নদীর ওপারে পাকুড়গাছে বিষণ্ন গলায় যে পাখি ডাকছে, তার ডাকে যে কান্না মিশে আছে, সেই কান্না কার? হিমুর নিজের? কিন্তু হিমু তো কখনো কাঁদে না। তাকে মহাপুরুষ হওয়ার ব্রত দিয়ে গেছেন তার বাবা। সেই বাবা, যিনি নাকি হত্যা করেছেন তার মাকে—নদীর ধার ঘেঁষে পানি ছিটাতে ছিটাতে ডোরাকাটা সবুজ শাড়ি পরা ওই মেয়েকে। হিমু তবু কাউকে ঘৃণা করে না, কাউকে ভালোও বাসে না। পাপ-পুণ্য ও ভুল-সঠিকের বাইরে তার বিচরণ। তাহলে কান্নাটা কার? তারই যদি না হবে, তাহলে নদীতীরে বিষণ্ন পাখিটা কেন ডাকে হিমুর কল্পনায়? হিমুর কান্না অশ্রু হয়ে ঝরে না, নদী হয়ে বয়ে যায়। ওই বিষণ্ন পাখি হয়তো তার তরুণী মা।

এ পর্যন্ত হলে ঠিক ছিল। জীবনের ভয়াবহ এক ট্রমা হিমুকে চিরবিষণ্ন ও ‘অসামাজিক’ করে দিয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা যেত। তাকে শুধু ‘কবি’ বলে ভাবানো যেত। কবি উপন্যাসে তেমন এক বয়ান হুমায়ূন আহমেদ তো দিয়েই রেখেছেন। কিন্তু হিমু কবির চেয়ে বড় কিছু। সে চেষ্টা করলে সেই নদীর কাছে মনে মনে চলে যেতে পারে, অনেকক্ষণ কাটাতে পারে সেই অশ্রুপ্রবাহিত উপত্যকায়, তার হারানো মায়ের সংস্পর্শে। আরও আশ্চর্য হলো, হিমু সেই ‘ময়ূরাক্ষী’ নদীর কাছে মনে মনে নিয়ে যেতে পারে অন্য কাউকেও, যে কিনা দুঃখী। হিমু তার বিষাদে গড়া অপূর্ব ছবিটার আস্বাদন দিতে পারে অন্যকে। এই যে ভাব ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা, এখানেই কল্পনা থেকে আরও বড় হয়ে ওঠে হিমুর ‘ময়ূরাক্ষী’। এটা তার ভিশন—মানস ভ্রমণ।

পুরাকালের মহাপুরুষেরা কেউ সাপকে লাঠিতে পরিণত করতে পারতেন, কেউ অন্ধ চোখে দিতেন আলো, কেউ পাহাড়ের ওপর ঝোপের আগুনে দেখতে পেতেন ঈশ্বরকে। হিমু এসব কিছুই পারে না। সে কেবল ময়ূরাক্ষী নদী দিয়ে শান্ত করে আনতে পারে অসুখী আত্মাদের, দুঃখী মানুষদের এবং নিমেষেই সে হয়ে উঠতে পারে নিঃসহায়ের সহায়। তারপরও মহাপুরুষত্বের দাবিদার সে নয়। তার হাবভাবে কোনো আধ্যাত্মিক বা অলৌকিক ইশারা নেই। তার চরিত্র জাদু বা ক্যারিশমা ধর্মঘেঁষা নয়।

তাহলে হিমু কি কোনো ‘পবিত্র পাগল’? ডাক্তার আত্মীয় তাকে বলে ‘ইউ আর আ সিক ম্যান, ইউ আর আ সিক ম্যান’। (ময়ূরাক্ষী, ১৯৯০) রুশ সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ‘হোলি ম্যাডনেস’ বা দৈব পাগলের ধারণা আছে। সেখানে ‘হোলি ফুল’ নামের একধরনের আলাভোলা মানুষদের দেখা যায়। তারা মানুষের দুঃখ ভুলিয়ে দেয়, রোগ সারিয়ে দেয়। তাদের নিয়ে উপন্যাসও লেখা হয়ে আসছে। সেই পবিত্র পাগল এক বোকা লোক। হয়তো সে ঈশ্বরের সাধনা করে, তাকে দেখা যায় মানুষের দুঃখের সঙ্গী হতে, অন্যের কষ্ট নিজের দেহে বহন করতে।

আর হুমায়ূন আহমেদের হিমু তো বটেই এক হলুদ পাঞ্জাবি পরা ভবঘুরে। পবিত্র পাগলের মতো কিংবা ঢাকার মোহাম্মদপুরের প্রয়াত সাধুপুরুষ ‘হাঁটাবাবা’র মতো সে-ও কেবলই হাঁটে। তবে মোটেই বোকা সে নয়—তর্কে ওস্তাদ, যুক্তিতে পারঙ্গম। কিন্তু তার গন্তব্য যুক্তির অতীতে এক জগতের দিকে, যেখানে থাকবে মায়াবাস্তবের শাসন। তার বুকের মধ্যে বয়ে চলে এক নদী—ময়ূরাক্ষী। এই নদীতে সে নিজে অবগাহন করে, চাইলে অন্য কোনো দুঃখী-তাপী লোককেও সে দেখাতে পারে সেই নদী। যে দেখে, সে বদলে যায়, তার দুঃখ-তাপের নিরসন হয়।

এখানেই হিমু হয়ে ওঠে ভ্রাম্যমাণ দরবেশদের মতে শুশ্রূষাকারী। ময়ূরাক্ষী নদী তার গায়েবি ভিশন, তার পোয়েটিক মাজেজা।

এই উপলব্ধি তাকে স্তব্ধ করে দেয়। নিজেকে আরও শক্তিমান হিসেবে ঘোষণার বদলে সে অন্তরালে সঞ্চয় করতে থাকে তার শক্তিগুলো; যাতে আরও দুঃখ সে সইতে পারে, যাতে করে মানুষের দুঃখগুলো চুমুক দিয়ে নিতে পারে বুকের ভেতর। হতে পারে তাদের সহচর।

হিমু বাংলা সাহিত্যের ‘আউটসাইডার’ নায়কদের একজন। ভিন্ন রকম এক চরিত্র। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের অলীক মানুষ উপন্যাসের শফি বিশুদ্ধ রেবেল। জীবনের ট্রমা তাকে হিরোয়িক ও ট্র্যাজিক করেছে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। পরশুরামের মতো ক্ষত্রিয়নাশই তার ব্রত। শফি বীর কিন্তু কারও সহচর নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ এক উত্তরাধুনিক নায়ক, দেশ-জাতির মধ্যে বহিরাগত।

নবারুণ ভট্টাচার্যের ফ্যাতাড়ুরা শহুরে লুম্পেনদের মনের অসন্তোষ থেকে গড়ে নেওয়া সভ্যতাবিরোধী আউটল। আলবেয়ার কাম্যুর দ্য আউটসাইডার–এর নায়ক ‘মরসোঁ’ অস্তিত্ববাদী দ্বন্দ্বজর্জর অ্যান্টিহিরো। তারা কেউই ভিশনারি নয়। কিন্তু হিমু একই সঙ্গে বহিরাগত হয়েও অন্তর্গত। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সে মানুষের মন পড়তে পারে। তার মন শুধু অসন্তোষের ব্যাকরণে প্রণীত নয়, বরং তার অশান্ত হৃদয়ের কেন্দ্রে প্রবাহিত হচ্ছে এক শান্ত নদী।

যে মধ্যবিত্ত কোনো দিন ইতিহাস গড়বে না, কেবল একটু ভালো করে জীবনের আস্বাদন চায়, সামান্য আলোড়নে ভেসে যেতে চায়, অসাধারণ কিছুই ঘটে না যাদের জীবনে, মামুলি খুটখাটে ভরা তাদের কর্মকাণ্ড, নিজের ভেতরের দেব ও দানবকে অনায়াসেই নিস্তেজ করে রাখতে যে মধ্যবিত্ত পারঙ্গম, এই মৃদু মধ্যবিত্ত তরুণদেরও তো সীমার বাইরে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করতে পারে। বাস্তবতার ক্রুশে গাঁথা জীবনে যে দুঃখের রক্তপাত ঘটে চলে, হিমু সেখান থেকে উত্তরণের পথ দেখায়।

‘হোলি ফুল’ যাঁরা, তাঁরা মানুষকে সারিয়ে তুলতেন, সেই ক্ষমতা অর্জনে নিজেদের রিপু ও বাসনাকে শাসন করতেন। দেহকে কষ্টের পরীক্ষার মধ্যে নিয়ে যেতেন। হিমুও তা–ই করে না কি? ভালোবাসার কাঙাল সে ঠিকই, কিন্তু কখনোই ধরা দেবে না। শারীরিক কষ্টভোগ তার জন্য ভয়ের কিছু নয়।

মধ্যবিত্ত মনে হিমুর আদলে এমন আধ্যাত্মিক কিন্তু সেক্যুলার বীরের আকুতি জমতে পারে। হিমু এমন এক চরিত্র, যে সব সময় থাকে সীমার বাইরে, যে ‘মাসুদ রানার মতো বাঁধনে জড়ায় না, কিন্তু কাছে টানে’ ঠিকই। জীবনের কঠিন বেদনা থেকে পালানোর জন্য যার দরকার একটা ময়ূরাক্ষী নদী।

হিমু নিজে এই মধ্যবিত্তের নায়ক হয়ে নিজেই তাদের টেনে নিয়ে যায় সেই নদীর ধারে, মুসা নবী যেমন তাঁর অনুসারীদের নিয়ে গিয়েছিলেন নীল নদের পাড়ে। হিমু ঘুরে দাঁড়ায় না, হিমু কল্পনার ভেতর পালায়, হিমুর যদিও ‘চলে যায় বসন্তের দিন’। তবু মৃদু মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীদের কাছে হিমুই নায়ক ও সহচর।

হুমায়ূন আহমেদ সামাজিক বাস্তবের কাহিনির মধ্যে তাঁর জীবনদর্শনের পুরোটা পুরে দিতে পারেননি। যেহেতু তাঁর নায়ক-নায়িকারা সব মৃদু মানুষ; তারা সবাই নিয়মশাসিত নাগরিক। ফলে তাদের দিয়ে মহামানবীয় কিছু করানো কঠিন। এই অতৃপ্তি পূরণের একটা ‘ভিশন’ তাই তিনি আনলেন, যার নাম ‘ময়ূরাক্ষী নদী’। আর সেই ভিশনের ভিশনারি হিসেবে হিমু আর সাধারণ কেউ থাকতে পারে না, সে হয়ে ওঠে ট্র্যাজিক। কারণ, সে মানুষের আত্মার ভেতরের কালিমা দেখে ফেলেছে তার পিতার মধ্যে, শৈশবের নিষ্ঠুর ঘটনাবলির মধ্যে। এমনকি দেখে ফেলেছে নিজের অসহায়ত্বও। ট্র্যাজেডি ঘটে তখন, যখন মামুলি মানুষ দেখতে পায়, জীবন আসলে এই সামাজিক বাস্তবের মধ্যেই শেষ নয়। মানুষ তো অমৃতেরও সন্তান, সেই অমৃতপ্রবাহিতা নদীর রাখাল হয়ে ওঠে হিমু।

যে মধ্যবিত্ত জীবনের সাত পাকে বাঁধা পড়ে নিজেকে ক্রমেই ছোট করে ফেলছে, তাদের মনেই তো হিমুর মতো বাঁধনছেঁড়া দীনতামুক্ত তরুণের প্রতি আসক্তি জন্মে। যে আধুনিক জীবন রাংতার মতো এক পিঠে সোনালি আর অপর পিঠে সাদা, সেখানে মানুষের অবদমনই সত্য।

হিমু এই অবদমন থেকে মুক্তির দিশারি হয়ে আসে। অলৌকিকতাহীন এ পরিবেশে সে দেয় অলৌকিকতার স্বাদ। আবার সেই একই জীবন যখন যুক্তির খাটো ফিতায় মনের আলো-আঁধারি ও স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নকে আর মাপতে পারছে না, তখন তার ভেতরের অর্ধমানব, অর্ধপ্রেতকে বুঝতে মিসির আলিকে দরকার হয়। মনের জরা–জটিল অরণ্যে একা চলতে হয় আমাদের। সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে কে আমাদের হাত ধরে নেবে, কে বুঝিয়ে দেবে আমাদেরই মনের গহন সমস্যাগুলো? কোঠাঘরে বসে থাকা মিসির আলি সেখানে সহায়।

সামাজিক বাস্তবতার কারাগারে আটকা আর নৈতিকতার দেহবন্ধনী আঁটা মৃদু মানুষদেরও যে একটা ব্যাখ্যাতীত সত্তা আছে, সেটা দেখানোর জন্য হিমু ও মিসির আলিকে দরকার হয়েছিল হুমায়ূনের।

ওই নন্দিত নরক কিংবা শঙ্খনীল কারাগার থেকে বেরোনোর পরও যখন দেখা যায় কোথাও কেউ নেই, তখন ফিরে আসে নাগরিক জীবনের চাপা হাহাকার, অবদমনও। সে সময় মনোবিকারের প্রতিবেদন কে জানাবে? কে ডুব দেবে অবচেতনের গহিনে? তখন হিমু আর মিসির আলি আমাদের ভেতরের ফাঁপর আর গুমরের মানবিক বিহিতের দায়িত্ব নেয়। বাদবাকিটা অসম্ভব প্রতিভাধর এক রসরাজের খেলা, সাদা চোখে রঙিন কল্পনার ভেলা ভাসানোর লীলা।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন