পাতাল মার্কেটে ‘মোবাইলের হাসপাতালে’ যাওয়ার আগে যা যা জেনে রাখবেন

গুলিস্তানের ব্যস্ত সড়ক। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ছেড়ে আসা স্টেডিয়াম–সংলগ্ন মোড়ের ব্যস্ততা আরও বেশি। ফুটপাতের বাজার আর যানবাহনের চলাচল দেখে যদি একে ঢাকার আর দশটা সাধারণ রাস্তার মতোই ভাবেন, তাহলে ভুল করবেন। এই ব্যস্ত সড়কের নিচেই আছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত এক দুনিয়া। বিশাল এক পাতাল মার্কেট; শুধু মোবাইল সার্ভিসিং ও মোবাইলের অ্যাকসেসরিজের জন্য বিখ্যাত। এই মার্কেটে যাওয়ার আগে জেনে রাখুন কিছু বিষয়।

১০৪টি দোকান নিয়ে সেবা দিয়ে যাওয়া পাতাল মার্কেটের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালেছবি: সুমন ইউসুফ

মাটির নিচের ব্যস্ত ভবন

মার্কেটের চারদিকে দুটি করে মোট আটটি প্রবেশপথ। মাটির নিচ দিয়ে রাস্তা পারাপারের অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রবেশপথ আলো-বাতাস সঙ্গী করে পথচারীকে যেমন নিরাপদে রাস্তা পার করে দিচ্ছে, ঠিক তেমনি যাতায়াতের পথে উপহার দিচ্ছে মুঠোফোন মেরামতের বিখ্যাত এক পাতাল মার্কেট।

পরপর ১০৪টি দোকান নিয়ে সেবা দিয়ে যাওয়া এ মার্কেটের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। বড় ১০৪টি দোকানের মধ্যেই আছে চার শতাধিক টেকনিশিয়ানের মিনি দোকান।

কারও সামনে মাইক্রোস্কোপ, সেখানে চোখ রেখে টেকনিশিয়ান সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশে কাজ করছেন। কেউ মুঠোফোনের ডিসপ্লে ঠিক করছেন, কেউ ব্যাক কভার বা রিমুভিংয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এ মার্কেটে সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবেন শনি থেকে বৃহস্পতিবার, সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি।

আরও পড়ুন

ঢাকার বাইরে থেকেও আসেন অনেকে

ঢাকার বাইরে থেকেও এখানে আসেন অনেকে
ছবি: সুমন ইউসুফ

সপ্তাহের ব্যস্ততম দিন বৃহস্পতিবারে গিয়েছিলাম এ মার্কেটে। কথা হয় মার্কেট পরিচালনার অফিস সচিব আবদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, গুলিস্তানের এ পাতাল মার্কেট মূলত মুঠোফোনের বিভিন্ন অনুষঙ্গের দোকানভিত্তিক বাজার। এখানকার টেকনিশিয়ানদের সেবার কারণে নিজেদের বিকল হওয়া মুঠোফোন সচল করতে নগরবাসী ছুটে আসেন।

এখানে কেউ আসেন মুঠোফোনের ডিসপ্লে ঠিক করতে, চার্জিংজনিত সমস্যার সমাধান করতে, মাদারবোর্ডসহ মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করতে, ব্যাটারি–সংক্রান্ত জটিলতা থেকে রেহাই পেতে, চার্জার পোর্ট ঠিক করতে, ব্যাক কভার লাগাতে বা ফোনের সফটওয়্যারের কোনো সমস্যার সমাধানে।

শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরে থেকেও এখানে আসেন অনেকে।

আরও পড়ুন

মোবাইলের ঢাকা মেডিকেল

প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেবা দিয়ে আসা টেকনিশিয়ান মো. রিফাত হোসেন বলছিলেন, এ মার্কেটকে বলা হয় মোবাইলের হাসপাতাল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে মোবাইলের ‘ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল’। যেখানে কম খরচে মেলে মোবাইলের সব ধরনের সেবা পাওয়ার সুযোগ।

আবার মানুষের বেলায় স্থানীয় হাসপাতালে রোগী সুস্থ না হলে যেমন ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়, ঠিক তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে মুঠোফোন মেরামত করতে ব্যর্থ হলে শেষ ঠিকানা হয় ‘মোবাইলের ঢাকা মেডিকেল’ খ্যাত এ পাতাল মার্কেট।

গুলিস্তানের ব্যস্ত সড়কের নিচেই আছে বিশাল এক পাতাল মার্কেট
ছবি: সুমন ইউসুফ

এখানে একই মার্কেটের শতাধিক দোকানের টেকনিশিয়ানদের কাছে সব রকম সমস্যার সমাধান সহজেই মেলে। এক দোকানে না হলে অন্য দোকানে, এক টেকনিশিয়ান থেকে আরও টেকনিশিয়ান—এমন করে মুঠোফোনের সব সমস্যারই সমাধান খুঁজে নেওয়া যায় সহজেই।

মো. রিফাত হোসেন জানান, মুঠোফোনে সমস্যা দেখা দেওয়ামাত্রই যদি এখানে আনা হয়, তাহলে অনেক কম খরচেই মেরামত করা সম্ভব। সমস্যার সমাধান খুঁজতে নিয়ে অন্য অনেক দোকান ঘুরে এলে সার্ভিস চার্জের পরিমাণ তখন বেড়ে যায়। কাজের ওপর ভিত্তি করে এখানে সার্ভিস চার্জ শুরু হয় মাত্র ২০০ টাকা থেকে।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দক্ষ টেকনিশিয়ানরা এখানে তিনভাবে যুক্ত হন। কেউ এক হাত বাই এক হাতের মতো জায়গাজুড়ে ছোট টেবিলের দোকান নিয়ে বসেন, যেখানে ভাড়া গুনতে হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। কেউবা দোকানের সঙ্গে লভ্যাংশ শেয়ারের চুক্তিতে সে দোকানের সামনে বসেন। কেউ আবার নির্দিষ্ট বেতনে চাকরি করেন কোনো না কোনো দোকানের অধীন।

আরও পড়ুন

নষ্ট ফোনের নতুন জীবন

২০১০ সালে পাতাল মার্কেটে দোকান দিয়েছেন কবির টেলিকমের স্বত্বাধিকারী কবির হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দোকানে যদি পাঁচজন টেকনিশিয়ান থাকেন এবং প্রত্যেকে গড়ে পাঁচটা মোবাইল ঠিক করেন, সে হিসাবে দিনে প্রায় ২৫টি মোবাইল ঠিক করতে পারেন। বিপরীতে, মোবাইলগুলো ঠিক করা না হলে গ্রাহককে বাধ্য হয়েই নতুন মোবাইল কিনতে হতো। অর্থাৎ অকারণ মোবাইল কেনায় দেশের টাকা বিদেশে চলে যেত। এখানে আমরা মোবাইল বানাতে না পারলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ যোগ করে মোবাইল ঠিক করে দিতে পারি। উচ্চমূল্যের নতুন মোবাইল কেনার চেয়ে অল্প টাকায় হাতের মোবাইলটি মেরামত করে ঠিক করে নিতে পারছে বলেই এখানে শত শত মোবাইল রোগী হাজির হয় প্রতিদিন। আর এটাই এ মার্কেটের প্রধান বিশেষত্ব।’

দোকানে মোবাইল ঠিক করার কাজ চলছে
ছবি: সুমন ইউসুফ

কবির হোসেন জানান, একটা সময় মোবাইল অ্যাকসেসরিজ বিক্রি হতো বড় পরিসরে। মফসস্‌ল থেকে খুচরা বিক্রেতারা এ মার্কেট থেকে পাইকারি দরে পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। এখন মফস্‌সল থেকেও সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করা যায় বলে এ মার্কেটের ওপর তাঁদের নির্ভরতা কমেছে। ফলে এখানকার দোকানমালিকেরা মূলত মোবাইল সার্ভিসটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।

কেমন সমস্যা, কত খরচ

এখানে ৭০ শতাংশ সমস্যাই আসে ডিসপ্লেকেন্দ্রিক। সঙ্গে থাকে চার্জার, মাদারবোর্ডজনিত সমস্যাসহ আরও অনেক কিছুই। এমনকি সফটওয়্যারের সমস্যারও সমাধান মেলে।

সার্ভিস চার্জ মূলত নির্ধারিত হয় মুঠোফোনের সমস্যার ওপর ভিত্তি করে। যেখানে সর্বনিম্ন সার্ভিস ২০০ টাকা। মেরামতের বাইরে কিনতে পারবেন মুঠোফোনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য চার্জার, ডেটা কেবল, অ্যাডাপ্টার, ইয়ারফোন, মেমোরি কার্ড, মেমোরি কার্ড রিডারসহ মুঠোফোনের প্রয়োজনীয় সব রকম অনুষঙ্গ।

এ মার্কেটে অচল মুঠোফোনের সচল যন্ত্রাংশগুলো খুলে অন্য কোনো অচল মুঠোফোনের কাজে লাগানো হয়
ছবি: সুমন ইউসুফ

হারানো যন্ত্রাংশের খোঁজে

মুঠোফোন ঠিক করার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় মাইক্রোস্কোপ। মুঠোফোনের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশের একটি খুঁজে পেতে এবং নতুন পার্টস নিখুঁতভাবে বসানোর কাজে ব্যবহৃত হয় মাইক্রোস্কোপ। থাকে হট এয়ারগান, পাওয়ার সাপ্লাই, হেয়ার ড্রায়ারসহ প্রয়োজনীয় আরও অনেক যন্ত্রপাতি। সবারই সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে মুঠোফোনকে সারিয়ে তোলা।

মুঠোফোন যদি সর্বোচ্চ চেষ্টায় সচল না-ও হয়, গ্রাহক চাইলে নির্দিষ্ট অংশের বিনিময়ে অচল মুঠোফোনটি বিক্রি করতে পারেন। অচল মুঠোফোনের সচল যন্ত্রাংশগুলো খুলে অন্য কোনো অচল মুঠোফোনের কাজে লাগানো হয়। ফলে এ মার্কেটে এসে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। টেকনিশিয়ানদের সর্বোচ্চ চেষ্টায় আপনার মুঠোফোনটি সেরে উঠবে, আর যদি না–ও সেরে ওঠে, বিকল্প ব্যবস্থাও এখানেই খুঁজে পাবেন।

আরও পড়ুন

ক্রেতাদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ

মুঠোফোন মেরামতের সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, সে বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরলেন কবির হোসেন—

১. সাধারণত খুব কম সার্ভিস চার্জেই কাজ হয় এখানে। যন্ত্রাংশের দামও তুলনামূলক কম রাখা হয়। ফলে দোকানে দর–কষাকষিতে সার্ভিস চার্জ কমাতে গেলে দেখা যায়, ওই কম সার্ভিস চার্জ থেকেই লাভ বের করতে গিয়ে দোকানদার কম দামের যন্ত্রাংশ সংযোজন করে মুঠোফোন ঠিক করে দিচ্ছেন। তাতে গ্রাহকের ক্ষতি হয়।

২. ডিসপ্লে পরিবর্তনের সময় ভালোভাবে লক্ষ রাখুন এবং তেমন কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়লে জানান। অর্থাৎ ডিসপ্লে সেট করার আগেই সতর্ক করুন। কারণ, ডিসপ্লে পরিবর্তনের জন্য একবার আঠা লাগানো হয়ে গেলে তা আর পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে না।

৩. মুঠোফোনে প্রটেক্টর পলি লাগানোর ক্ষেত্রে অনেকে পুরু পলি বেছে নেন, যা মোটেও উচিত নয়। এসব পলিতে টাচ স্ক্রিনে সমস্যা হয়। টাচ কাজ করতে চায় না।

আঘাতজনিত সমস্যা অনেক সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা মুঠোফোনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে
ছবি: রয়টার্স

মুঠোফোন দীর্ঘদিন সচল রাখার টিপস

মুঠোফোন কেনার পর দীর্ঘদিন যাতে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারেন, তার জন্যও কিছু পরামর্শ বাতলে দিলেন কবির হোসেন—

১. মুঠোফোন যেন হাত থেকে পড়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। আঘাতজনিত সমস্যা অনেক সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা মুঠোফোনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

২. মুঠোফোন যাতে কোনো অবস্থাতেই পানিতে না পড়ে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এমনকি মুঠোফোনের গায়ে ‘ওয়াটারপ্রুফ’ লেখা থাকার পরও।

৩. চার্জার নষ্ট হয়ে গেলে কম দামের চার্জার না কিনে আসল চার্জার ব্যবহার করা উচিত। চার্জারের ভোল্টেজ বা বিদ্যুৎপ্রবাহের তারতম্যের কারণে মুঠোফোনের মাদারবোর্ড ও ব্যাটারির বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই বিশ্বস্ত দোকান বা কাস্টমার কেয়ার থেকে চার্জার নেওয়া উত্তম।

৪. এ ছাড়া ডেটা কেবল, ব্যাটারি বা অ্যাডাপ্টার—সবকিছুই ভালো মানের নিশ্চিত করতে পারলে মুঠোফোনের আয়ু বেড়ে যাবে অনেক। মুঠোফোন নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা যাবে অনেক দিন।

আরও পড়ুন