কৃতজ্ঞতা কীভাবে আপনাকে এবং আপনার মস্তিষ্ককে বদলে দেয়
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দুশ্চিন্তা, হতাশা, চাপ আর অনিশ্চয়তার কমতি নেই। মানসিক সুস্থতা ধরে রাখা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় গবেষকেরা খুঁজছেন, কীভাবে অল্প সময় ও অল্প পরিশ্রমে মানসিক স্বাস্থ্যে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, একটি সহজ অভ্যাসেই লুকিয়ে আছে এর সমাধান—কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও কৃতজ্ঞতা চর্চার প্রভাব শুধু অনুভূতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায়ও পরিবর্তন আনতে পারে।
কৃতজ্ঞতা কি সত্যিই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো করে
গত এক দশকের গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, যাঁরা সচেতনভাবে জীবনের ভালো দিকগুলো খেয়াল করেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুখী হন এবং হতাশা ও উদ্বেগে কম ভোগেন।
তবে এত দিন এসব গবেষণা মূলত এমন ব্যক্তিদের ওপর করা হয়েছিল, যাঁরা মানসিকভাবে মোটামুটি ভালো অবস্থায় ছিলেন। প্রশ্ন ছিল, যাঁরা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও কি কৃতজ্ঞতা একইভাবে কাজ করে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন দুই মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জোয়েল ওং ও জশুয়া ব্রাউন। তাঁরা কৃতজ্ঞতার অনুশীলন কীভাবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করেন।
তাঁদের এই গবেষণার ফলাফল পরে ‘গ্রেটার গুড’ সাময়িকীতে ‘হাউ গ্র্যাটিচিউড চেঞ্জেস ইউ অ্যান্ড ইয়োর ব্রেন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
সেই গবেষণায় অংশ নেন প্রায় ৩০০ তরুণ-তরুণী। অংশগ্রহণকারীরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সেন্টারে মানসিক সহায়তা নিতে এসেছিলেন এবং বেশির ভাগই ভুগছিলেন বিষণ্নতা ও উদ্বেগে।
গবেষণাটি কীভাবে করা হয়েছিল
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়।
প্রথম দলকে বলা হয়, তিন সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে একজন ব্যক্তিকে একটি করে কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখতে।
দ্বিতীয় দলকে বলা হয়, নিজেদের জীবনের কষ্ট, হতাশা ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে।
তৃতীয় দলকে শুধু কাউন্সেলিং দেওয়া হয়, কোনো লেখা লিখতে বলা হয়নি।
৪ ও ১২ সপ্তাহ পর দেখা গেল, যাঁরা কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখেছিলেন, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি অন্য দুই দলের তুলনায় স্পষ্টভাবে বেশি। অর্থাৎ শুধু কাউন্সেলিংয়ের চেয়ে কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা চর্চা যুক্ত করলে ফল আরও ভালো হয়।
কৃতজ্ঞতা কীভাবে কাজ করে
গবেষকেরা শুধু ফলাফলেই থেমে থাকেননি, বরং খুঁজেছেন কৃতজ্ঞতা আসলে কীভাবে আমাদের মনের ভেতরে কাজ করে। তাঁরা চারটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করেছেন।
১. কৃতজ্ঞতা নেতিবাচক আবেগ থেকে মুক্তি দেয়
গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞতার চিঠি লেখার সময় অংশগ্রহণকারীরা তুলনামূলকভাবে কম নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল, যাঁরা কম নেতিবাচক অনুভূতির ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি বেশি হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু ইতিবাচক ভাবনা বাড়ালেই হয় না; বরং হিংসা, ক্ষোভ, হতাশা, আক্ষেপের মতো বিষাক্ত আবেগ থেকে মনকে সরিয়ে আনাই মূল চাবিকাঠি।
কৃতজ্ঞতা আমাদের মনকে ধীরে ধীরে সেদিকেই ঠেলে দেয়, যেখানে আমরা বারবার নিজের কষ্ট নয়, অন্যের অবদান আর জীবনের ভালো দিকগুলোর দিকে তাকাই।
২. চিঠি পাঠানো জরুরি নয়, লেখাটাই আসল
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল, তাঁরা চাইলে চিঠি পাঠাতে পারেন, না পাঠালেও সমস্যা নেই। বাস্তবে দেখা গেছে, মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যাঁরা পাঠাননি, তাঁরাও মানসিক উপকার পেয়েছেন।
এর মানে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুফল অন্যের কাছে পৌঁছানোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং নিজের ভেতরে অনুভূতিটা তৈরি করাই মূল বিষয়।
আপনি যদি কাউকে উদ্দেশ করে একটি কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখতে চান, কিন্তু পাঠাতে সংকোচ বোধ করেন, তবু লিখুন। লেখার প্রক্রিয়াটাই আপনার মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
৩. কৃতজ্ঞতার ফল আসে ধীরে, কিন্তু স্থায়ী হয়
এ গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লেখার এক সপ্তাহ পর তেমন কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। কিন্তু ৪ সপ্তাহ পর উন্নতি স্পষ্ট হয় আর ১২ সপ্তাহ পর সেই প্রভাব হয় আরও গভীর।
এর অর্থ হলো কৃতজ্ঞতা কোনো তাত্ক্ষণিক ম্যাজিক নয়। এটি ধীরে ধীরে কাজ করে, কিন্তু ফল স্থায়ী। অনেকে হতাশ হয়ে বলেন, ‘কিছুদিন কৃতজ্ঞতা চর্চা করেও তো কিছু টের পেলাম না।’ গবেষণা বলছে, সময় দিন। সুফল অবশ্যই পাবেন।
৪. কৃতজ্ঞতা মস্তিষ্কের গঠন ও কাজ বদলায়
সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি আসে ব্রেন স্ক্যানের ফলাফল থেকে। তিন মাস পর অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা যায়, যাঁরা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন তাঁদের মস্তিষ্কের ‘মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি বেশি সক্রিয়। এ অংশটি শেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সামাজিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।
এর মানে, কৃতজ্ঞতা চর্চা মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে ভবিষ্যতে কৃতজ্ঞ অনুভব করা আরও সহজ হয়। একে বলা যায় ‘গ্র্যাটিচিউড ট্রেনিং ফর দ্য ব্রেন’।
আমরা কেন এত কম কৃতজ্ঞ হই
আমাদের বেশির ভাগ সময় ও শক্তি ব্যয় হয় যা নেই, যা হয়নি, যা হতে পারত—এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে। কৃতজ্ঞতা এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে উল্টে দেয়। এটি শেখায়, যা আছে, যা পেয়েছি, যারা পাশে আছে—সেসবকে মূল্য দিতে।
এই মানসিক পরিবর্তনই ধীরে ধীরে আমাদের ভেতরের চাপ, হতাশা আর বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে।
কীভাবে শুরু করবেন কৃতজ্ঞতা চর্চা
খুব জটিল কিছু নয়—
প্রতিদিন রাতে তিনটি ভালো ঘটনার কথা লিখুন
সপ্তাহে একবার কাউকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লিখুন
দিনে একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, আজ আমি কী পেয়েছি?
এসব ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ কথা
কৃতজ্ঞতা শুধু ভদ্রতা বা সামাজিক সৌজন্যের বিষয় নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মানসিক অনুশীলন, যা মস্তিষ্কের গঠন পর্যন্ত বদলে দিতে পারে। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, হতাশার এই সময়ে কৃতজ্ঞতা হতে পারে এক সহজ কিন্তু শক্তিশালী হাতিয়ার।
সূত্র: গ্রেটার গুড