গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকটি ১৯৭৯ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিল। কিন্তু পারস্পরিক আস্থা তৈরির পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের আগেই সামরিক সংঘাত কূটনীতিকে আবারও পেছনে ঠেলে দেয়।
গত দুই সপ্তাহে দুই দেশের এই প্রত্যক্ষ সংঘাত হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। তদুপরি, এই সামরিক লড়াই এখন দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে রূপ নিচ্ছে এক আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই কৌশলী অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে তারা এখন আর দ্রুত সামরিক বিজয়ের পথে হাঁটছে না। বরং তারা বেছে নিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’। এর উদ্দেশ্য হলো কূটনৈতিক চাপে রেখে ও ধীরে ধীরে আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, রসদ সরবরাহ, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি দুর্বল করে ফেলা।
এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া যায়। মার্কিন নীতি এখন পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সেখানে তারা চাপ বজায় রাখা, সমুদ্রপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব বাহিনীকে সুরক্ষার ওপর নজর দিচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা ইসরায়েলকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিচ্ছে।
পরিবর্তিত কৌশল
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের খার্গ দ্বীপ ‘দখলে নেওয়া’র যে হুমকি দিয়েছেন এবং মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীদের দ্বারা কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সীমান্ত হামলায় মদদ দেওয়ার যে খবর বেরিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে। তাদের ভাবনায় স্পষ্টতই রয়েছে সাধারণ সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া।
জবাবে ইরানও একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বাত্মক প্রতিরক্ষার কৌশল নিয়েছে। মার্কিন বাহিনীকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে মার্কিনদের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান। যেমন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মানদেবে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে। সোমবার তো তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সরাসরি নৌ অবরোধের ঘোষণাই দিয়ে বসেছে।
উত্তেজনা বাড়ার পর ইরান দাবি করেছে যে তারা কুয়েত, ওমান, সিরিয়া, জর্ডান, বাহরাইন ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহে সিরিয়ার আল-তানফ এলাকায় একটি মার্কিন কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছে তারা।
ইরানি কৌশলের মূল দিকটি হলো যুদ্ধের ব্যয় ও ক্ষতি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া। তারা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি ও সুবিধা দেওয়া দেশগুলো এই যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রেহাই পাবে না। সেনা সূত্রের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকলে ‘যুদ্ধ নতুন নতুন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়বে’।
কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ইসরায়েল-ইরানের যুদ্ধ আজ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। সংঘাতটি এক স্থবির ও দীর্ঘায়িত ক্ষয়ের যুদ্ধে আটকে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লাভ নেই, টেকসই সমাধান কেবল কূটনীতিতেই সম্ভব।
ভ্যান্সের সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছিল এটিই যে ইসরায়েল সরকারের কিছু অংশ মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক আলোচনা নস্যাৎ করতে চেয়েছিল। তারা সামরিক অভিযানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত করতে চায় এবং সেই লক্ষ্যে জনমতকে আলোচনার বিপক্ষে নেওয়ার জন্য একটি বড় তহবিলও খাটাচ্ছে।
ভ্যান্স জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের উচিত বিদেশি চাপ বাদ দিয়ে নিজেদের দেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। তাঁর মতে, টেকসই শান্তির জন্য দুটি বিষয় জরুরি—হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা।
সমাধানের মূল পথ
প্রথমত, একটি নতুন আঞ্চলিক সামুদ্রিক চুক্তিতে এটি স্বীকার করে নিতে হবে যে হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত বা নিজস্ব জলসীমায় অবস্থিত। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে এই দুই দেশকেই। একই সঙ্গে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বৃহত্তর চুক্তি থাকবে, যা সব জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করবে।
নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলে সহায়তা দেওয়ার জন্য ইরান ও ওমান যুক্তিসংগত সার্ভিস ফি বা সেবা মাশুল পেতে পারে, তবে এই সেবা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা যাবে না। এই চুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সামাজিকভাবে বাধ্যতামূলক করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি বা এনপিটির ভিত্তিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উচিত একটি স্থায়ী দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক চুক্তি করা। এই চুক্তির অধীনে ইরান চিরতরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ ত্যাগ করবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তা সার্বক্ষণিক তদারকি করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে পারমাণবিক–সংক্রান্ত সব নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে তুলে নেবে এবং শান্তির কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইরানের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে।
২০১৫ সালের ‘জেসিপিওএ’ পরমাণু চুক্তির মতো ভঙ্গুর না করে, এই নতুন চুক্তিটিকে মার্কিন কংগ্রেস এবং ইরানের পার্লামেন্ট—উভয় স্থান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পাস বা অনুমোদন করাতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষই সামরিক শক্তি দিয়ে অপর পক্ষকে নতি স্বীকার করাতে পারবে না। আসল পছন্দটি হলো: হয় চিরস্থায়ী যুদ্ধ, না হয় টেকসই কূটনীতি।
কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আবার গতিশীল করতে এবং হরমুজ প্রণালি ও পরমাণু ইস্যুতে চুক্তি চূড়ান্ত করতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উচিত সরাসরি আলোচনা শুরু করা। যেকোনো সমঝোতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বৈধ ভিত্তি হলো দুই দেশের জনগণের স্বাধীন মতামত। জনমত জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ আমেরিকানরা এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধী এবং এটি এখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও বেশি অপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ইরানিরা চায়—‘স্থায়ী সংঘাত ছাড়া নিরাপত্তা, বিপ্লব ছাড়া সংস্কার, বিচ্ছিন্নতা ছাড়া সার্বভৌমত্ব এবং আত্মসমর্পণ ছাড়া কূটনীতি’।
সৈয়দ হোসেন মুসাভিয়ান প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির গবেষক। মিডলইস্ট আই থেকে অনূদিত।