আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণ
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে বাংলাদেশের ভাবনার কারণ কী
ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্য। এই দুটি রাজ্যের ভোটের ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশের ভাবনার কারণ কী, সে বিষয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ
সীমানাপ্রাচীর ঘুষপেটিয়া প্রচারণা থামায়নি
আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সীমান্ত ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার। উভয় এলাকায় নয়াদিল্লির সরকার অনেকখানিই কাঁটাতার বসিয়েছে। কেবল প্রাচীর নয়, সঙ্গে পুরো সীমান্তের তিন হাজার কিলোমিটারে শক্তিশালী ফ্লাডলাইটও সংযুক্ত হয়েছে। এসবের পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ১০০ নিরাপত্তা চৌকির নজরদারি তো আছেই।
ফ্লাডলাইট, সীমানাপ্রাচীর এবং অতি ঘন ঘন চৌকি থাকায় এসব সীমান্ত দিয়ে ‘অবৈধ’ চলাচল সামান্যই ঘটে এখন। তারপরও আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে ‘ঘুষপেটিয়া’ (অবৈধ অনুপ্রবেশকারী) বিরোধী প্রচারণা বন্ধ হয়েছে, এমন বলা যায় না।
তবে রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে এটা বেশ আবেদনময় হলেও পুরোনো ধাঁচের ঘুষপেটিয়া প্রচারণায় নতুনত্ব না থাকায় ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী এবার এসব রাজ্যে নতুন কৌশল নিয়েছে। উভয় কৌশলই কার্যত এত দিনকার অবৈধ-অনুপ্রবেশ তত্ত্বেরই একধরনের সম্প্রসারণ এবং তাতে বাংলাদেশের জন্য মোটাদাগে ঝুঁকির দিক রয়েছে।
মুসলমানদের রাজনৈতিক শক্তি কমাতে যা হলো আসামে
ভারতের যেসব রাজ্যে মুসলমানরা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য তার দুটি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। আসামে তারা ৩৪ শতাংশের মতো, পশ্চিমবঙ্গে ২৭-২৮ শতাংশ। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তিতে সংখ্যাগুরুর চেয়ে সব অর্থে পিছিয়ে থাকলেও উভয় রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন এলে এই সংখ্যালঘুরা ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে আলোচিত হয়ে ওঠে।
আসামে বিধানসভার আসন ১২৬। ৩৫টি আসনে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। যদিও তারা নানান দলের সমর্থক, কিন্তু এই ৩৫টি আসনে এবং আরও কিছু আসনে এই সংখ্যালঘুরা জয়-পরাজয়ে গুরুত্ব ভূমিকা রাখত। এই মুসলমানদের ‘ঘুষপেটিয়া’ দেখিয়ে এবং বাংলাদেশভীতিকে রাজনৈতিক পণ্য করে বহু আগেই বিজেপি আসামে ক্ষমতাসীন হয়ে আছে। ২০১১ সালে এই রাজ্যে তাদের আসন ছিল ৫, এখন ৬০!
এ রকম অগ্রগতির মধ্যেও এবার ক্ষমতাসীন শক্তি বিধানসভায় মুসলমান উপস্থিতি আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে এবং সেই সূত্রে ভোটের আসনগত বিন্যাস এমনভাবে পাল্টে নিয়েছে, যাতে সেখানে মুসলমান ভোটার প্রধান আসন কমে গেল ২০-এ।
অনেক মুসলমানপ্রধান আসন থেকে কিছু কিছু অংশ কেটে নিয়ে সেটা চার দিকের হিন্দুপ্রধান আসনগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সেই জায়গায় হিন্দুপ্রধান অঞ্চলের কিছু কিছু এলাকা জুড়ে দেওয়া হয়েছে মুসলমানপ্রধান আসনটিতে।
কেবল মুসলমানপ্রধান আসনগুলোর ভৌগোলিক পুনর্গঠন নয়, যেসব আসনে হিন্দু-মুসলমান ভোট প্রায় সমান সেগুলোকেও কেটেকুটে এভাবে পুনরায় গঠন করা হয়েছে। যাতে এসব আসনের মুসলমান ভোটব্যাংক আকারে কমে এবং বিজেপি বা যেকোনো দলের হিন্দুপ্রার্থীর জয় নিশ্চিত হয়।
যেখানে এসব করা যায়নি, সেখানে অনেক মুসলমানপ্রধান এলাকাকে একাধিক নির্বাচনী আসনের বদলে একটি আসন করে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও আবার মুসলমান প্রধান আসনগুলোকে শিডিউল কাস্ট ও শিডিউল ট্রাইবদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, কার্বি আংলং এবং বোডো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বিধানসভায় আসন বাড়ানো হয়েছে মুসলমানপ্রধান অঞ্চলের আসন কমিয়ে।
কাঠামোগত এসব বহুমুখী পরিবর্তন ও পদক্ষেপ, যা অনেকটা আধুনিককালের একধরনের নতুন ও সূক্ষ্ম বর্ণবাদী ব্যবস্থার মতো—সেটা কেবল সংখ্যালঘুদের টার্গেট করেই করা হয়নি; কংগ্রেস, বামপন্থী দলগুলো এবং মুসলমানপ্রধান দলগুলোকে জাতীয়ভাবে দুর্বল করতেও করা হয়েছে। সংখ্যালঘুরা মূলত এসব দলকে এখানে ভোট দিত এত দিন। এসব দলও মুসলমান ভোট উল্লেখযোগ্য আছে এমন আসনে অনেক সময় মুসলমান প্রার্থী দিত।
এখন অবস্থা এমন হয়েছে, বিরোধী দলগুলো আসনগত পুনর্বিন্যাসের কারণে মুসলমান প্রার্থী কম দিতে বাধ্য হয়েছে। ফল প্রভাবিত করতে নির্বাচনী ব্যবস্থার এ রকম (বৈধ!) সংস্কার আধুনিক বিশ্বে বিরল। মুসলমানদের দুটি স্তরে বিজেপি ক্ষমতাহীন করতে চায়, বিধানসভায় এবং রাজনৈতিক দলে।
আসামের এবারের এই ‘নিরীক্ষা’ সফল হলে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশসহ অন্যত্রও এ রকম আসনগত পুনর্বিন্যাস ঘটিয়ে জাতীয়ভাবে লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভাগুলোকে আরও সংখ্যালঘুমুক্ত করা হবে হয়তো। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি সেখানেও এ রকম নিরীক্ষা চালানো হয়।
যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে মুসলমান সংখ্যালঘুরা পিছিয়ে পড়া অবস্থায় আছে, সে কারণে রাজনৈতিক পরিসরে অসহায় হওয়ামাত্র তাদের সামাজিক শিকড় ছিঁড়তে শুরু করবে। তারা নিজেরাই তখন উদ্বাস্তুসম জীবন ছেড়ে মানবিক মর্যাদার কোন জনপদে পাড়ি জমাতে চাইবেন। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু বাংলাদেশ-সংলগ্ন এবং এই দুই জায়গার সংখ্যালঘুদের যেহেতু এদিকের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নৈকট্য রয়েছে, সে কারণে বিষয়টা ঢাকার জন্য উদ্বেগের।
আসামে যদিও ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি, তবে স্থানীয় অনেকের অনুমান, এবার সেখানকার বিধানসভায় ইতিহাসের সর্বনিম্ন মুসলমান প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে সুযোগ পাবেন এবং সেটা হতে পারে ২০-২২। অথচ অতীতে এই রাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদে মুসলমানদের প্রতিনিধি থাকত ৩০-এর মতো।
একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। তবে এই রাজ্যে নির্বাচন কমিশন ভিন্ন এবং অভিনব এক প্রকল্প নিয়ে বিজেপির স্বপ্ন পূরণ করিয়ে দিতে চাইছে।
অন্তত ৪০ লাখ ভোটার কেন্দ্রে যেতে পারছেন না
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার আসন ২৯৪। এই রাজ্যে তৃণমূল যদিও ১৫ বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, কিন্তু ভোট ও আসনের হিস্যায় বিজেপির উত্থান ঘটছে বিস্ময়কর গতিতে। ২০১১ সালে তাদের কোনো আসন ছিল না, ভোট ছিল ৪ শতাংশ। পরের নির্বাচনে ভোট দাঁড়াল ১০ ভাগে, আসন ৩। আর ২০২১ সালে আসন বাড়ল ৭৭ এবং ভোট পৌঁছাল ৩৮ শতাংশে। মাত্র দেড় দশকে এই অগ্রগতি।
গত নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ভোটের ব্যবধান ছিল ১০ শতাংশ (৩৮%-৪৮%) মাত্র। সুতরাং তৃণমূলের যদি ৫ শতাংশ ভোট কমানো যায়, তাহলেই বিজেপির বাকি লক্ষ্য পূরণ হতে পারে। সেটা কীভাবে সম্ভব?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে এসআইআর নিয়ে আসা হয়েছে। এসআইআর মানে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ।’ বাংলায় কথাটার অর্থ দাঁড়ায় ‘ভোটার হালনাগাদের বিশেষ প্রকল্প’।
ভোটার হালনাগাদ, নির্বাচন হয় এমন সব দেশে স্বাভাবিক ব্যাপার। সচরাচর এর লক্ষ্য থাকে ভোটার তালিকা থেকে মৃতদের, এলাকা ছেড়ে দূরে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের, দুবার নথিভুক্ত হয়েছে এমন ভোটারদের বাদ দেওয়া।
পশ্চিমবঙ্গেও এটা হয়েছে ২০০২ সালে। এবার সমস্যা বেধেছে ‘বিশেষ’ কথাটায়। বিশেষ ধরনের জন্যই এবার হালনাগাদকালে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসংগতি বলে এক বিষয় যুক্ত করে দেওয়া হয়। এর তাৎপর্য হলো যাদের নামধামে কোনো ‘অসংগতি’ পাওয়া যাবে তাঁদের বাদ দেওয়া হবে। এর বাইরেও নাগরিকত্বের পক্ষে নানান ধরনের কাগজপত্র সাক্ষ্য হিসেবে দিতে হবে। এ রকম ‘বিশেষ ধরনের’ হালনাগাদ প্রকল্পের শিকার হয়ে এবার পশ্চিমবঙ্গে গত ভোটার তালিকার ৯১ লাখ মানুষ বাদ পড়ে গেলেন। এই বাদ পড়াদের বড় অংশই মুসলমান এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। উভয়ে অমিত শাহর সে-ই ‘ঘুষপেটিয়া’ নামে ছুড়ে দেওয়া বানের পরোক্ষ শিকার যেন।
এনআরসিতে ২০১৯ সালে যে ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ে, তারা বড় অংশ ছিল বাংলাভাষী। ২০২৬ সালে এসআইআর এ পশ্চিমবঙ্গে যে ৪০ লাখ ভোটাধিকার হারাচ্ছে তারাও প্রায় সবাই বাংলাভাষী। এভাবে বাংলাদেশের সীমান্তের দুই দিকে কাগজপত্রে হলেও ৫৯ লাখ ‘ঘুষপেটিয়া’ তৈরি করতে পারল ভারতের শাসকগোষ্ঠী।
পশ্চিমবঙ্গে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান বলছে, উল্লিখিত ৯১ লাখের মধ্যে অন্তত ৪০ লাখ এমন ভোটার যাঁদের নাম বাদ পড়ার কারণ সামান্য কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি। তাঁরা হালনাগাদ প্রক্রিয়ার বৈধ চাতুরীর শিকার। এই ৪০ লাখের ৬৫ শতাংশই মুসলমান ভোটার বলে ভাষ্যকারেরা বলছেন। বাকিদের প্রায় ৩০ শতাংশ মতুয়া ভোটার।
বিজেপি জানত মমতার ‘ভোট জাদু’র একটা বড় ভিত্তি মুসলমান ভোটার। সমাজের নিচুতলার মুসলমানদের নামধামের নথিপত্রে কিছু কিছু অসংগতি থাকেই। যেমন, ‘এমডি হানিফ’ কোথাও কোথাও ‘মো. হানিফ’ নামেও নিজের নাম লিখেছে। ‘হনুফা বেগমে’র নাম বিয়ের পর ‘হনুফা বিবি’ও লেখা হতে পারে। ‘বেগম’ ও ‘বিবি’র এ রকম অসংগতি ধরেছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’! এভাবে বাদ পড়েছে তৃণমূলের ঘাঁটি অঞ্চলগুলোর মুসলমান ভোটব্যাংক।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, মুসলমানদের পাশাপাশি যে মতুয়ারা বাদ পড়লেন তাতে তো বিজেপিও ক্ষতিগ্রস্ত হলো! মতুয়াদের বড় একাংশ যে বিজেপির সমর্থক, সেটা সত্য। কিন্তু সেখানে তৃণমূলেরও ভোট আছে। মুসলমানদের কোণঠাসা করতে গিয়ে মতুয়ারাও যে বড় সংখ্যায় বাদ পড়ল, তার সংশোধন হিসেবে বিজেপি তাদের শিগগির নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করছে। মুসলমানদের বেলায় সেই আশ্বাসও নেই, সম্ভাবনাও নেই।
মতুয়াদের স্পষ্ট বলা হচ্ছে, ‘তোমাদের ভোট একবার মার যাবে, পরেরবার ঠিক করে দেব; আর মুসলমানদের তো চিরতরে বাদ দেব—কোনটা ভালো হবে, চিন্তা করে দেখো?’ বিজেপি মতুয়া নেতা শান্তনু ঠাকুরকে দিয়ে এ রকমই বলাচ্ছে। শান্তনু এও বলছেন, ‘৫০ লাখ রোহিঙ্গাকে তাড়াতে হলে যদি আমাদের এক বছর ভোট না দিয়ে থাকতে হয়, সেটাও লাভ।’ এভাবে পুরো নির্বাচনকে চূড়ান্ত এক জাতিগত ও ধর্মীয় মেরুকরণের অন্ধ গহ্বরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসআইআরের ‘যৌক্তিক অসংগতি’তে যে জেলায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ভোটাধিকার হারাল, সেটা মুর্শিদাবাদে, আর যে জায়গায় সবচেয়ে কম মানুষের কপাল পুড়ল, সেটা বিজেপির ঘাঁটি আলীপুর দুয়ারে। পুরো রাজ্যে এই মেরুকরণে এসআইআর কাজ করেছে।
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে কেন বিজেপির বিশেষ গুরুত্ব
ভারতের কেন্দ্রীয় লোকসভা ও জাতীয় রাজনীতির এখনকার যে অবস্থা তাতে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের বিধানসভা নির্বাচনে হারলেও গুরুতর কোনো সমস্যা নেই। জাতীয় নির্বাচন হতে অন্তত আরও তিন বছর বাকিও বটে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম বিজেপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্য এগুলো।
হিন্দুত্ববাদী তাত্ত্বিকেরা মনে করে, এই দুই রাজ্যে মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ‘নিরাপত্তাহুমকি’। এদের জোর করে তাড়ানোও ব্যাপক হইচইয়ের জন্ম দেবে। কিন্তু রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারহীনতা তাদের মধ্যে যে সামাজিক কোণঠাসা দশা এবং আর্থিক টানাপোড়েন তৈরি করবে, তাতে এই মানুষদের ক্রমে ক্রমে উদ্বাস্তু হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। সে রকম ঘটতে পারে মতুয়াদের বেলায়ও।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মতুয়া ভোট পেতে একদা গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি পর্যন্ত প্রচার চালিয়েছেন। এবার এসআইআরে নদীয়া ও চব্বিশ পরগনাজুড়ে লাখ লাখ মতুয়া যেভাবে নাগরিক মর্যাদা হারাচ্ছে, তাতে বিজেপির অতীত প্রতিশ্রুতি প্রতারণার মতোই ঠেকছে তাদের কাছে। নাগরিক অধিকারহীনতা স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বহু ধরনের সামাজিক অধিকারহীন করে ফেলে মানুষকে। আসামে নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসির মাধ্যমে যা ঘটেছিল, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের মাধ্যমে কার্যত তাই ঘটতে পারে।
এনআরসিতে ২০১৯ সালে যে ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ে, তারা বড় অংশ ছিল বাংলাভাষী। ২০২৬ সালে এসআইআর এ পশ্চিমবঙ্গে যে ৪০ লাখ ভোটাধিকার হারাচ্ছে তারাও প্রায় সবাই বাংলাভাষী। এভাবে বাংলাদেশের সীমান্তের দুই দিকে কাগজপত্রে হলেও ৫৯ লাখ ‘ঘুষপেটিয়া’ তৈরি করতে পারল ভারতের শাসকগোষ্ঠী।
ফলাফল যা-ই হোক, প্রতিক্রিয়া হবে একই রকম
আসামে এনআরসির পর বিজেপির ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়েছে। এবার নির্বাচনী আসনবিন্যাসের মাধ্যমে সেটা আরও পোক্ত হবে। ৪ মে তারই বিস্তারিত পাওয়া যাবে। পশ্চিমবঙ্গের হাড্ডাহাড্ডি প্রচারণার ফলাফলও মিলবে তখন।
পশ্চিমবঙ্গে যদি তৃণমূল ক্ষমতা হারায় সেটা বিজেপি-আরএসএস পরিবারের জন্য ঐতিহাসিক এক উল্লাসের ব্যাপার হবে। গতবার তৃণমূল ৪৫টি আসনে স্বল্প ব্যবধানে জিতেছিল। এসআইআর এই আসনগুলোতে বিজেপির অগ্রযাত্রা সহজ করে দিতে পারে। ঘটনাবলি বেশ নগ্নভাবে এগোচ্ছে। বিজেপি তারকা শুভেন্দু অধিকারীর কেন্দ্র নন্দীগ্রামে এসআইআরে বাদ পড়াদের ৯৫ শতাংশই দেখা গেল মুসলিম। তবে ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের নির্বাচনে বিজেপির হারজিত যা-ই ঘটুক, রূপা গাঙ্গুলী, লাভলী মৈত্র, নসুরাত জাহান যাঁরাই শেষ হাসি হাসুন ইতিমধ্যে সেখানে ঘটে যাওয়া যাবতীয় ‘অগ্রগতি’ বাংলাদেশের জন্য স্পষ্ট এক বার্তা পাঠাচ্ছে।
আলতাফ পারভেজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
