default-image

বাংলাদেশে ঈদ উদ্যাপনের সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের কিছু উৎসব তৎপরতা ও সাংস্কৃতিক চালচিত্রের যোগ রয়েছে। এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ উদ্যাপনের ধর্মীয় আবহের সমান্তরালে চলে নানা ধরনের গান, নাট্য, নৃত্য, ক্রীড়া ও নির্মল আনন্দের অন্যান্য আয়োজন। আজকের রচনায় বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চলে আয়োজিত ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক তিনটি আনন্দ অনুষ্ঠানের বিবরণ উপস্থাপন করছি। প্রথম আয়োজনটির নাম ঝাঁপান বা ঝাঁপান খেলা। কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ঈদ উপলক্ষে ঝাঁপান খেলার আয়োজন করে থাকে। এই জেলার ঝাপান খেলার প্রসিদ্ধ এলাকা হচ্ছে মিরপুর উপজেলার কুড়িপোল, বিষনগর, ফুলবাড়িয়া, খাড়ালা ও ইসলামপুর উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলায়ও ঝাঁপান খেলার প্রচলন রয়েছে। ঝাঁপান খেলায় মূলত একদল সাপুড়ে তাঁদের সংগৃহীত ফণা তোলা শ্রেষ্ঠ সাপগুলো নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। খেলার নিয়মানুযায়ী এক-একজন সাপুড়ে তাঁদের সংগৃহীত সাপ একসঙ্গে মাটির হাঁড়ি থেকে আসরে ছেড়ে দেন এবং মাটিতে থাবা দিয়ে শব্দ করেন, সঙ্গে সঙ্গে সাপগুলো ফণা তুলে আসরে দাঁড়িয়ে পড়ে। এরপর শিকারি সাপুড়ে বা ওঝা সাপের ফণা তোলা মুখের সামনে হাতের মুঠি নিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গি করেন, কখনো বিন বাজান, গান করেন আর সাপগুলো সাপুড়ের সেই ইশারা, তাল ও সুরের ইন্দ্রজালের ভেতর ফণা দোলাতে থাকে। যে সাপুড়ের কুলীন সাপ গোখরা ও রাজগোখরা যত বেশিক্ষণ ফণা তুলে নৃত্য করতে পারে, সেই সাপুড়ে ঝাঁপান খেলায় বিজয়ী হন। তবে, শুধু সাপের ফণার নৃত্যের মধ্যে ঝাঁপান খেলা সীমাবদ্ধ থাকে না; এই খেলায় সাপুড়েরা শরীরের অনুভূতিশীল অংশে, যেমন ঠোঁটে, নাকে বা জিহ্বাতে সাপের কাপড় নেন এবং রক্তপাত করিয়ে মন্ত্র ও গাছের শক্তিতে সুস্থ থাকার কৌশল ও দর্শকের সামনে প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তাঁরা সাপ কামড়ে খাওয়ার অলৌকিক শক্তিও কখনো প্রদর্শন করেন। আসরে গেলে জানা যায়, ঝাঁপান খেলায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ সাপুড়ে কামরূপ-কামাখ্যার তন্ত্রমন্ত্রে জ্ঞানী সাধক। তাই তাঁরা অনেক অলৌকিক কর্ম সাধন করতে পারেন।

default-image


দ্বিতীয় আয়োজনটির নাম বহুরূপী। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় ঈদ উপলক্ষে বহুরূপী অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মোট ছয়টি পর্বে বিভক্ত বহুরূপীর পরিবেশনার প্রথম পর্বে তথা সরদারবাড়ি বা লাঠিখেলায় বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রকাশ প্রত্যক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় পর্ব থালানৃত্যে ছান্দিক নৃত্য কৌশলের চৌম্বকীয় গুণ প্রত্যক্ষ করা যায়। তৃতীয় পর্ব জাদু খেলায় প্রাচীন থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিস্তৃত বিলুপ্তপ্রায় জাদু ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ প্রত্যক্ষ করা যায়। চতুর্থ পর্বে মুখোশের ব্যবহারে পরিবেশিত বুইড়া-বুড়ির সঙ্গে গ্রামীণ জীবনে বহুবিবাহের সমস্যার কথা হাস্যরসাত্মক নাটিকা উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়। পঞ্চম পর্বে ভালুক নাচেও ব্যবহার করা হয় মুখোশের। অন্যদিকে পঞ্চম পর্বে নর্তকী হিসেবে নারীর ভূমিকায় পুরুষের অংশগ্রহণ এবং গ্রামীণ জীবনে নর-নারীর প্রেমের আখ্যান প্রকাশ করা হয়। সব মিলিয়ে বহুরূপীর

default-image


বাংলাদেশের গ্রামীণ ঈদ উদ্যাপনের তৃতীয় যে অনুষ্ঠানের কথা বলা যায়, তা হলো—সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের লাঠিখেলা। প্রতিবছর ঈদের পরদিন সিরাজগঞ্জ জেলার অনেক গ্রামে লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়। তবে, লাঠিখেলার জন্য সিরাজগঞ্জের প্রসিদ্ধ গ্রামগুলো হচ্ছে শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলার গাড়াদহ, মরিচা, বনগ্রাম, দোহিকলা, ব্রজপাড়া, চিনে দুকুরিয়া, মশিপুর প্রভৃতি। এ অঞ্চলের লাঠিখেলার শুরুতে থাকে ডাক ও বন্দনা। এরপর একে একে দুই লাঠি, চার লাঠি, ছয় লাঠি, আট লাঠিখেলাসহ লড়ি খেলা, সড়কি খেলা, ফড়ে খেলা, ডাকাত খেলা, বানুটি খেলা, বাওই জাক খেলা চলে। এর মধ্যে ডাকাত খেলার কাহিনিভিত্তিক উপস্থাপনা ঈদ উপলক্ষে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে প্রসিদ্ধ। এই অঞ্চলের লাঠিখেলার আসরে লাঠির পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢোলক, কর্নেট, ঝুমঝুমি, কাড়া ইত্যাদি ব্যবহূত হয়। শিশু থেকে শুরু করে যুবক, বৃদ্ধ—সব বয়সের পুরুষেরাই সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের লাঠিখেলায় অংশ নিয়ে থাকেন। চর দখল ও গ্রামীণ মানুষের সামাজিক দ্বান্দ্বিক জীবনের অবলম্বন থেকে যে লাঠিখেলার উৎপত্তি, তা আজ বাংলাদেশের মানুষের শিল্পিত জীবনের আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ঈদ উদ্যাপনে অনুষ্ঠিত লাঠিখেলা প্রত্যক্ষ করলে সেই অনুভব সবারই হবে। তবে ঈদ উপলক্ষে লাঠিখেলার এমন আয়োজন শুধু সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, খোলা চোখে তাকালে এমন অনুষ্ঠান আমরা ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, নড়াইল প্রভৃতি অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন নামে পর্যবেক্ষণ করতে পারি।

বিজ্ঞাপন
অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন