বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এখান থেকে দুপা এগোলেই নিকলসন স্ট্রিট, তার পাশে মাঠের এ মাথায় দৈত্যাকার একটা ওকগাছ। ঠিক এগারো বছর পর ওটাকে শতবর্ষী বৃক্ষ বলা যাবে। এখানকার বন বিভাগের এক কর্মীর স্ত্রী মিসেস কম্পটনের নামে এটাকে ওরা আদর করে নাম দিয়েছে কম্পটন ওক। পেল্লায় গাছটা এ রকম রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরেও তার নতমুখী শাখা–প্রশাখা ছড়িয়ে ঘন ছায়া নামিয়ে দিয়েছে চারপাশে। গাছ ঘিরে মাটিতে পায়া পোঁতা বেঞ্চি বসানো। একটা ডাল ভূমির সমান্তরাল হয়ে চড়ে বসার মতো উচ্চতায় বাড়িয়ে রেখেছে তার বাহু। উল্টো দিকে দুপা এগোলেই ১৭৮৮ সালে তৈরি আইনজীবী এবং অধ্যাপক সেন্ট জর্জ টাকারের বাড়ি, তারপর ১৭১৮ সালের মেয়রের বাড়ি পেরিয়ে গেলে ১৭২২ সালে তৈরি গভর্নর প্যালেস। প্যালেস বলছে বটে, কিন্তু ওটার আকার–আকৃতি দেখে ভক্তি-শ্রদ্ধা জাগে না। তবে হ্যাঁ, প্যালেস বলা যায় ১৯০৫ সালে তৈরি আমাদের তখনকার গভর্নর হাউস মানে বর্তমানের বঙ্গভবনকে। এদের গভর্নর প্রাসাদে ঢোকার কোনো ব্যবস্থা দেখি না। তবে পাশেই প্রাসাদের রসুইঘরে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে দর্শনীর বিনিময়ে, ওখানে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। ওটার দরজার সামনে আঠারো শতকের পোশাকের এক পরিচারিকাকে দেখা গেল, অভ্যর্থনা করার জন্য প্রস্তুত। তবে ভেতরে না ঢুকে কেউ ওর সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলেও আপত্তি করছে না।

আমরা কোনো বাড়িতে ঢুকছি না বলে বিশেষ কিছু দেখা থেকে যে বঞ্চিত হচ্ছি, এমন মনে হচ্ছে না। রাস্তায় লোকজনের বহর দেখে মনে হয়, ভেতরে যত লোক ঢুকছে, তার চেয়ে বেশি মানুষ আমাদের মতো বাইরে থেকেই ঘুরে দেখছে। একটা খালি বাড়ির পেছনে পাথরের দেওয়ালঘেরা পাতকুয়া, তার পাশে মোটা ফাঁসির দড়ির মতো ফাঁসে বাঁধা কাঠের বালতি। কুয়ার ওপর ছোট দোচালা। এককালে যে এখানে সাপ্লাইর পানি ছিল না, কুয়াটা তারই সাক্ষীগোপাল। এটা সবার জন্য খোলা, তা না হলে মিনিমাগনা ভেতরে ওটার কাছে যাওয়ারই কোনো সুযোগ মিলত না।

ডিউক অব গ্লুচেস্টার রোডটাই পল্লির প্রধান সড়ক। ওটার দুই পাশে জুতার কারিগরের কারখানা, ফ্যাশন স্টোর, অলংকার তৈরির স্যাকরার দোকান। ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভার্জিনিয়াবাসীকে নিজেদেরই অস্ত্র তৈরি করতে করেছিল। এই রাস্তার পাশেই রয়েছে সেই অস্ত্রকারখানা। কারিগর, কর্মী আর ক্রীতদাসদের জন্য রুটির কারখানা এবং আনুষঙ্গিক ওয়ার্কশপ ইত্যাদিও গড়ে উঠেছিল এটিকে ঘিরে।

এই প্রাচীন পল্লিতেই ছিল আমেরিকার দ্বিতীয় প্রাচীন কলেজ উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি। এটা থেকে পাস করে বের হওয়া ছাত্রদের মধ্যে তিনজন পরবর্তী সময়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন—জেফারসন, জেমস মনরো ও জন টাইলার। প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এই কলেজে না পড়লেও এখান থেকে নিয়েছিলেন সার্ভেয়ার সনদ, পরবর্তী সময়ে কলেজটির প্রথম আমেরিকান চ্যান্সেলরও হয়েছিলেন তিনি।

ডিউক অব গ্লুচেস্টার রোডের পাশে একটা বাড়ি চিনতে পারি মালিকের নাতজামাইয়ের নাম দেখে। বাড়িটার মালিক অরলান্ডো জোনস ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটনের দাদাশ্বশুর। জোনস ১৭১৯ সাল পর্যন্ত এ বাড়িতেই থাকতেন।

রাস্তার উল্টো পাশে কোর্টহাউস। সেটির বন্ধ দরজার ভেতর থেকে দুই পাশ ওল্টানো হ্যাট পরা বিচারক কোনো দিকে না তাকিয়ে চিন্তিত গম্ভীর মুখে রাস্তা পেরিয়ে হেঁটে গেলেন, মনে হলো যেন এইমাত্র একটা ফাঁসির হুকুম দিয়ে এসেছেন।

এ পাশে রাস্তার পাশে খোলা বাজার বসেছে অল্পস্বল্প পসরা নিয়ে। তেমন কিছু পাওয়া যায় না সেখানে, বেতের হ্যাট, সাবেকি আমলের লন্ঠন, বাচ্চাদের কিছু খেলনাপাতি, ফলমূল, বোতলের জল আর ড্রিংকস। দু–চারটা বাচ্চা পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে অতি সাধারণ খেলনাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করছে। মায়েদের দৃষ্টিতে নির্লিপ্ততা দেখে সরে আসে ওরা।

ডিউক অব গ্লুচেস্টার রোডের শেষ মাথায় লালচে ইটের ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের গেটের বাইরে অষ্টাদশ শতাব্দীর পোশাকের এক নারী আমন্ত্রণের হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ওয়াশিংটন ডিসির বর্তমান ক্যাপিটল ভবনের তুলনায় নিতান্ত ছোটখাট এই তিনতলা ভবন পুরোনো ধাঁচের করে তৈরি হলেও প্রাচীনত্বের কোনো ছোঁয়া নেই। সেটিতে ঢোকার কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে আমরা দ্রুত পা চালিয়ে যখন চিজ শপ নামের খাবারের দোকানটায় পৌঁছাই, তখন বিকেলের ছায়া ঘন হয়ে নেমে এসেছে।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন