লিও তলস্তয়ের মস্কোর বাড়ি

গ্রাফিকস: প্রথম আলো
যেখানে সারল্য, ভালোমানুষি এবং সত্য না থাকে, সেখানে কোনো মাহাত্ম্য নেই।
লিও তলস্তয়

লিও তলস্তয় ছিলেন জমিদার। ইয়াস্নায়া পলিয়ানা নামক বিশাল এস্টেটের জমিদার। হঠাৎ করে যে তাঁর কী হলো! তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। দামি পোশাক–আশাক বর্জন করলেন। খাওয়াদাওয়া নেমে এল সাধারণ স্তরে। নিজ জমিদারির কৃষকদের দিতে লাগলেন বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধা। এমনকি তাদের সন্তানদের পাঠদান করতে শুরু করলেন নিজেই। জাগতিক সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকলেন। কয়েকবার আত্মহত্যারও চেষ্টা চালান, তবে বিফল হন। তাঁর মনে হতে থাকে, ‘এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? কেন এই জীবন? এ জীবনের কি কোনো শুরু আছে বা শেষ আছে?’ ৫১ বছর বয়সে এসব ভাবনা দানা বাঁধে তলস্তয়ের মনে।

এর আগেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো। ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় লেখা আনা কারেনিনার পর অনেক দিন তিনি কিছুই লেখেননি। আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধানে তলস্তয় যখন এ রকম মানসিক টানাপোড়েনে আছেন, তখন স্ত্রী সোফিয়া সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা মস্কোতে গিয়ে বসবাস করবেন। কারণ, এই গণ্ডগ্রামে তাঁর সন্তানদের উন্নত পড়াশোনা হচ্ছে না। মস্কো যাওয়ার ব্যাপারে তলস্তয়ের একেবারেই মত ছিল না। নীরব, ভোগবিলাসহীন, সাদামাটা এই ইয়াস্নায়া পলিয়ানা এবং এই জমিদারির কৃষকেরাই যে তাঁর সবকিছু। কিন্তু সোফিয়া এসব ছুতো মানবার পাত্রী নন। তিনি একপ্রকার জোর করেই মস্কোতে একটি বাড়িতে বসবাসের বন্দোবস্ত করে ফেলেন। অগত্যা তলস্তয়কেও পরিবারের সঙ্গে মস্কোতে গিয়ে বসবাস শুরু করতে হয়। মস্কোর বাড়িটিতে তলস্তয় আট বছর থেকেছেন।

মস্কোর বাড়িতে লিও তলস্তয়ের সাইকেল ও পোশাক
লেখকের সৌজন্যে

মস্কোর আগে আমি ইয়াস্নায়া পলিয়ানা ঘুরে এসেছি। লিও তলস্তয়ের মস্কোর বাড়িটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। সুসজ্জিত শহর আর রুচিশীল মানুষের নগর মস্কো। শহরের পথঘাট দেখতে দেখতে তলস্তয়ের বাড়ির দিকে যাচ্ছি। তলস্তয়ের বাড়ির আশপাশে সব আধুনিক ভবন। ভবনগুলো তিনতলা বা চারতলার বেশি উঁচু নয়।

লিও তলস্তয়ের বাড়িটি বাইরে থেকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে প্রবেশ করতেই কাঠের তৈরি বিশাল একটি দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল। ১৮৮২ থেকে ১৯০১ সাল অবধি তলস্তয় এখানে ছিলেন। প্রায় দুই শ পঁচিশ বছরের পুরোনো কাঠের বাড়ি এখনো অক্ষত আছে দেখে যারপরনাই আশ্চর্যান্বিত হলাম। এত পুরোনো কাঠের বাড়ি আমি আগে দেখিনি। বাড়ির রং বাদামি আর তাতে সবুজ বর্ডার দেওয়া। গেট দিয়ে ঢোকার পর প্রথমে বাড়ি তারপর অবারিত সবুজ এক বাগান চোখে পড়ে। এই আধুনিক পাড়ায় এমন সীমাহীন সবুজ বনের মতো বাগান দেখে বিস্ময় কাটছে না। লিও তলস্তয় মনে হয় নিজ গ্রাম ইয়াস্নায়া পলিয়ানাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। বাগানের সামনেই একটা বেঞ্চ পাতা। এখানে সারা দিন বসে থাকলেও ক্লান্তি এসে ভর করবে না।

আনা কারেনিনার পর অনেক দিন তিনি কিছুই লেখেননি। আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধানে তলস্তয় যখন এ রকম মানসিক টানাপোড়েনে আছেন, তখন স্ত্রী সোফিয়া সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা মস্কোতে গিয়ে বসবাস করবেন। কারণ, এই গণ্ডগ্রামে তাঁর সন্তানদের উন্নত পড়াশোনা হচ্ছে না।

বাড়িটা বাগানের দিকে মুখ করা। প্রবেশের দরজা বাগান থেকে ঘুরে অন্য পাশে। কাঠের বাড়ি আমি অনেক দেখেছি, তবে এমন মজবুত কাঠের বাড়ি আগে দেখিনি। বাড়ির প্রথমেই লম্বা একটা প্যাসেজের ডান দিকের কক্ষটি ছিল তলস্তয় পরিবারের খাবার ঘর। খাবার ঘরের লম্বা একটা টেবিল পাতা। টেবিলের ওপর প্লেট, গ্লাস, চামচ এমনভাবে সাজানো আছে, যেন এখনই বাড়ির সবাই এসে বসবে খাবার টেবিলে। টেবিলে সাদা টেবিলক্লথ বিছানো। টেবিলে সাজানো ক্রোকারিজ সব সাদা, নীল রঙের নকশা করা বর্ডার দেওয়া। টেবিলের ঠিক মাঝখানে ঝাড়বাতি ঝুলছে। এ কক্ষে বাগানের দিকে মুখ করা দেয়ালজোড়া জানালা আছে। দেয়ালের রং বাদামি। এই কক্ষে খাবার টেবিল আর চেয়ার ছাড়া অন্য কোনো আসবাব নেই।

লিও তলস্তয়ের মস্কোর বাড়ি। ১৮৮২ থেকে ১৯০১ সাল অবধি তলস্তয় এখানে ছিলেন
লেখকের সৌজন্যে

খাবার ঘর পার হলে ডান পাশে যে কক্ষ, সেখানে বিভিন্ন সময়ে তলস্তয়ের ছেলেমেয়েরা থেকেছেন। তলস্তয়ের মোট আট সন্তান ছিলেন। প্রথমে লেভ–এর জন্য এই কক্ষ বরাদ্দ ছিল। মাঝখানে তলস্তয়ের অন্য সন্তান এই কক্ষে থেকেছিলেন। সবশেষে কন্যা ইলিনা এই কক্ষে বসবাস করেছিলেন। কক্ষের ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। বাইরে থেকে কক্ষের ভেতরে একটা বিছানা, পড়ার চেয়ার-টেবিল, একটা পিয়ানো আর একটা কাচের শোকেসে ইলিনার লম্বা, ফ্রিল দেওয়া সাদা রঙের গাউন রাখা। বিছানার সামনে আস্ত বাঘের চামড়ার ফ্লোরম্যাট পাতা। এই কক্ষের জানালাও বাগানমুখী। জানালার দিকে তাকালে শুধু সবুজ চোখে পড়ে। এই কক্ষটিকে কর্নার রুমও বলা হয়। প্রথম দিকে এই কক্ষে সবাই জড়ো হতো তলস্তয়পুত্র সেরগেই–এর পিয়ানো বাজানো শুনতে বা ইনডোর গেম খেলতে। মাঝেমধ্যে তলস্তয়ও এখানে পিয়ানো বাজাতেন। তবে সবশেষে এখানে ইলিনা থেকেছেন।

খাবার ঘরের বাঁ পাশের ঘরটি হলো তলস্তয়ের শোবার ঘর। ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় দেখেছিলাম দোতলায় তলস্তয়ের শোবার ঘরে একটিমাত্র সিঙ্গেল বিছানা। সেখানে বেশ কয়েক বছর তিনি লেখার সুবিধার্থে বেজমেন্টের দুটি কক্ষেও থেকেছিলেন। তবে এখানে তাঁর সিঙ্গেল বিছানাটির পাশে আরেকটা সিঙ্গেল বিছানা রাখা। তলস্তয় ও সোফিয়ার কনিষ্ঠ সন্তান আলেক্সান্দ্রা জন্মগ্রহণের পর সোফিয়া এই রুমে তলস্তয়ের সঙ্গে থাকা শুরু করেন।

হলরুমের পিয়ানো। নিচে তলস্তয়ের শিকার করা ভালুকের চামড়া
লেখকের সৌজন্যে

সাদা চাদরের ওপর বিছানায় স্ত্রী সোফিয়ার হাতে কুরুশ-কাঁটায় বোনা একটি চাদর বিছানো। এই কক্ষটিকে আসলে সোফিয়ার কাজের ঘরও বলা চলে। কক্ষের আরেক পাশে একটি সেন্টার টেবিল ও কয়েকটা গদি আঁটা চেয়ার রাখা। এখানে বসে সোফিয়া তলস্তয়ের সব লেখা আবার পরিচ্ছন্নভাবে লিখতেন এবং প্রুফ রিডিং করতেন। পাশেই দেয়ালে সোফিয়ার ছবি, তার কোলে কনিষ্ঠ সন্তান আলেক্সান্দ্রা। এক কোনায় একটি কাচের বাক্সে তলস্তয়ের হাতে লেখা বিভিন্ন লেখা ও চিঠি সাজানো আছে।

পাশের কক্ষটি তলস্তয়ের শিশুসন্তানদের ঘর। এই কক্ষে আলেক্সেই, আলেক্সান্দ্রা ও আইভান যখন ছোট ছিল, তখন থেকেছিল। এই কক্ষে একটা ছোট বিছানা ছাড়াও শিশুদের ন্যানির শোবার জন্য একটা সিঙ্গেল বেড আছে। এক কোনায় ঊনবিংশ শতকের একটা বড় কাঠের বাক্স রাখা। আরেক কোনায় রাখা একটা কাঠের ওয়ার্ডরোব। ওয়ার্ডরোবের ওপর একটা ল্যাম্প, জগ আর আয়না রাখা। দেয়ালে ঝুলছে ন্যানির গাউন আর গায়ের চাদর। তখনকার দিনে অভিজাত বংশের শিশুরা ন্যানির হাতেই বড় হতো, ন্যানিকে শিশুর পাশের বিছানায় ঘুমাতে হতো। মা–বাবার পাশের কক্ষে শিশুকে রাখা হতো, যাতে খিদে পেলে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে মায়ের সাহায্য নেওয়া যায়।

মস্কো যাওয়ার ব্যাপারে তলস্তয়ের একেবারেই মত ছিল না। নীরব, ভোগবিলাসহীন, সাদামাটা এই ইয়াস্নায়া পলিয়ানা এবং এই জমিদারির কৃষকেরাই যে তাঁর সবকিছু। কিন্তু সোফিয়া এসব ছুতো মানবার পাত্রী নন। তিনি একপ্রকার জোর করেই মস্কোতে একটি বাড়িতে বসবাসের বন্দোবস্ত করে ফেলেন।

তলস্তয়ের শোবার ঘর পার হলে প্যাসেজের ধার ধরে সারি সারি কক্ষ। সবে পার হলাম শিশুদের কক্ষ। এর পরের কক্ষ লেখকের ছেলেমেয়েদের খেলার ঘর। চেয়ার-টেবিল, বেবি চেয়ার, দুটো নিচু কাবার্ড, আর মেঝেতে বাচ্চাদের কিছু খেলনা ছড়ানো আছে। কাবার্ডের ওপর ফ্রেমে বাঁধাই করা তলস্তয়ের সন্তানদের ছবি রাখা। এর পাশের বেবি চেয়ারে একটা সাহেব পুতুলও বসে আছে।

পরের কক্ষটি তলস্তয়ের সন্তানদের পড়ার ঘর। এই কক্ষে পড়ার টেবিল ও চেয়ার ছাড়াও দুই পাশে দুটো বড় কাঠের আলমারি রাখা। এক কোনায় বইয়ের শোকেস। এই কক্ষে সন্তানেরা হোমওয়ার্ক তৈরি করত এবং বিদেশি ভাষা শিখত। বিদেশি ভাষা শেখার জন্য সোফিয়া বিদেশ থেকে সে ভাষাভাষীর শিক্ষক আনতেন।

যেন এখনই বাড়ির সবাই এসে বসবে খাবার টেবিলে
লেখকের সৌজন্যে

বিশাল এই জমিদারবাড়ির লম্বা প্যাসেজ যেন শেষই হতে চাচ্ছে না। পরের কক্ষটি লেখকের দুই পুত্র আন্দ্রেই ও মিখাইলের শোবার ঘর। তাদের জন্য লোহার রড দিয়ে বানানো বিছানা বরাদ্দ ছিল। একই বিছানা বরাদ্দ ছিল বাড়ির কাজের লোকদের জন্যও। এই কক্ষে একটা কাঠের আলমারি, কাঠের ওয়ার্ডরোব আর একটা বইয়ের শোকেস আর পড়ার চেয়ার-টেবিল রাখা আছে।

পরের কক্ষটি তলস্তয়ের রাজকুমারী জ্যেষ্ঠ কন্যা তাতিয়ানার কক্ষ। কোনো কক্ষের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই, বাইরে থেকেই দেখতে হয়। তাতিয়ানার কক্ষ দেখে মনে হবে এটি প্রাসাদের একটি অংশ। তলস্তয়ের সন্তানেরা শিল্প–সাহিত্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শুধু ইলিনা পেশায় ছিলেন নার্স।

মস্কোর বাড়িতে লিও তলস্তয়ের বসার ঘর
লেখকের সৌজন্যে

তাতিয়ানা ছিলেন চিত্রশিল্পী। তাঁর ঘরের দেয়ালের রং লাল। আর প্রতিটি দেয়ালে ঝুলছে তাঁরই আঁকা নানা পোর্ট্রেট। এই কক্ষে প্রথমেই আছে একটি টেবিল ও গদি আঁটা চেয়ার। আরেক পাশে রেশমি কাপড় দিয়ে মোড়া এক সেট সোফা। কক্ষের দুই জানালার মাঝখানে তাতিয়ানার ড্রেসিং টেবিল। আরেক কোনায় আরেকটি টেবিল। এদিক–সেদিকে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি কর্নার টেবিল। এটি যে একজন শিল্পীর কক্ষ, তা দেখেই বোঝা যায়। এই কক্ষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হলো টেবিলের টেবিলক্লথটি। কালোর নিচে লাল বর্ডার দেওয়া টেবিলক্লথটিতে তলস্তয়সহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি চক দিয়ে সই করেছিলেন। পরে তাতিয়ানা সেই সইয়ের ওপর সুই সুতা দিয়ে এমব্রয়ডারি করেছিলেন।

তলস্তয়ের জ্যেষ্ঠ কন্যা তাতিয়ানার কক্ষ
লেখকের সৌজন্যে

তাতিয়ানার কক্ষ পার হলে লম্বা প্যাসেজের শেষ কক্ষ, যা খাবার ঘরের উল্টো পাশে আছে। কক্ষটিকে বুফে রুম বলা হয়। এখানে এ বাড়ির ডিনার সেট, সামোভার ইত্যাদি রাখা আছে, যা এ বাড়ির সদস্যদের খাবারের সময় ব্যবহার করা হতো।

বাড়িটা কাঠের, আর এর সিঁড়িও কাঠের। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে প্রথমেই রাজকীয় হলরুম। এই কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ল বিশাল আকারের একটি পিয়ানোতে। এত বড় পিয়ানো আমি আগে দেখিনি। পিয়ানোর নিচে মেঝেতে ছড়িয়ে রাখা আছে একটি কালো ভালুকের চামড়া। ১৮৫৮ সালে লিও তলস্তয় এই ভালুকটি শিকার করেছিলেন। ভালুকটি শিকার করতে গিয়ে তাঁর প্রাণ বিপন্ন হওয়ার জোগাড় হয়েছিল প্রায়।

এই কক্ষের ঠিক মাঝখানে রাখা আছে বড় ডাইনিং টেবিল ও চেয়ার। টেবিলে টি–সেট রাখা। আরেক পাশে রাখা আছে মেহগনি কাঠের একটি সেন্টার টেবিল, টেবিলকে ঘিরে আছে গদি আঁটা চেয়ার। এই কক্ষে অতিথিদের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন লিও তলস্তয়। অতিথিদের মধ্যে আন্তন চেখভ, আলেক্সান্ডার অস্ত্রোভস্কি, আইভান বুনিন, ম্যাক্সিম গোর্কি ছিলেন অন্যতম। শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা ছাড়াও এ কক্ষে অতিথিদের পিয়ানো বাজিয়ে শোনানো হতো এবং তলস্তয় তাঁদের সঙ্গে দাবাও খেলতেন।

এত বড় পিয়ানো আমি আগে দেখিনি। পিয়ানোর নিচে মেঝেতে ছড়িয়ে রাখা আছে একটি কালো ভালুকের চামড়া। ১৮৫৮ সালে লিও তলস্তয় এই ভালুকটি শিকার করেছিলেন। ভালুকটি শিকার করতে গিয়ে তাঁর প্রাণ বিপন্ন হওয়ার জোগাড় হয়েছিল প্রায়।

পরের কক্ষটি তলস্তয়ের বসার ঘর। এই কক্ষের জৌলুশ দেখলে ইয়াস্নায়া পলিয়ানার সেই সাধারণ মলিন বসার ঘরকে ভুলে যেতে হবে। একজন জমিদারের বসার ঘর যেমন জাঁকজমকপূর্ণ থাকা দরকার, এই কক্ষটি সে প্রয়োজন ষোলো আনায় পূরণ করেছে। মেঝেতে দামি কার্পেট, দামি দুই সেট সোফা আর প্রতিটি টেবিলে দামি ল্যাম্প শোভা পাচ্ছে। সোফার কভার ও পর্দা সিল্কের কাপড়ের তৈরি। ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় স্ত্রী সোফিয়ার মনে যে খেদ ছিল, তা এখানে মিটে গিয়েছিল বোধ হয়। এই বাড়িকে তিনি একজন জমিদারের বাড়ির মতোই সাজিয়েছিলেন। এই কক্ষের কোনায় কোনায় কর্নার টেবিল রাখা। একটা টেবিলে মাদার অব পার্লস দিয়ে কারুকাজ করা। আর দেয়ালে দামি ফ্রেমে ঝুলছে সোফিয়ার বিভিন্ন বয়সের পোর্ট্রেট।

বাড়ির সিঁড়ি
লেখকের সৌজন্যে

হলরুম থেকে বেরোলে দোতলার লম্বা প্যাসেজের ডান পাশের প্রথম কক্ষটি তলস্তয়ের মেজ কন্যা মারিয়ার। এই কন্যা ছিলেন লেখকের প্রিয় সন্তান, লেখকের নয়নের মণি। একটু বড় হওয়ার পর বাবার সব লেখার প্রুফ তিনিই দেখে দিতেন এবং যাবতীয় চিঠিপত্রের জবাবও তিনি লিখতেন। লিও তলস্তয় বেশ কয়েকবার মারিয়ার প্রতি স্নেহের কথা উল্লেখ করেছেন। ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় বাবার সঙ্গে মারিয়া প্রজাদের সন্তানদের লেখাপড়াও শেখাতেন।

মারিয়ার কক্ষটি খুব সাধারণ। এক পাশে একটি সিঙ্গেল বিছানা পাতা, আরেক পাশে টেবিল আর টেবিল ঘিরে কয়েকটা গদি আঁটা চেয়ার রাখা। বিছানা আর টেবিলের মাঝে একটি ফোল্ডিং পার্টিশন দেওয়া। আরেক কোনায় মারিয়ার পড়ালেখার টেবিল, অন্য পাশে একটি শেলফ। এ ছাড়া এই কক্ষে আর কোনো আসবাব নেই। মারিয়ার বিছানায় তার মায়ের হাতে বোনা উলের চাদর বিছানো আছে। মারিয়া তার পিতার আদর্শ ধারণ করতেন। যেমনটা তলস্তয় বলেছিলেন, ‘জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবতার সেবা করা।’

তলস্তয়ের সন্তানের খেলনা পুতুল
লেখকের সৌজন্যে

মারিয়ার কক্ষের পরের কক্ষটি এ বাড়ির দরজি ও গৃহকর্মীর কক্ষ। এ কক্ষে দুটি সিঙ্গেল বিছানা, সেলাই মেশিন ও একটি কাঠের ওয়ার্ডরোব আছে।

এই কক্ষটি পেরোলে প্যাসেজে পাশাপাশি কয়েকটি শোকেসে তলস্তয়ের কন্যাদের গাউন ও জুতা রাখা। গাউনের ডিজাইন ও এর ওপর নকশাদার লেইসের বাহার দেখলেই বোঝা যায় দরজি খুব উন্নত মানের ও ফ্যাশনদুরস্ত ছিলেন।

প্যাসেজের পরের কক্ষটিকে বড় কন্যা তাতিয়ানা নিজের ড্রয়িংরুম হিসেবে ব্যবহার করতেন। ছোট আকারের এই কক্ষে এক সেট লাল রঙের সোফা, টেবিল-চেয়ার ও শোকেসে তাতিয়ানার গাউন ঝোলানো আছে। এই কক্ষে বন্ধুবান্ধবদের আপ্যায়ন করতেন লেখককন্যা।

তলস্তয় মোট ১৯ বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ১৬ বার সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আর ৩ বার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একপ্রকার ভালোই হয়েছে। অসৎ ও পক্ষপাতিত্বের পুরস্কার গ্রহণের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া গেল।’

পরের কক্ষটি এ বাড়ির ভ্যালেট বা প্রধান গৃহকর্মী ইলিয়া সিদোরকোভের শোবার ঘর। এ বাড়িতে ইলিয়া সিদোরকোভের অনেক দায়িত্ব ছিল—অতিথি এলে তাদের বসার ঘর অবধি এগিয়ে দেওয়া, প্রতি বেলায় পরিবারের সবাইকে ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন করা, বাড়ির শিশুদের তাদের মা সোফিয়ার কাছে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। লিও তলস্তয় তাঁর এই সহকারীকে খুব পছন্দ করতেন। তলস্তয় যখন অসুস্থ ছিলেন, তখন ইলিয়াই তাঁর সেবাযত্ন করেছিলেন; যদিও তলস্তয় অন্যের ওপর নির্ভর করা পছন্দ করতেন না।

তলস্তয়ের সন্তানদের পড়ার ঘর
লেখকের সৌজন্যে

ইলিয়ার কক্ষে একটি সিঙ্গেল বিছানা, চেয়ার–টেবিল আর একটি বড় কাঠের বাক্স রাখা। দেয়ালে ঝুলছে ফরাসি শিল্পীর আঁকা ইলিয়ার পোর্ট্রেট। একজন গৃহকর্মী মালিকের কতখানি প্রিয় হলে তাঁর ছবি চিত্রকর দিয়ে আঁকানো হয়, তা এই ছবি দেখলেই বোঝা যায়।

এর পরের কক্ষটি তলস্তয়ের লেখার ঘর বা স্টাডি। এই রাজকীয় বাড়ি ও বাড়ির অন্যান্য আসবাবের মতোই লেখার টেবিল আর অন্যান্য আসবাবও রাজকীয়। ইয়াস্নায়া পলিয়ানার মতো সাধারণ ছাপ কোনো কিছুতেই নেই। সাধারণ জীবন বরণ করার পর স্বাভাবিকভাবেই তলস্তয়ের এই জমিদারের আয়েশি জীবন পছন্দ হওয়ার কথা নয়। এ বাড়ির লেখার টেবিলটিও রাজকীয়। মেহগনি কাঠের তৈরি টেবিল আর চেয়ারটি নিচু। তলস্তয় লেখার সুবিধার জন্য নিচু চেয়ারে বসে লিখতেন। টেবিলের চারদিকে নিচু করে কাঠের ওপর নকশা করা রেলিং বসানো। টেবিলের ওপর তলস্তয়ের লেখার সরঞ্জাম আর কিছু কাগজপত্র রাখা। খাবার ঘর আর হলরুম ছাড়া অন্য কোনো কক্ষে প্রবেশ করা যায় না বলে কাছ থেকে লেখকের টেবিলখানা দেখতে পারলাম না।

মস্কোর বাড়িতে লিও তলস্তয়ের লেখার ঘর
লেখকের সৌজন্যে

টেবিলের পাশে একটি সোফা রাখা, লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনি পাশের সোফায় বসে বিশ্রাম নিতেন। এই কক্ষে তিনি ১৯০১ সালে শেষ লেখেন ‘মাই আনসার টু দা সিনোদ’। এরপর তলস্তয় আর এই বাড়িতে কখনো বসবাস করেননি। মৃত্যুবরণ করেন ১৯১০ সালে আস্তাপোভো নামের দূরের এক নির্জন রেলস্টেশনে, একা।

তলস্তয় মোট ১৯ বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ১৬ বার সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আর ৩ বার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘একপ্রকার ভালোই হয়েছে। অসৎ ও পক্ষপাতিত্বের পুরস্কার গ্রহণের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া গেল।’

মাতৃভাষা ছাড়াও তলস্তয় ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। পড়তে পারতেন আরও গোটা দশেক ভাষা। ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় তাঁর সংগ্রহের ২২ হাজার বইয়ের কিছু সেখানে দেখে এসেছি। এ বাড়িতে অবশ্য বই তেমন একটা নেই।

তলস্তয়ের মস্কোর বাড়ির সামনে লেখক
লেখকের সৌজন্যে

তলস্তয়ের লেখার ঘরের সামনের প্যাসেজে রাখা আছে তাঁর সাইকেল। তলস্তয় নাকি ৬৭ বছর বয়সে সাইকেল চালানো শিখেছিলেন। সাইকেল ছাড়াও শরীরচর্চার ডাম্বেল রাখা। সাইকেলের পেছনের শোকেসে তলস্তয়ের পোশাক, জুতা, বুটজুতা ও ছাতা রাখা। সাধারণ মানুষের পোশাকেই অভ্যস্ত ছিলেন এই মহান লেখক।

আরও পড়ুন

তলস্তয় বাগান করতে ভালোবাসতেন। বাড়ির সামনের বিশাল বাগানের পরিচর্যা তিনি নিজেই করতেন। এই প্যাসেজের আরেকটা শোকেসে রাখা আছে তাঁর বাগান করার সরঞ্জাম।

লিও তলস্তয়ের মস্কোর বাড়ি ঘুরে প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেই নিচতলার লম্বা প্যাসেজ। নিচতলার প্যাসেজের মুখেই একটা শোকেসে তলস্তয়ের ওভারকোট রাখা।

আরও পড়ুন

বাইরের বাগান এখন সবুজ অরণ্য যেন। যত দূর চোখ যায়, এখন শুধুই সবুজ। আমি বাগানের মাঝখানের পথ ধরে এগোতে থাকি। বাগানে নানা ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। আর বাগানের শেষ প্রান্তে কিছু পুরোনো বৃক্ষ আকাশের কাছাকাছি চলে যেতে চাইছে। মস্কোর পার্কগুলো ভীষণ সবুজ আর প্রশস্ত, তবে মস্কোর আধুনিক পাড়ায় এখন এ রকম পার্কের মতো বিশাল বাগান খুব একটা দেখা যায় না।