চিকিৎসকেরা গবেষণা করলেন। শেষে কারণ বের করলেন, এই কিডনি ইউরোপের মানুষের। আপনার কিডনি বাংলাদেশের। ছোটবেলা থেকে খেয়েছেন ভাত-মাছ, শাকসবজি। ইউরোপের কিডনি সামলেছে রুটি, মাখন, আঙুর কিংবা আঙুরের রস। লাল রস। সাদা রস। কাজেই আপনার শরীরের সঙ্গে তা খাপ খাওয়াতে পারছে না।

একসময় বলা হলো রোগীকে, আপনি আর সাত দিন বাঁচবেন।

এরপর বলা হলো, আপনি আর এক ঘণ্টা বাঁচবেন। লিটন হায়দারের হাত ধরে সেই মরণাপন্ন বাঙালি বললেন, ‘আমার জমানো টাকা মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন।’ রোগী ফোন করলেন দেশে। মায়ের কাছে। তখন মুঠোফোন ছিল না। ল্যান্ডফোন। ‘মা, আমার আয়ু আছে আর এক ঘণ্টা। ডাক্তার বলে দিয়েছেন।’

আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে নজর দিয়েছি। জ্বালানি খাতে নজরটা সঠিক হয়নি। আমাদের গ্যাস অনুসন্ধানে আত্মশক্তিতে আস্থা রাখতে হতো। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করতে পারলে নিজের শক্তিতে তেল-গ্যাস অন্বেষণ করব না কেন? এই না আমরা শুনলাম, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। আমাদের আমেরিকানরা চাপ বা পরামর্শ দিল গ্যাস রপ্তানি করতে। শেখ হাসিনাই তো বললেন, ‘না, গ্যাস রপ্তানি করব না। আগে নিজেদের জন্য রিজার্ভ রাখব।’

মা বললেন, ‘রাখ তোর ডাক্তার। আল্লাহ জানেন তোর আয়ু আছে কত দিন। আমি আল্লাহর কাছে তোকে চেয়ে রেখেছি। তুই বেঁচে উঠবি।’

কিডনি কাজ করতে শুরু করল। সেই রোগী এখনো বেঁচে আছেন। ল্যান্ডফোনের যুগ থেকে স্মার্টফোনের যুগেও তিনি সহিসালামতে আছেন।

তবে কথা কিন্তু একটা আছে। আমাদের পেটেরও একটা অভ্যাস আছে। হঠাৎ করে বেশি খেলে তা বিগড়াতে পারেই। ছাত্রজীবনে বুয়েটের ক্লিনিকে একবার চিকিৎসক আমাকে বলেছিলেন, ‘নানান কিছু খেয়ে পেটটাকে তো কসমোপলিটন বানিয়ে ফেলেছেন।’

কোরবানির ঈদে আমাদের পেট কসমোপলিটন হয়ে যায়। বেশি থাকে মাংস। তারপর পোলাও, নানা রকম মিষ্টান্ন, সেমাই, পরোটা, লুচি, চালের আটার রুটি... কত সইবে। পেটে খেলে পিঠে সয়, কিন্তু বেশি খেলে পেটে সয় না।

তবে আপনি যদি সত্যি সত্যি চান, আপনার পেটের খাবার হজম হোক, এই ছয়টা প্রশ্ন নিয়ে একটু ভাবুন। অন্তত কর্তাদের কাছে এই ছয়টা প্রশ্নের উত্তর চাই।

১. কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পঞ্চগড়ের ট্রেন কখন ছাড়বে, এটা কেন আগে থেকে বলা হলো না? আগের রাতে স্টেশনে গেছেন যাত্রীরা। রাতে ট্রেন ছাড়বে। সেই ট্রেন পরের দিন সকালেও কমলাপুরে আসেনি। যাত্রীরা বলছেন, ‘ট্রেন কখন ছাড়বে, এটা আমাদের জানানো হচ্ছে না।’ এটা কেন হবে? মুঠোফোনের এই যুগে কি আগে থেকে বলে দেওয়া সম্ভব নয়, ট্রেন কখন আসবে, কখন ছাড়বে? এটা যাত্রীদের বলে দিলে কী হয়? যাত্রীদের যদি বলে দেওয়া হতো, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস রাতে ছাড়বে না, সকালে বা দুপুরে ছাড়বে, যাত্রীরা সে অনুযায়ী আসতে পারতেন। এতটুকুন উদ্যোগ নিতে কী অসুবিধা? হ্যালো, রেলমন্ত্রী, শুনতে পাচ্ছেন কি?

২. হ্যালো, যোগাযোগমন্ত্রী। হ্যালো সড়ক বিভাগ। ঈদুল ফিতরে যদি বঙ্গবন্ধু সেতুগামী যানবাহন ঠিকঠাক চলতে পারে, যানজট কমানো গিয়ে থাকে, ঈদুল আজহায় গেল না কেন? ঈদুল ফিতরের শিক্ষা কি ঈদুল আজহায় কাজ করে না?

৩. প্রথম আলোয় গওহার নঈম ওয়ারা লিখেছেন, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই কষ্ট করে পয়সা খরচ করে এমন জিনিস নিয়ে যাচ্ছেন, যা বন্যার্ত মানুষের দরকার নেই। হয়তো শুকনা রুটি নিয়ে যাচ্ছেন। এটা আর লাগবে না। আমার প্রস্তাব হলো, মুঠোফোনে টাকা পাঠান। আমার শিক্ষক জামিলুর রেজা চৌধুরী ২০২০ সালে এপ্রিলে তাঁর প্রয়াণের আগে আমাকে শেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তাতে তিনি সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, করোনায় ঘরে বসে থাকা গরিব মানুষকে মুঠোফোনে টাকা পাঠান। সরকার টাকা পাঠিয়েওছে দুই দফা। আমার প্রস্তাব: বন্যার্ত মানুষের মুঠোফোনে টাকা পাঠান। এই প্রস্তাব সরকারের কাছে, এই প্রস্তাব সাহায্যকারী নাগরিকদের কাছেও। বিকাশ বা নগদ বা রকেটের মাধ্যমে সাহায্য পাঠান। নগদ টাকা হাতে থাকলে একজন বন্যার্ত মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা দিয়ে তিনি ঘর সারবেন নাকি খাবার কিনবেন। আর প্রবাসী বাঙালিদের অনুরোধ, বৈধ চ্যানেলে আপনার পরিবারের কাছে ১০০ ডলার হলেও পাঠান। এক কোটি প্রবাসী প্রত্যেকে ১০০ ডলার করে পাঠালে দেশে একশ কোটি ডলার আসবে। ১০ হাজার কোটি টাকা। আমাদের পদ্মা সেতুর মূল সেতুর খরচের সমান। আমার এই প্রস্তাব আমরা ভেবে দেখব কি? প্রবাসী ভাইবোনেরা, দেশে বৈধ চ্যানেলে ডলার পাঠাব কি?

৪. আমরা উন্নত হচ্ছি। ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা, সাইক্লোন, যুদ্ধ, খরা পেরিয়ে আমরা বেঁচে থাকব। শুধু তা–ই নয়, ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হব। তাহলে আমরা কি আচার-আচরণে উন্নত হব না? বাংলাদেশ আর পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর কোথাও শহরের রাস্তায় কেউ পশু কোরবানি দেয় না। মালয়েশিয়ায়ও না। সৌদি আরবে না। আরব আমিরাতে না। আমেরিকা, কানাডায় তো প্রশ্নই আসে না। আমরা কি ধীরে ধীরে কোরবানি দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বানিয়ে নিতে পারব না? আমাদের রাজপথে, গলিতেই কোরবানি দিতে হবে? ২০৪১ সালেও?

৫. একবার লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে দামি হোটেলে থেকেছিলাম আমেরিকান সরকারের পয়সায়। বিকেল পাঁচটার পর দেখি, কোনো শপিং মল খোলা থাকে না। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে সন্ধ্যার পর জামা-জুতা-গেজেট-মেকাপের মার্কেট খোলা থাকে না। তবে জরুরি পণ্যের দোকান কোনো কোনোটা আবার ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে, যেমন ওষুধের দোকান বা নিত্যপণ্যের দোকান। আমাদের দেশে বেলা ১১টায় ঢাকার নিউমার্কেটে গিয়ে দেখবেন, দোকানি আসেননি। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে দোকানের সামনে। অথচ সূর্য ওঠে ভোর ৫টা ১৮ মিনিটে। বাংলার কৃষক কিন্তু ঠিকই ফজরের ওয়াক্তে উঠে সকাল সকাল মাঠে চলে যান। আমরা কেন রাতে মার্কেট খোলা রাখব? মাগরিবের পর মার্কেট বন্ধ করে দিন। সূর্যের আলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। কাঁচাবাজার সন্ধ্যার পরও খোলা থাকতে পারে।

৬. আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে নজর দিয়েছি। জ্বালানি খাতে নজরটা সঠিক হয়নি। আমাদের গ্যাস অনুসন্ধানে আত্মশক্তিতে আস্থা রাখতে হতো। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করতে পারলে নিজের শক্তিতে তেল-গ্যাস অন্বেষণ করব না কেন? এই না আমরা শুনলাম, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। আমাদের আমেরিকানরা চাপ বা পরামর্শ দিল গ্যাস রপ্তানি করতে। শেখ হাসিনাই তো বললেন, ‘না, গ্যাস রপ্তানি করব না। আগে নিজেদের জন্য রিজার্ভ রাখব।’ আমাদের গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগী হওয়া উচিত। বাপেক্সকে ক্ষমতায়িত করা উচিত। সুসজ্জিত করে উৎসাহ জোগানো উচিত।

এই ছয়টা বিষয় ভাবতে থাকুন। পেটের খাবার হজম হতে সাহায্য করবে। ঈদ মোবারক।

আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন