ভোটের সেই চেনা জোয়ার: ফিরে আসা ভোটাধিকারের গল্প

মেহেরুন্নিসা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের প্রবেশপথছবি: মনজুরুল ইসলাম

গত মঙ্গলবার বাসা থেকে রিকশায় অফিসে আসছিলাম। রিকশাচালকের নাম না জানলেও চেহারা পরিচিত। সপ্তাহে অন্তত এক-দুই দিন তাঁর রিকশাতে চড়া হয়।

রিকশায় উঠেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোথাকার ভোটার। তিনি জানালেন, টাঙ্গাইলের ভোটার। ভোট দিতে যাবেন কি না প্রশ্ন করলে বলেছিলেন, অবশ্যই যাবেন; সারা দিন রিকশা চালিয়ে সেদিন সন্ধ্যাতেই যাবেন। সন্ধ্যায় বাস পেতে সমস্যা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বললেন, বাস না পেলে সাইকেল নিয়ে যাবেন। বুঝলাম, ভোট দেওয়ার জন্য উনি বেশ ডেসপারেট (মরিয়া)।

ভোট প্রদানে রিকশাচালকের আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখে আনন্দিত হয়েছিলাম। একই সঙ্গে একটু আফসোসও লেগেছিল; পেশাগত ব্যস্ততার কারণে ভোটের দিন ঢাকাতেই থাকতে হবে। ঢাকার খুব কাছেই বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও তাই ভোট দিতে যাওয়া হবে না এবার।

২.

রিকশাচালকের কথায় ভোট নিয়ে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখেছিলাম, ভোটের দিন সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে বাসার কাছে ঢাকা-১০ আসনের দুটি কেন্দ্রে গিয়ে অনেকটা একই রকম চিত্র দেখতে পেয়েছি। এর মধ্যে একটি কেন্দ্র হলো মেহেরুন্নিসা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র, আরেকটি খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। দুটি কেন্দ্রই মোটামুটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত।

প্রথমে যাই ভূতের গলিসংলগ্ন মেহেরুন্নিসা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে। কেন্দ্রের বাইরে মানুষজনের মোটামুটি উপস্থিতি ছিল। ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপির সদস্যরা বেশ তৎপর ছিলেন। কয়েক মিনিট পরপর তাঁরা কেন্দ্রের বাইরে অহেতুক ভিড় না করা জন্য বলছিলেন এবং ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে সহযোগিতা করছিলেন।

আরও পড়ুন

ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে বুথের সামনে বিভিন্ন বয়সী ভোটারদের ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষারত দেখতে পাই। আলাদা আলাদা ভবনে নারী ও পুরুষ ভোটারদের ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি বুথের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের কথা শুনে বুঝতে পারি, কেউ কেউ পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন, কেউবা বন্ধুবান্ধব বা সহপাঠীদের সঙ্গে এসেছেন। কেউ কেউ সঙ্গে করে শিশুদেরও নিয়ে এসেছেন।

ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মধ্যবয়সী পরিচিত এক দোকানদারের সঙ্গে কথা হলো। ভোটের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি ইতিবাচক উত্তর দিয়ে বললেন,  ২০০৮ সালের পরে এবারই এমন সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিলেন।

সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এই কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়নি। তবে নিয়মিত বিরতিতে ভোটারদের ভোট দিয়ে বের হতে দেখা যায়। যতটা সময় সেখানে ছিলাম, ভোট নিয়ে কোনো অভিযোগের কথা জানতে পারিনি।

গত তিনটা নির্বাচন ছিল একটা প্রহসন। এই নির্বাচনগুলো ছিল ‘একতরফা’, ‘রাতের ভোট’ কিংবা ‘ডামি নির্বাচন’। এসব নির্বাচনে একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দিয়েছে, এটা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। এবার যে এমনটা ঘটবে না, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই আশাবাদ ফিরে আসাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

৩.

সাড়ে ৯টার একটু পরে পৌঁছাই কাঁঠালবাগানে অবস্থিত খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এই ভোটকেন্দ্র মেহেরুন্নিসা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের চেয়ে তুলনামূলক ছোট। এই কেন্দ্রের বাইরেও সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপির সদস্যদের বেশ তৎপর দেখা যায়। তাঁরা ভোটের স্লিপ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে দেখে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করাচ্ছিলেন।

এই কেন্দ্রে একটি ভবনে পুরুষ ভোটার এবং আরেকটি কেন্দ্রে নারী ভোটাররা ভোট দিচ্ছিলেন। যে ভবনে পুরুষ ভোটাররা ভোট দিচ্ছিলেন, সেটার নিচতলায় একটু ভিড় লক্ষ করা যায়। সেখানে ৪০-৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে একটু উদ্‌ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকাতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, তিনি এই কেন্দ্রের ভোটার হলেও নির্দিষ্ট বুথটি খুঁজে পাচ্ছেন না। তাঁকে একবার চারতলায়, আরেকবার নিচতলায় পাঠানো হয়েছে; কিন্তু ভোটার নম্বর না মেলায় তখন পর্যন্ত ভোট দিতে পারেননি।

প্রায় আধা ঘণ্টার মতো ওই কেন্দ্রে থেকে নিয়মিত বিরতিতে ভোটারদের ভোট দিতে ঢুকতে দেখেছি। তবে তখন পর্যন্ত ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখতে পাওয়া যায়নি। ভোটকেন্দ্রের বাইরে এবং ভেতরের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে।

আরও পড়ুন

৪.

খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বের হয়ে কাঁঠালবাগানের ঢালের কাছাকাছি এসে যখন রিকশায় উঠেছি, ঘড়িতে তখন সাড়ে ১০টা বাজে। রিকশায় উঠেই রিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করলাম, উনি কোথাকার ভোটার। জানালেন, তিনি বেগুনবাড়ীর (ঢাকা-১২) ভোটার। ভোট দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে বললেন, বেলা দুইটার পরে যাবেন। দেরি করলে তাঁর ভোট অন্য কেউ দিয়ে দেবে কি না, এমন আশঙ্কার কথা জানালে তিনি উত্তর দিলেন, এবার মনে হয় এমনটা হবে না।

রিকশাচালকের কথা শুনে খুশি হলাম। গত তিনটা নির্বাচন ছিল একটা প্রহসন। এই নির্বাচনগুলো ছিল ‘একতরফা’, ‘রাতের ভোট’ কিংবা ‘ডামি নির্বাচন’। এসব নির্বাচনে একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দিয়েছে, এটা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। এবার যে এমনটা ঘটবে না, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই আশাবাদ ফিরে আসাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর আমরা অনেক আশায় বুক বেঁধেছিলাম। নানা কারণে গত দেড় বছরে সেসব আশা-প্রত্যাশার অনেক কিছুই হয়তো পূরণ হয়নি। এরপরও একটা বিষয় স্বীকার করতে হবে, মানুষ এবার অন্তত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছে এবং ভোট নিয়ে তাঁদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা-আশাবাদ ফিরে এসেছে—এ অর্জনটুকুও একেবারে কম নয়।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    *মতামত লেখকের নিজস্ব