‘বুকের জ্বালার’ কথায় মনে পড়ল; কিছুদিন ধরে একটি পুরোনো পেপার কাটিং ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় যেদিন যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে, সেদিন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ হরতাল ডেকেছিল। একটি সেতুর নির্মাণ ব্যয়, দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো, প্রতিটি ধাপে মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্ন তোলা এক বিষয় আর সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন হরতাল ডাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি বিষয়। একটি করা হয় সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আর অন্যটি ঈর্ষা, বিদ্বেষ আর বুকের জ্বালার এক অপূর্ব নিদর্শন। অবশ্য ঈর্ষা ও বিদ্বেষের এই নজিরের পরও ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই ফিতা কেটে সেই সেতু উদ্বোধন করতে আওয়ামী লীগ এতটুকু লজ্জিত হয়নি।

ফিরে আসি পদ্মা সেতুর কথায়। ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর’ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট। সে সময় ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করা হয়। পরে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটি দেশের টাকায় বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং দফায় দফায় এর মেয়াদ বাড়িয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যায় প্রকল্পের ব্যয়কে।

আমাদের মতো দেশে প্রতি কিলোমিটার শুধু সড়কসেতুর ব্যয় ৫০০ কোটি আর রেলসেতুসহ সেটা ৭০০ কোটি হতে পারে। তবে নদীর জটিল ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় এটা সর্বোচ্চ দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ রেলসেতুসহ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটারে খরচ হতে পারে। অথচ ছয় কিলোমিটারের সামান্য বেশি এই সেতুর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি, পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

আমাদের সঙ্গে তুলনীয় ভারত, চীন, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের মতো দেশে প্রতি কিলোমিটার সেতু তৈরিতে খরচ পড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা। বণিক বার্তায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায়, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক শামসুল হকের মতে, আমাদের মতো দেশে প্রতি কিলোমিটার শুধু সড়কসেতুর ব্যয় ৫০০ কোটি আর রেলসেতুসহ সেটা ৭০০ কোটি হতে পারে। তবে নদীর জটিল ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা সর্বোচ্চ দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ রেলসেতুসহ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটারে খরচ হতে পারে। অথচ ছয় কিলোমিটারের সামান্য বেশি এই সেতুর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি, পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ঘরের পাশে ভারতে সাড়ে নয় কিলোমিটারের ভূপেন হাজারিকা সেতু তৈরি হয়েছে সাড়ে ১১০০ কোটি রুপিতে। অর্থাৎ একটি পদ্মা সেতুর টাকায় ৩০টি ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণ সম্ভব। আরেকটি উদাহরণ দিই। ভারতেই কাচ্চি দরগা থেকে বিদুপুর পর্যন্ত গঙ্গা নদীর ওপরে সেতুর কাজ শেষ হবে ২০২৩ সালে। পৌনে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৬ লেনের এই সেতুর ব্যয় ৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ে ভারতে এমন ১০টি সেতু নির্মাণ সম্ভব। জবাবদিহিহীন লুটপাট আর কাকে বলে!

এই সেতু নিয়ে সরকারের সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা হলো নিজের টাকায় তৈরি হচ্ছে পদ্মা সেতু। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ঋণের টাকায় কোনো কিছু তৈরি করা মানে কি নিজের টাকায় তৈরি করা নয়? ঋণের টাকা তো দেশকেই পরিশোধ করতে হয় এবং একটা দেশকে ঋণ দেওয়া হয় সেই ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা দেখেই।

সত্যি বলতে কি, ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করাটাই দেশের স্বার্থের অনুকূল। ধীরে ধীরে আর্থিক দায় শোধ করা যায়। এর মধ্যে সেতু থেকেও আয় শুরু হয়। সম্পন্ন প্রকল্পটি অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করার পর তার দায় শোধ করাটা যে দেশের জন্য মঙ্গলজনক, সেটা বোঝে না কে? আমাদের চেয়ে অনেক ধনী দেশও বৈদেশিক ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ঠিক এ কারণেই।

পদ্মা সেতুর মতো এত বড় একটি প্রকল্পের জন্য দেশের পক্ষে অনুকূল ও লাভজনক শর্তে ঋণ না পাওয়া সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা বলেই বিশ্বাস করি আমি। কিংবা হতে পারে সরকার সেটার খোঁজে ইচ্ছা করেই আর যায়নি। সম্পূর্ণ নিজের অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু তৈরি করার এক বড় ঝুঁকি সরকার সম্ভবত নিয়েছে ভেবেচিন্তেই। বিশ্বব্যাংক বা আর কোনো স্বনামধন্য, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান যদি এ প্রকল্পে যুক্ত থাকত, তাহলে সেতুর ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি তৈরি হতো। ইচ্ছেমতো দুর্নীতি করার জন্যই সরকার সম্ভবত এই জবাবদিহিহীনতা চেয়েছিল।

শুরুতে যখন পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তখন এতে রেলের পরিকল্পনা করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকার এতে রেল প্রকল্প যুক্ত করে। এতে খরচও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সর্বশেষ তথ্যমতে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত সরকারের খরচ হচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৬৭ কোটি ডলার বা ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে এক্সিম ব্যাংক অব চায়না। ৬ বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে ২০২৫ সালে। সুদসহ প্রতিবছর গড়ে সাড়ে ১৩ কোটি ডলার বা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছিল পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে এর সংযোগ। কিন্তু সরকার অনেক টাকা ব্যয় করার পর পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকেই সরে এসেছে। এতে পদ্মা রেলে কনটেইনার পরিবহনের যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, সেটা আর হচ্ছে না।

সরকার যখন বারবার বলে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করছি, তখন মনে হয় যেন আওয়ামী লীগের দলীয় টাকায় পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। অথচ এই সেতুর প্রতিটি ইঞ্চি তৈরি হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। সেই টাকার যখন ‘হরিলুট’ হয়, তখন তো বুকে জ্বালা হওয়াই স্বাভাবিক, নয় কি?

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলামসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ লাভজনক প্রকল্প নয়—এটা থেকে যতটা আয় হবে, সে তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ হবে অনেক বেশি। অর্থাৎ পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প দেশের জন্য এক বড় ঝুঁকি তৈরি করতে যাচ্ছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পটির সঙ্গে আনুষঙ্গিক প্রতিটি প্রকল্প বাংলাদেশের দুর্নীতির এক জাজ্বল্যমান প্রদর্শনী। ঢাকা থেকে যে মহাসড়ক ধরে পদ্মা সেতুতে যাওয়া হয়, সেই ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা সড়ক পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়কই নয়, এর ব্যয় ইউরোপ-আমেরিকার সড়ক নির্মাণের কয়েক গুণ। বর্তমান সরকারের সময়ের আর সব প্রকল্পের মতোই ধাপে ধাপে ব্যয় বাড়িয়ে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার সড়কটি তৈরি হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকায়। প্রতি কিলোমিটারে ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা সড়কটির সামনে ইউরোপ-আমেরিকায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকায় চার লেনের মহাসড়ক তৈরির তথ্যকে অবাস্তব মনে হতেই পারে। কিন্তু এই নানা অবাস্তব–অসম্ভব ব্যয়ের সম্মেলনেই তৈরি হয়েছে পদ্মা সেতু। সেতু নির্মাণ, রেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে পৌঁছানোর ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক—সবই নির্মিত হয়েছে অবিশ্বাস্য বেশি খরচে। প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ হয়েছে স্বাভাবিকের কয়েক গুণ।

তবে যতই অস্বাভাবিক ব্যয় হোক না কেন, সেটি নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তোলার জো নেই। কিছুদিন আগেই টিকটক ভিডিও বানিয়ে পদ্মা সেতু নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাও হয়েছে। সে নাকি দীর্ঘদিন ধরে সেতুর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অপপ্রচারমূলক ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল। ওই তরুণ পদ্মা সেতুর নদীশাসন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের কাজ করতেন।

এ দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অবস্থা আমরা সবাই কমবেশি জানি। কথায় কথায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা, গ্রেপ্তার এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। তারপরও পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের এই অতি সংবেদনশীলতাই প্রমাণ করে, অস্বাভাবিক ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু নিয়ে সরকার খুব স্বস্তিতে নেই। সরকার যখন বারবার বলে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করছি, তখন মনে হয় যেন আওয়ামী লীগের দলীয় টাকায় পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। অথচ এই সেতুর প্রতিটি ইঞ্চি তৈরি হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। সেই টাকার যখন ‘হরিলুট’ হয়, তখন তো বুকে জ্বালা হওয়াই স্বাভাবিক, নয় কি?

  • রুমিন ফারহানা বিএনপির সংসদ সদস্য ও হুইপ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী