default-image

‘এই খালি, যাবা, আরমানিটোলা? আর্মেনিয়ান গির্জা চেনো তো তুমি?’

‘চিনুম না আবার! এক খিটখিট্টা বুড়ার বাসা। আর থাকে পান খাওয়া কেয়ারটেকার শংকর। কত কালারের দেশি আর ফরেন মানুষ যে ওইখানে যাওয়ার লাইগা বায়না ধরে!’

রিকশায় বাড়ালাম পা, গন্তব্য আরমানিটোলা। আমি, যে কিনা একসময় পড়েছি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস লুসি আর্মানির হৃদয়রহস্য কিংবা হরহামেশা পরে থাকি আর্মানি জিনস, যদিও জানি এসবের সঙ্গে পুরান ঢাকার আর্মেনিয়ান গির্জার দূরত্ব বিস্তর। একগুচ্ছ সমাধিই সেখানকার জীবনপ্রণালি।

এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আর্মেনিয়ান গির্জার প্রবেশদ্বারে নামলাম। দ্বারে বসা পাহারাদারকে বলতেই ডেকে দিল কেয়ারটেকার শংকরদাকে। অভিলাষটা ব্যক্ত করলাম তার কাছে, গোরস্থান ঘুরব, গির্জার ভেতরটা দেখব আর ঢাকার শেষ আর্মেনিয়ান মাইকেল জোসেফ মার্টিনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো কথা বলব।

‘শংকর, কে কথা বলে?’

বাপরে! সাক্ষাৎটা এভাবে ঘটবে, আগে বুঝিনি। এত দর্শনার্থী রোজ এখানে আসে যে বুড়োর খিটমিট করা অস্বাভাবিক না। আর সবার মতো আমারও যে উদ্দেশ্য এই গোরস্থান, গির্জা ঘুরে দেখা, তা বুঝতে বাকি রইল না তাঁরও। 

বললেন, ‘ঘুরে দেখো মাই সান, বাট নো পিকচার, নো সাউন্ড। এখানে ঈশ্বরের সন্তানেরা সব ঘুমিয়ে আছে। তাদের শান্তিভঙ্গ কোরো না।’

যেখানেই পা রাখি, সেখানেই সমাধি। যেন একটা এপিটাফ-সরণি। হবেই তো, তিন শর ওপরে সমাধি এখানে। আর আজকের তো না, প্রায় আড়াই শ বছরের বুড়ো গির্জা, তারও বেশি পুরোনো কবরখানা।

মৃত ব্যক্তিদের এপিটাফে উৎকীর্ণ নিঃশব্দ কাকলি ছেড়ে গির্জার ভেতরে ঢুকি আমি। মাইকেল জোসেফ মার্টিন দেখান একটা তৈলচিত্র, নিকি পোগজের আঁকা ‘লাস্ট সাপার’। ঐন্দ্রজালিক ভোজের অনিন্দ্য চিত্র দেখে আমার ভেতরে কি ক্ষুধা জেগে ওঠে!

আশ্চর্য, তখনই মার্টিন তাঁর খিটখিটে ভাব ছেড়ে কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘চলো। এত রোদ মাথায় করে এসেছ। একটু খাবে চলো।’

গির্জার পাশেই রক্তিম ইটের পুরোনো বাড়ি, আমি আর মার্টিন মুখোমুখি। চা-বিস্কুট খেতে খেতে শুনি ২০১০-এর দিঘল দুপুরে আশি বছরের ভারে নুয়ে আসা মানুষটার কথা। একটা মানুষের জীবনবৃত্তে লেগে থাকে কাঁহা কাঁহা মুলুকের গল্প! বার্মা মুলুকের রেঙ্গুনে জন্ম, বাবার বাড়ি আর্মেনিয়া, ইরানি মা। ১০ বছর বয়সে এসে ছেলের জীবনের পুরোটাই নিয়ে নিল ঢাকা। কে ভেবেছে পারিবারিক পাটের ব্যবসায় এসে গোরস্থানের গন্ধে কেটে যাবে তাঁর জীবন-যৌবন!

হঠাৎ বেজে ওঠে তাঁর ফোন, কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন ধরতেই আমার কানে ভেসে আসে অবোধ্য কিন্তু আন্তরিক কিছু বর্ণের দ্যুতি। বুঝলাম নিজ ভাষায় কথা বলছেন কোনো নিকটজনের সঙ্গে।

ফোন রেখে মার্টিন বললেন, ‘আমার মেয়ে এলিনর। কানাডা থেকে ফোন করেছিল। তিন মেয়েই তো দূর বিদেশে। আমাকেও হয়তো নিয়ে যাবে শিগগিরই, কিন্তু আমি এই গির্জা-গোরস্থান ছাড়া বাঁচব কী করে! ভেরোনিকাও তো শুয়ে আছে এখানে।’

‘ভেরোনিকা...’

আমার প্রশ্ন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই বললেন, ‘ভেরোনিকা আমার স্ত্রী। আমাকে ছেড়ে গেছে পাঁচ বছর আগে, ঈশ্বরের আহ্বানে সেও শুয়ে পড়ল এই মাটির বিছানাতে।’

একে একে ঢাকার অনেক আর্মেনিয়ান মারা গেছে, বাকিরা পাড়ি দিয়েছে বিদেশ-বিভুঁইয়ে। মার্টিন বছর পঁচিশ আগে এই গির্জার পালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু দীপ নিভে আসে বারবার। ক্রমে স্বজাতিশূন্য মার্টিন প্রতিদিন এই গির্জার জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ নিবন্ধনের পুরোনো খাতাগুলো ধুলো ঝেড়ে খুলে দেখেন, নোট রাখেন। বাংলায় আর্মেনীয়দের ইতিহাসের ধারাটা বুঝতে চেষ্টা করেন। নিজের কৌতূহলে তো বটেই, প্রতিদিন এখানে আসা উৎসাহী মানুষের জিজ্ঞাসার জবাব দিতেও তাঁকে এসব করতে হয়। নিঃসঙ্গ মার্টিনকে কানাডা নিয়ে যেতে তাঁর মেয়েরা কতবার তাগাদা দিয়েছে, তবে ওঁর সাফ কথা, ‘আমি চলে গেলে এই গির্জা-গোরস্থান নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে না একেবারে!’

দুপুর ক্রমেই বিকেলের দিকে হেলে পড়ছিল। এর মধ্যে গির্জার গাছের ডালপালা নড়াচড়ার জোর শব্দেও যেন ভাঙতে চায় না এখানকার জমাট-বাঁধা প্রাচীন নিস্তব্ধতা।

আমাকে এবার উঠতে হবে। যাওয়ার আগে মার্টিনের দিকে করমর্দনেচ্ছুক হাত বাড়াতেই বললেন, ‘তোমার মতো অনেকেই রোজ আসে। তাদের অনেকের সঙ্গে দ্বিতীয়বারও দেখা হয়। তুমিও হয়তো আবার আসবে, কিন্তু তত দিনে হয়তো আমাকে চলে যেতে হবে, মেয়েদের কাছে অথবা ঈশ্বরের কাছে।’

আমার কানে এসে বাজতে থাকে বৃদ্ধ মার্টিনের অশ্রুহীন সংগোপন আর্তির শব্দ। বোকার মতো প্রশ্ন করে বসি, ‘একটা কথা বলবেন কি! কেন এত বছর এই গোরস্থানে কাটিয়ে দিলেন মৃতদের প্রতিবেশী হয়ে?’

মার্টিন মনে হয় এই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই ছিলেন, ‘তুমি ইয়ং ছেলে। প্রথম প্রেম তো বুঝে থাকবে। ভেরোনিকা আমার প্রেম ছিল, সঙ্গিনী ছিল, কিন্তু আমার আসল প্রেম, প্রথম প্রেম ছিল এপিটাফ।’

‘এপিটাফ?’

‘ছোটবেলা থেকে গির্জাঘেঁষা এই গোরস্থানে দেখে আসছি মৃতদের প্রেমাস্পদেরা তাদের প্রয়াত প্রেমীজনদের স্মৃতিতে কত সুন্দর এপিটাফ খোদাই করে থাকে। একসময় সেই জীবিত প্রেমীজনেরাও মরে ভূত হয়ে যায়। কিন্তু থেকে যায় এপিটাফে লেখা তাদের প্রেমবচন। দেখেছ তো কত বিচিত্র অন্তরের অক্ষরে লেখা এক একটা এপিটাফ—“শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকো প্রিয়। পুনর্বার দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত”, “ঈশ্বর, আমাকে দুঃখ দেওয়াই কি ছিল গূঢ় লক্ষ্য! তাই তাকে আমার কাছ থেকে অকালে ছিনিয়ে নিলে” বা “একটু নীরব থাকতে দাও এই কবরের মানুষটাকে, সে আমার বেঁচে থাকার সব ধ্বনি বুকে নিয়ে আজ ঘাস হয়ে গেছে”—এই রকম কত শত এপিটাফ। আমি এই গির্জার মৃত মানুষদের প্রেমের পাহারাদার। ঢাকার শেষ আর্মেনিয়ান, এসব এপিটাফ আমার প্রথম প্রেম।’

সেদিন মার্টিনের সঙ্গে কথাবার্তা শেষে ফিরে এসেছিলাম। এরপর তো প্রতিনিয়ত জীবনের প্রাত্যহিকের দিকে ছোটা। আরমানিটোলা বহুবার গেলেও গির্জায় আর ঢোকা হয়নি।

কিন্তু এই নিষ্ঠুর এপ্রিলের ১০ কি ১১ তারিখে ফেসবুকে ভেসে এল জাকার্তা পোস্ট-এর একটা প্রতিবেদন, ‘৯০তম জন্মদিনের অল্প কিছু আগে কানাডার ওন্টারিওতে মারা গেছেন ঢাকার শেষ আর্মেনিয়ান মাইকেল জোসেফ মার্টিন।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে গুরুতর অসুস্থ মার্টিনকে তাঁর মেয়েরা কানাডা নিয়ে যান।

আমি প্রতিবেদনটা আঁতিপাঁতি করে খুঁজি; না, কোথাও নেই তাঁর এপিটাফে কী লেখা হবে সে তথ্যটুকু। অগত্যা আমিই সেই প্রথম ও শেষ সাক্ষাতে শোনা কথামালার স্মৃতফসিল থেকে মনে মনে একটা এপিটাফ নির্মাণ করি:

মাইকেল জোসেফ মার্টিন

জন্ম: বার্মা, মৃত্যু: কানাডা

জাতিতে আর্মেনীয়, কিন্তু তাঁর প্রেম ছিল

বাংলাদেশ, ঢাকা...

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0