিয়েও শিশুর মধ্যে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা গড়ে ওঠে। এভাবে সে একসময় বন্ধুও খুঁজে পায়। ভাগাভাগির দীক্ষাও হয় এভাবে।
অন্যের জন্য ভাবনা
শিশু যখন অন্যের সঙ্গে মিশতে শুরু করে, তখন অন্যকে নিয়ে শিশুর জগতে একটা ভাবনাও তৈরি হয়। খেলার সঙ্গী অসুস্থ হলে খেলা থেমে যেতে পারে। তারও ওই অসুস্থতায় মন খারাপ হতে পারে। সহপাঠীকে যদি শিক্ষক শাসন করেন, তখন তার জন্য মায়া অনুভব করতে পারে সে। অন্যের জন্য সে কতটা ভাববে এবং তার ভাবনাটা কেমন হবে, তা আদতে তার ভাইবোনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। অভিভাবকের কাছে শিশু কতটা সহমর্মিতার শিক্ষা পেয়েছে, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অভিভাবক যদি শিশুকে তার খাবার বা খেলনা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে উৎসাহ দেন, শিশুটি ভাগ করে নিতে শিখতে পারে। পথের ক্ষুধার্ত প্রাণীকে সামান্য খাবার দিতে উৎসাহ দেওয়া হলে শিশু অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখে।
কেউ শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত পেলে তার কষ্ট হয়, এটা বোঝালে কিংবা কারও কষ্টের সময় তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে শেখালে সে অন্যের প্রতি সহমর্মী হয়ে ওঠে। শিশুর বয়স এবং বোঝার সক্ষমতা অনুযায়ী এভাবে শিশুকে গড়ে তুললে সে মানবিক হবে। ভাইবোন না থাকলেও সে অন্যের কথা ভাবতে শিখবে।
সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা
ভাইবোন না থাকলে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠার বেশ ভালো সুযোগ থাকে। যেমন অভিভাবক ছুটির দিনে দু–তিনটি জায়গার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলতে পারেন।
এমন ক্ষেত্রে কিন্তু সেখানেই যাওয়া হবে, যেটা সে নিজে পছন্দ করে। এভাবে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে নিতে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এই আত্মবিশ্বাস আদতে অতিকেন্দ্রিকতা নয়। বরং এটি তার স্বাতন্ত্র্য।
তবু কেন স্বার্থপরতার প্রশ্ন
অভিভাবক কষ্ট করে যা কিছু এনে দেন, সবই পায় একমাত্র শিশু। কারও কারও ক্ষেত্রে সবকিছু নিজের মতো করে পাওয়ার একটা প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত আদর, অতিরিক্ত নিরাপত্তাভাবনা কিংবা শৈশব থেকে অন্যদের সঙ্গে মেশার পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়ার কারণে আত্মকেন্দ্রিকতা গড়ে উঠতে পারে। তাই সাধারণভাবে মনে হতে পারে, একমাত্র সন্তানেরা হয়তো স্বার্থপর।
ব্যক্তিজীবনে কিছু সমস্যা
শৈশব থেকেই একটু বেশি যত্নে রাখতে গিয়ে অভিভাবক অনেক সময় স্বাভাবিক স্বাধীনতা থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করে। এমন হতেই পারে যে সবাই পিকনিকে যাচ্ছে, কিন্তু সে যাওয়ার অনুমতি পেল না। এভাবে বেড়ে উঠতে উঠতে পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে সে। বন্ধুর বিপদে হুট করে ছুটে যাওয়ার সুযোগ না-ও পেতে পারে। এমনটা হলে সে স্বার্থপর তকমা পেয়ে যেতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং অভ্যাস থাকায় সে বন্ধুদের মধ্যেও কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কিন্তু অন্যদের কাছে মনে হতে পারে, সে শুধু নিজের মতো করেই ভাবে।
দাম্পত্য জীবনেও ছোটখাটো বিষয়ে সমস্যা হতে পারে। যেহেতু তার ব্যক্তিগত পরিসরে অন্য কেউ কখনো ঢোকেনি, তাই নতুন পরিবারে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা কিছু ক্ষেত্রে সঙ্গীর মতামত মেনে নেওয়া একটু কঠিন হতে পারে।
বড় হয়ে ওঠার পর এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে মা-বাবার দায়িত্ব একাই সামলাতে হবে। সেই দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের বন্ধু কিংবা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের অনেক অনুরোধ বা আবদারে রাজি হওয়া সম্ভব হয় না। ওই মানুষটাকেই কিন্তু অন্যের চোখে স্বার্থপর মনে হতে পারে। বিয়ের পরও নিজের মা-বাবার ঘন ঘন খোঁজ নেওয়া, প্রায়ই তাঁদের কাছে যাওয়া কিংবা উৎসবের সময় তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানোটাকে অনেকে সহজভাবে না–ও নিতে পারেন।
ভাইবোন থাকা আর না থাকার মধ্যে তফাত নিশ্চয়ই আছে। তবে বিষয়টাকে আত্মকেন্দ্রিকতার মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরিশীলিত হয়ে বেড়ে ওঠা যেকোনো মানুষই চমৎকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারেন।