রাশিয়ার আগ্রাসনের বিপরীতে ইউক্রেন যে শক্ত প্রতিরক্ষা প্রদর্শন করেছে, সেটা নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো ও পশ্চিমা অন্য মিত্ররা রাশিয়ার ওপর আর্থিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে। তারা ইউক্রেনকে নানাভাবে সহযোগিতাও করছে। কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির একটা বিপজ্জনক চক্রের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে। পরিস্থিতি এখন যা দাঁড়িয়েছে, তাতে রাশিয়ার আগ্রাসনকে যাতে সত্যি সত্যি বাধা দেওয়া যায়, তেমন কিছু করতে হবে। তবে সেটা অবশ্যই গতানুগতিক পারমাণবিক যুদ্ধ নয়।

রাশিয়াকে বাধা দেওয়ার জন্য পারমাণবিক যুদ্ধ বিকল্প নয়। যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা ব্যবসাক্ষেত্র হোক, অন্য সব ধরনের অস্ত্রই এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। অবশ্য এর অনেকগুলোই এখন প্রয়োগ হচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে বড় ‘অস্ত্র’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত, কিন্তু সেই ‘অস্ত্র’ প্রয়োগের সম্ভাবনা স্পষ্টত ব্যর্থ হয়েছে।

ইউক্রেনের সীমানায় সৈন্য মোতায়েন করে রাশিয়া ইউক্রেন ও পশ্চিমকে প্রথম সতর্কবার্তা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের অন্য সঙ্গীরা রাশিয়ার সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করে ক্রেমলিনকে স্পষ্টত বার্তা দিয়েছিল যে তারা সবকিছুই দেখছে। এই বার্তা ছিল পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে রাশিয়াকে সতর্ক করার প্রথম প্রচেষ্টা।

ইউক্রেনের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধব্যবস্থা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধক্ষেত্র আর বাণিজ্য অবরোধের বাইরেও যুদ্ধের মূল লড়াকু শক্তি হলো সাধারণ জনগণ। যুদ্ধের জয়–পরাজয় তাঁরাই নির্ধারণ করেন। ইউক্রেনীয়রা শুধু নিজেদের জীবন ও বাড়িঘর রক্ষা করছে না, আদর্শ দিয়ে তারা রাশিয়ার নেতৃত্বকেও পিছু হটতে বাধ্য করছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের জনগণ রাশিয়ার অনেক সেনাকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখছে, সে বিষয়েও শক্ত প্রমাণ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কেউ কেউ এখন মনে করছে যে রাশিয়া এখন ইউক্রেনে পূর্ণ আগ্রাসন শুরু করবে অথবা ন্যাটো ও অন্যান্য নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও বড় হুমকি সৃষ্টি করবে। হ্যাঁ, রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ শুরু করতে পারে। ক্রেমলিন পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি তৈরি করতে পারে এবং নতুন করে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালাতে পারে।

একইভাবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ এবং অন্য পশ্চিমা নেতারা কেন ইউক্রেনকে সমর্থন করছেন—সেই উদ্দেশ্যটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না–ও করতে পারেন। এসব নেতার বক্তব্য ক্রেমলিন শুনেছে। একই সঙ্গে জো বাইডেনসহ আরও কয়েকজন নেতা যে বলেছেন, ন্যাটোভুক্ত নয়, এমন দেশকে রক্ষায় তাঁরা সৈন্য পাঠাবেন না, সেটাও শুনেছেন। প্রকৃতপক্ষে, রাশিয়ার আগ্রাসনের সুযোগ ও তীব্রতা পশ্চিমারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে—সেটার ওপরেই নির্ভর করে।

পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিনিধি ইউক্রেন, দেশটি নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পশ্চিমা বিশ্বের মতো করেই তৈরি করেছে। ২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেনের সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও রাশিয়া ইউক্রেনীয়দের সংহতি এবং সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম হয়নি।

ইউক্রেনের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধব্যবস্থা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধক্ষেত্র আর বাণিজ্য অবরোধের বাইরেও যুদ্ধের মূল লড়াকু শক্তি হলো সাধারণ জনগণ। যুদ্ধের জয়–পরাজয় তাঁরাই নির্ধারণ করেন। ইউক্রেনীয়রা শুধু নিজেদের জীবন ও বাড়িঘর রক্ষা করছে না, আদর্শ দিয়ে তারা রাশিয়ার নেতৃত্বকেও পিছু হটতে বাধ্য করছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের জনগণ রাশিয়ার অনেক সেনাকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখছে, সে বিষয়েও শক্ত প্রমাণ রয়েছে।

রাশিয়াকে নিবৃত্ত করাটাই এখন পশ্চিমাদের জন্য প্রাথমিক কৌশলগত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সেটা হতে হবে আরও সমন্বিত। এতে এমন সবকিছু যুক্ত করতে হবে যেগুলো সত্যি সত্যি রাশিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লয়েড অস্টিন ঘোষণা করেছেন, তাঁরা রাশিয়াকে এমন দুর্বল দেখতে চান, যাতে তারা আর ইউক্রেনের মতো আগ্রাসনের ঘটনা আর না ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বিল পাস করেছে।

কিন্তু এটাই যথেষ্ট পদক্ষেপ নয়। রাশিয়াকে বাধা দেওয়ার জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে যেমন জনপ্রিয় উদ্দেশ্য থাকতে হবে, আবার সেগুলোতে জনসমর্থনও থাকতে হবে। অন্য দেশগুলোর সমর্থনও এ ক্ষেত্রে থাকতে হবে। কেননা, ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এ ধরনের নজির স্থাপন করেছেন। তিনি শুধু ইউক্রেনের জনগণকে পথ দেখাননি, পশ্চিমা বিশ্বকেও পথ বাতলে দিয়েছেন। অন্য নেতাদের তাঁকে অনুসরণ করা উচিত।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

রুপার্ট স্মিথ ইউরোপে ন্যাটোর সাবেক কমান্ডার

এলানা বেট-এল সমরবিদ ও ঐতিহাসিক