ব্লক প্রিন্ট—হাতে ছাপা নকশায় সময়ের গল্প বলে যে মাধ্যম
আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল প্রিন্টের যুগে দাঁড়িয়ে ব্লক প্রিন্টিং যেন সময়ের বিপরীতে হেঁটে চলা ধীর, মন্থর অথচ গভীর এক শিল্পচর্চা। এর ইতিহাস যেমন বিস্তৃত, তেমনি সম্ভাবনাময় এর ভবিষ্যৎ। অতীত থেকে বর্তমান—চার হাজার বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথে ব্লক প্রিন্টিং বহুবার হারিয়ে যেতে বসেছে, আবার নতুন করে ফিরে এসেছে মানুষের ভালোবাসায়। ব্লকের নকশার সুলুকসন্ধান করলেন শেখ সাইফুর রহমান
প্রাচীন চীনে প্রোথিত আছে ব্লক প্রিন্টিংয়ের শিকড়। প্রায় চার হাজার বছর আগে কাঠের ব্লক খোদাই করে সেখানে চালু হয় কাপড়ে নকশা ছাপার এই প্রথা। বস্ত্র অলংকরণের এই কৌশল খুব দ্রুতই কাগজে ছাপার ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। মানবেতিহাসে প্রাচীনতম মুদ্রিত গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় ডায়মন্ডসূত্র, ৮৬৮ সালে মুদ্রিত এই বিখ্যাত বৌদ্ধধর্মগ্রন্থটি কিন্তু ব্লক প্রিন্টিং পদ্ধতিতে ছাপা। চীনের তাং রাজবংশের সময়পর্বে (৬১৮-৯০৭ সাল) আরও পরিণত রূপ পায় ব্লক প্রিন্টিং। ধীরে ধীরে এটি জাপান, কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। জাপানে উডব্লক প্রিন্টশিল্পের সূক্ষ্ম রেখা ও রঙের ব্যবহার বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে।
ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন
দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে ব্লক প্রিন্টিং ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। তবে এর প্রকৃত বিকাশ ঘটে মোগল আমলে। আসলে ষোড়শ শতাব্দীতে মোগল সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরো বস্ত্রশিল্পই এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। রাজস্থানের জয়পুর, বাগরু, সাঙ্গান ইত্যাদি অঞ্চল ব্লক প্রিন্টিংয়ের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
এসব অঞ্চলের সুতি ও সিল্কের কাপড়ে থাকত প্রাকৃতিক রং আর দক্ষ কারিগরের হাতের ছোঁয়া। তখনো প্রতিটি নকশার জন্য আলাদা ব্লক তৈরি করা হতো। একটি ডিজাইনে যদি তিনটি রং থাকত, তবে প্রয়োজন হতো তিনটি পৃথক ব্লক। এই নিখুঁত সমন্বয় ও পুনরাবৃত্তির ক্ষমতাই ব্লক প্রিন্টিংকে করে তোলে অনন্য।
কাঠ খোদাইয়ের শিল্প
ব্লক প্রিন্টিংয়ের প্রাণ এর ব্লক। শক্ত কাঠ মসৃণ করে তাতে আঁকা হয় নকশা। এখন অবশ্য কম্পিউটারে নকশা তৈরি করে কাঠের ওপর আঠা দিয়ে লাগানো হয় সেটার প্রিন্ট। এরপর দক্ষ কারিগর ছেনি ও সূক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে খোদাই করেন নকশা।
নকশা খোদাইয়ের সময় আয়নার মতো উল্টো করে ডিজাইন কাটা হয়, ছাপ দেওয়ার পর কাপড়ে সেটা সঠিকভাবে ফুটে ওঠে। দ্রুত ক্ষয় ঠেকাতে সূক্ষ্ম অংশগুলো অনেক সময় পিতল বা তামার পাত বসিয়েও তৈরি করা হয়।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত থাকে এসব ব্লক। আজও অনেক কারিগরের পরিবারে শতবর্ষ পুরোনো ব্লক ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এক অর্থে জীবন্ত ঐতিহ্য।
ব্লক প্রিন্টিংয়ের প্রক্রিয়া
ব্লক প্রিন্টিং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এর ধাপগুলো এমন—
১. কাপড়: প্রথমে কাপড় ধুয়ে ময়লা ও রাসায়নিক অপসারণ করা হয়। কখনো কখনো কাপড় সেদ্ধ করা হয়, যাতে রং ভালোভাবে শুষে নিতে পারে।
২. রং: বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উৎস, যেমন গাছের ছাল, ফল, পাতা ও মর্ডান্ট (একধরনের ধাতব লবণ) মিশিয়ে তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক রং। এ ছাড়া কেমিক্যাল রংও ব্যবহার করা হয়।
৩. ছাপ: ব্লক রঙে ডুবিয়ে নির্দিষ্ট চাপে কাপড়ে ছাপ দেওয়া হয়। প্রতিটি ছাপ আগেরটির সঙ্গে মিলিয়ে বসাতে হয়।
৪. শুকানো ও ফিনিশিং: রোদে শুকানোর পর ধুয়ে অতিরিক্ত রং অপসারণ করা হয়।
পুরো প্রক্রিয়া মেশিনের মতো নিখুঁত হয় না। তবে এতে থাকে মানুষের হাতের স্বাতন্ত্র্য। তাই একই ডিজাইনের দুটি কাপড় কখনো পুরোপুরি এক হয় না।
রঙের দুই ধারা
শুধু নকশাতেই নয়, ব্লক প্রিন্টিংয়ের রঙেরও আছে নিজস্ব আলাদা সৌন্দর্যবিজ্ঞান। কাঠের ব্লকের ছাপ যেমন শিল্প, তেমনি রংকে টেকসই ও প্রাণবন্ত করে তোলার পেছনে রয়েছে সূক্ষ্ম রাসায়নিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়। ব্লক প্রিন্টিংয়ে দুই ধরনের রং ব্যবহারের চল আছে। অন্যদিকে রংকে টেকসই করতে ব্যবহার করা হয় মর্ডান্ট।
১. প্রাকৃতিক রং
ঐতিহ্যগতভাবে ব্লক প্রিন্টে উদ্ভিজ্জ রং ব্যবহার করা হতো। যেমন—
নীল (উৎস ইন্ডিগোগাছ)
লাল (উৎস মাদার রুট বা আলিজারিন)
হলুদ (উৎস হলুদ, ডালিমের খোসা, ফুল)
কালচে-বাদামি (লোহার গুঁড়া ও গুড়ের বিক্রিয়ায়)
রং তৈরির প্রক্রিয়া
গাছের ছাল, শিকড় বা ফল সেদ্ধ করে নির্যাস বের করা হয়।
নির্যাস ছেঁকে ঘন করা হয়।
কাপড়ে ভালোভাবে ধরানোর জন্য মর্ডান্ট মেশানো হয়।
রং টেকসই করার উপকরণ
প্রাকৃতিক রঙের ক্ষেত্রে অতিগুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান মর্ডান্ট। এটি এমন একধরনের ধাতব লবণ, যা রংকে কাপড়ের তন্তুর সঙ্গে রাসায়নিকভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
সাধারণ মর্ডান্ট
অ্যালাম (ফিটকিরি)
আয়রন সালফেট (লোহা)
কপার সালফেট
টিন লবণ
রঙের শেডও বদলে দিতে পারে মর্ডান্ট। যেমন—একই উদ্ভিজ্জ রঙে অ্যালাম দিলে উজ্জ্বল লাল আর আয়রন দিলে গাঢ় মেরুন বা বাদামি।
২. কেমিক্যাল বা সিনথেটিক রং
আধুনিক ব্লক প্রিন্টিংয়ে কেমিক্যাল রং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়; কারণ—
রঙের বৈচিত্র্য বেশি
উজ্জ্বলতা বেশি
রং দ্রুত শুকায়
ব্যয় তুলনামূলক কম
রঙের পুনরাবৃত্তি করা সহজ
ব্যবহৃত কেমিক্যাল রঙের ধরন:
রিঅ্যাকটিভ ডাই: সুতি কাপড়ের জন্য জনপ্রিয়।
পিগমেন্ট ডাই।
ন্যাপথল ডাই।
ডিসচার্জ কেমিক্যাল: রং তুলতে ব্যবহৃত হয়।
কেমিক্যাল রং তৈরির প্রক্রিয়া
সাধারণভাবে—
১. রং পাউডার পানিতে গুলে নেওয়া হয়।
২. প্রয়োজন অনুযায়ী বাইন্ডার বা ফিক্সিং এজেন্ট মেশানো হয়।
৩. ঘনত্ব ঠিক রাখতে থিকেনার (স্টার্চ, সলিউবল গাম) যোগ করা হয়।
৪. ভালোভাবে নেড়ে সুষম মিশ্রণ তৈরি করা হয়।
রং টেকসই করার উপকরণ
রিঅ্যাকটিভ রঙের ক্ষেত্রে
রংকে তন্তুর সঙ্গে রাসায়নিকভাবে যুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয় সোডা অ্যাশ।
যোগ করা হয় সোডিয়াম ক্লোরাইড বা লবণ, এটা রংকে ফাইবারে টেনে নিতে সাহায্য করে।
পিগমেন্ট কালারের ক্ষেত্রে
রংকে কাপড়ের ওপর আঠার মতো বসিয়ে দেয় বাইন্ডার।
তাপ প্রয়োগে রংকে স্থায়ী করে ফিক্সার বা ক্যাটালিস্ট।
পিগমেন্ট রঙে হিটার দিয়ে হিট কিউরিং করা হয়, যাতে বাইন্ডার শক্ত হয়ে রং স্থায়ী হয়।
রঙের স্থায়িত্ব বাড়াতে অতিরিক্ত ধাপ
স্টিমিং (গরম বাষ্পের সেঁক)।
রোদে শুকানো।
হিট সেটিং।
শেষে ভালোভাবে ধোয়া।
এই ধাপগুলো রঙের অতিরিক্ত অংশ সরিয়ে দেয় এবং কাপড়ে স্থায়ীভাবে রং বসে যেতে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক ও কেমিক্যাল—দুই ধরনের রংই ব্লক প্রিন্টশিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে আজকাল। একদিকে পরিবেশবান্ধব বলে প্রাকৃতিক রঙের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক উৎপাদন, নির্দিষ্ট শেড ও দ্রুত ডেলিভারির জন্য কেমিক্যাল রঙের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও ছোট কারখানাগুলোয় পিগমেন্ট ও রিঅ্যাকটিভ ডাই বেশি ব্যবহৃত হয়, তবে সচেতন ব্র্যান্ডগুলো আবার প্রাকৃতিক রঙের দিকে ফিরছে।
ব্লক প্রিন্টিংয়ের প্রধান তিন পদ্ধতি
ডাইরেক্ট প্রিন্টিং: এটা সবচেয়ে সহজ ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কাপড় প্রথমে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। এরপর সরাসরি রঙে ব্লক ডুবিয়ে কাপড়ে ছাপ দেওয়া হয়। এ পদ্ধতিতে প্রতিটি রং আলাদা ব্লকে প্রয়োগ করা হয়। যদি ডিজাইনে তিনটি রং থাকে, তবে তিন দফায় ছাপ দিতে হয়। এতে নিখুঁত অ্যালাইনমেন্ট জরুরি। সামান্য ভুলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে পুরো প্যাটার্ন। সাধারণত ফুল, বুটি, জ্যামিতিক পুনরাবৃত্ত নকশায় বেশি ব্যবহৃত হয় ডাইরেক্ট প্রিন্টিং। সুতির কাপড়ে সবচেয়ে ভালো ফল দেয় এই পদ্ধতি।
রেজিস্ট প্রিন্টিং: রেজিস্ট প্রিন্টিং তুলনামূলক জটিল একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রথমে কাপড়ের নির্দিষ্ট অংশে কাদা, মোম বা বিশেষ পেস্ট প্রয়োগ করা হয়। এই পেস্ট রংকে ঢুকতে বাধা দেয়। এরপর পুরো কাপড় রঙে ডোবানো হয়। মোম, কাদা বা পেস্ট থাকা অংশে রং ঢোকে না। শুকানোর পর মোম, কাদা বা পেস্ট ধুয়ে ফেলা হয়, সাদা ও রঙিলা অংশের সমন্বয়ে ফুটে ওঠে কাঙ্ক্ষিত নকশা। এই পদ্ধতি দিয়ে তৈরি নকশায় একধরনের নরম, প্রাকৃতিক ফাটলধর্মী টেক্সচার দেখা যায়। রাজস্থানের দাবু প্রিন্ট এই পদ্ধতির একটি জনপ্রিয় উদাহরণ।
ডিসচার্জ প্রিন্টিং: এই পদ্ধতিতে প্রথমে একটি গাঢ় রঙে রাঙানো হয় কাপড়। এরপর ব্লকে হালকা ব্লিচ বা রাসায়নিক পদার্থ লাগিয়ে কাপড়ে ছাপ দেওয়া হয়। রং তুলে ফেলে নির্দিষ্ট অংশে হালকা বা সাদা নকশা তৈরি করে এই রাসায়নিক। কখনো সেই অংশে আবার প্রয়োগ করা হয় অন্য রং। সূক্ষ্ম কনট্রাস্ট তৈরি করতে ব্যবহৃত হয় ডিসচার্জ প্রিন্টিং। সুতি বা লিনেনের মতো প্রাকৃতিক কাপড়ে এটি ভালো কাজ করে।
হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসা
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে যন্ত্রচালিত মুদ্রণপ্রযুক্তির আবির্ভাব ব্লক প্রিন্টিংয়ের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। বাজার দখল করে নেয় দ্রুত উৎপাদনক্ষম সস্তা কাপড়। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় বস্ত্রশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পেশা হারান বহু কারিগর। ব্লক প্রিন্টের ব্যবহারও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পড়ে।
বিশ শতকে সহজ, দ্রুত ও কম খরচে উৎপাদনের সুযোগ এনে দেয় স্ক্রিন প্রিন্টিং। ডিজাইন নিখুঁত, পুনরাবৃত্তি সহজ, কাজেই ব্যবসায়িকভাবে এটি লাভজনক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয় স্ক্রিন প্রিন্ট। অন্যদিকে সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর হওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে ব্লক প্রিন্টিং।
তবে গত দুই দশকে ‘হাতে তৈরি’, ‘স্লো ফ্যাশন’ ও ‘টেকসই’ পণ্যের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। মানুষ এখন জানে হাতে তৈরি জিনিসের মূল্য আলাদা।
ব্লক প্রিন্টিংয়ের এই পুনর্জাগরণ তাই কেবল বাজারের পরিবর্তন নয়, এটা এক সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্বিবেচনা। ডিজিটাল পৃথিবীতে মূল্য পাচ্ছে অ্যানালগ পদ্ধতি, যন্ত্রের যুগে হাতের স্পর্শ, একঘেয়েমির ভিড়ে স্বকীয়তা—এই সবকিছুর মিলনে আবারও জনপ্রিয় হচ্ছে ব্লক প্রিন্ট।
বাংলাদেশে কারা করেছেন, কারা করছেন
বাংলাদেশে ব্লক প্রিন্টিংয়ের ইতিহাস সুপ্রাচীন। চর্চাও দীর্ঘদিনের। ‘ছাপাই’ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গ্রামীণ কারুশিল্পে কাঠের ব্লক ব্যবহৃত হতো। মূলত হাতে তৈরি কাঠের ব্লকের মাধ্যমে কাপড়ে নকশা করাটা ঐতিহ্যবাহী শিল্প। কয়েক শতাব্দী ধরে প্রচলিত আছে এই শিল্প। প্রাচীনকালে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হতো।
স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকে শিল্পী কামরুল হাসানের মতো শিল্পীদের হাত ধরে এটি একটি সহজ ও জনপ্রিয় ফ্যাশন মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে। তবে একটা সময় কাঠ খোদাই করে ব্লক তৈরির কারিগরের আকাল ছিল।
ফলে বিকল্প পদ্ধতি বের করেছিলেন কামরুল হাসান—আলু ও লাউয়ের ডাঁটা ব্যবহার করে ব্লক করতেন তিনি। সেই শাড়িও বিশেষ জনপ্রিয় হয়। পরে পুরান ঢাকায় একজন ব্লক তৈরির কারিগর পাওয়া গেলে কাঠের ব্লক দিয়ে প্রিন্ট করা শুরু করেন।
আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কাঠের ব্লক। তবে তখন কেবল কেমিক্যাল রঙেই ব্লক করা হতো। এই ধারায় ছেদ টানেন রুবি গজনবী।
১৯৮০-এর দশকের গোড়ায় প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজ শুরু করেন রুবি গজনবী। প্রাকৃতিক রঙের এই পুনর্জাগরণের প্রভাব কেবল ডাইংয়েই নয়, ব্লক প্রিন্ট ও স্ক্রিন প্রিন্টিংয়েও পড়ে। রেজিস্ট পদ্ধতিতে প্রিন্ট করতেন তিনি।
সেখানে মোম ব্যবহার করতেন। তাঁর নিখুঁত ব্লক প্রিন্ট ছিল দারুণ জনপ্রিয়। তাঁর পথ ধরে অনেকেই প্রাকৃতিক রং দিয়ে ব্লক প্রিন্ট করা শুরু করেন।
বছর বিশেক আগে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের ব্যবস্থাপনায় এবং রুবি গজনবীর উদ্যোগে একজন মাস্টার ব্লক কাটারকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। তিনি ভারতের বিখ্যাত ডিজাইনার ঋতু কুমারের ব্লক কাটতেন।
সেবার তিনি কয়েকটা টিপস দিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথমত, ব্লক সবচেয়ে ভালো হয় শিশু কাঠে। দ্বিতীয়ত, ব্লক কাটার পর ২৪ ঘণ্টা ভালো শর্ষের তেলে ডুবিয়ে রাখতে হয়। তারপর তুলে মুছে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, ব্যবহারের পর ধুয়ে শুকিয়ে রাখলে ব্লক ভালো থাকে।
বাংলাদেশে ব্লক প্রিন্টের উন্নয়নে আরও কয়েকজন ডিজাইনারের কথা বলতে হবে। প্রথমেই আসবে চন্দ্রশেখর সাহার নাম। গত শতকের আশির দশকে আড়ংয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে নানা মাধ্যম নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। ব্লকও বাদ যায়নি। বরং নানা ধরনের মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন।
আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে রীনা লতিফের ব্লক প্রিন্ট। তিনি বলেই দিতেন, তাঁর ব্লক আনইভেন। আর আনইভেন হওয়ার কারণে কাপড়ের জমিনে নকশা আলাদা ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। এরপর অবশ্যই বলতে হয় জার্মানপ্রবাসী আনিলা হকের কথা। অনেক বছর হলো তিনি কাজ করেন না। তাঁর ব্লক ছিল ইউনিক।
ছোট–বড় নানা ধরনের মোটিফের ব্লক নিজে নকশা করে তৈরি করিয়ে নিতেন। ডিজাইনার এমদাদ হকও ব্লক নিয়ে কাজ করেছেন। নকশার ক্ষেত্রে তাঁর স্বকীয়তা ছিল।
নব্বইয়ের দশকে আমাদের ফ্যাশন হাউসগুলো মূলত জমিন অলংকরণের মাধ্যম হিসেবে ব্লক প্রিন্টই ব্যবহার করেছে। আড়ং ছাড়াও কে ক্র্যাফট, অঞ্জনসসহ অনেক ব্র্যান্ডই ছিল এই ধারার অনুসারী।
একটা কথা না বললেই নয়, তাঁতে বোনার সময় নকশা করা শাড়ির বাইরে গজ কাপড় কিনে জমিন অলংকরণ করা বা তাঁতে বোনা প্লেন শাড়ি কিনে তাতে নকশা করার যে চল পটুয়া কামরুল হাসান শুরু করেছিলেন, সেই ট্র্যাডিশনকেই অব্যাহত রাখেন আমাদের ফ্যাশন হাউস ও ডিজাইনাররা।
মাঝে কিছুটা মন্দা সময় গেলেও বর্তমানে এই ধারা আরও বলশালী হয়েছে। তবে মর্ডান্ট হিসেবে সবাই যে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে, তা কিন্তু নয়। অনেকেই রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে রংকে উজ্জ্বল করেন। আজকের দিনে ঢাকার বিভিন্ন ডিজাইন হাউস ও নারী উদ্যোক্তারা ব্লক প্রিন্টকে নতুনভাবে তুলে ধরছেন।
শাড়ি, কুর্তি, ওড়না, বেড কভার, পর্দা ও কুশন কভারে। নকশিকাঁথা, পল্লিপ্রকৃতি, আলপনা ইত্যাদি দেশীয় মোটিফকে ব্লক প্রিন্টের মাধ্যমে নতুনভাবে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের তরুণ ডিজাইনাররা। এতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটছে। অনেকে আজকাল রোড ব্লক ব্যবহার করেও চমৎকার সব কাজ করছেন। অনেকে থিমেটিক কাজও করছেন।
শুরুর দিকে ব্লক প্রিন্ট বা বাটিকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও বিভিন্ন মহিলাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এ শিল্পের প্রশিক্ষণ প্রদান করে এটিকে আরও জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছে।
সাবধানতা ও সংকট
কয়েকটা বিষয় এখানে বলা প্রয়োজন। আমাদের ব্লক প্রিন্টাররা বেশি রঙের ব্লক করতে চান না। বাংলাদেশে ব্লক নকশায় বড় বড় চারটা রং ব্যবহার করা হয়। ব্লক নিখুঁতভাবে কাটা হয় না বলে বেশি ব্লক নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়।
অথচ ভারতে বর্তমানে একটা নকশার জন্য ১১-১২টা ব্লক ব্যবহারের রীতি চালু আছে। ভারতে কোনো কোনো ব্র্যান্ড কেবল ব্লক নিয়েই কাজ করে। ব্লকের পুনরুজ্জীবন ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে তারা। এ ধরনের প্রয়াস বা উদ্যোগ আমাদের এখানে তেমন দেখা যায় না।
উৎপাদন ব্যয় কমাতে অনেকে নিম্নমানের রং এবং বাইন্ডার ব্যবহার করেন। এতে ত্বকের নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। এ বিষয়ে সবার সাবধান ও সচেতন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভারতের মতো বাংলাদেশে খোলাবাজারে ব্লক পাওয়া যায় না। এ জন্য অনেকেই ভারতে গিয়ে ব্লক কিনে আনেন। নিউমার্কেটে অনেক প্রিন্টার আছেন, যাঁদের ব্লক দিলে প্রিন্ট করে দেন বা তাঁদের কাছে থাকা ব্লক দিয়ে প্রিন্ট করিয়ে নেওয়া যায়। এটাও একটা ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে। কয়েক বছর আগে এই এলাকায় আগুন লাগলে এই ডিজাইনারদের অনেকে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
সব ফ্যাশন হাউস নিজেদের মতো করে ব্লক তৈরি করিয়ে নেয়। তবে বাংলাদেশে ভালো মানের ব্লক কাটার কারিগরের অভাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে অবশ্য নরসিংদী। দেশের মধ্যে সেখানেই বেশির ভাগ ভালো ব্লক তৈরি হয়ে থাকে। এ জন্য কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন নির্মল বাবু। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করেছেন তিনি। অনেককেই কাজ শিখিয়েছেন। বর্তমানে বয়স হয়ে যাওয়ায় তিনি কাজ তেমন একটা করতে পারেন না।
সময়-অতিক্রমী শিল্প
ব্লক প্রিন্টিং একটি সময়-অতিক্রমী শিল্প। চার হাজার বছরের পথচলায় এটি জ্ঞানবিস্তার থেকে রাজকীয় বস্ত্র, ঔপনিবেশিক সংকট থেকে আধুনিক পুনর্জাগরণের মতো অনেক কিছুরই সাক্ষী। স্ক্রিন ও ডিজিটাল প্রিন্টের নিখুঁত যান্ত্রিক উৎকর্ষের তুলনায় হয়তো কিছুটা ‘অসম্পূর্ণ’, তবে এই অসম্পূর্ণতাই ব্লক প্রিন্টকে দিয়েছে অনন্যতা। প্রতিটি ছাপে থাকে কারিগরের নিবিষ্টতা, তাঁর হাতের চাপ, শ্রমের উষ্ণতা আর সংস্কৃতির অনন্য ধারাবাহিকতা।
অতীতের ঐতিহ্য, বর্তমানের সচেতনতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—এই তিনের মেলবন্ধনেই দাঁড়িয়ে আছে ব্লক প্রিন্টিং। যত দিন মানুষ হাতে তৈরি জিনিসের গল্প শুনতে চাইবে, তত দিন কাঠের ব্লক রঙে ডুবিয়ে কাপড়ের জমিন রাঙিয়ে যাবে অনবদ্য সব নকশায়।
তথ্যঋণ
রোজমেরি ক্রিল, জন গিলো ও নিকোলাস বার্নার্ড, পুপুল জয়কার, সুসান বোজেন্সসহ বিভিন্ন লেখকের বই
চন্দ্রশেখর সাহা
‘ইতিহাসে বাংলার ফ্যাশন’, নওরিন আক্তার, বাংলা ট্রিবিউন
(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল ঈদ ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)