দারিদ্র্য কমলেও যে কারণে বৈষম্য বাড়ছে

বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশে সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে গবেষক ও অগবেষক—সবারই কিছু সমস্যা থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোই (বিবিএস) বোধ হয় শেষ আশ্রয়। সেই বিবিএসই এবার বলছে, বিগত সময়ে দেশে দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও বৈষম্য বেড়েছে। আয় ও ভোগ—দুই খাতেই বৈষম্য বেড়েছে।

বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০২২-এর মূল পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বিবিএস। তাদের সেই জরিপ বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এখন দরিদ্র। ২০১৬ সালে পরিচালিত আগের জরিপে এই হার ছিল ২৪ দশমিক ৩।

৬ বছরের মধ্যে দারিদ্র্য কমেছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট। একইভাবে অতি দারিদ্র্যও কমেছে বড় ব্যবধানে। অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ থেকে গত ৬ বছরে কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে উল্লেখিত জরিপে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দেখা গেলেও পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে আমাদের নিত্যদিনের খাদ্যে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা এখনো কম।

আরও পড়ুন

এ জরিপের তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে খানার এবং মাথাপিছু আয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। পরিবারপ্রতি মাসিক আয় এখন ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। আগের জরিপে এটা ছিল ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। আয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবারের ব্যয়ও দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবারপ্রতি মাসিক ব্যয় এখন ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। ২০১৬ সালের জরিপে তা ছিল ১৫ হাজার ৭১৫ টাকা। অন্যদিকে, ব্যক্তির মাথাপিছু মাসিক আয় এখন ৭ হাজার ৬১৪ টাকা; ২০১৬ সালে তা ছিল ৬ হাজার ৯১ টাকা।

বিবিএসের উল্লেখিত জরিপের মূল বার্তা হলো, গত ছয় বছরে দেশে আয় ও ভোগের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আয়বৈষম্য পরিমাপ করা হয় জিনি সহগের মানের মাধ্যমে। আমরা অনেকেই জানি, জিনি সহগ শূন্য (০) মান অর্থ সম্পূর্ণ সমতা, অর্থাৎ তা বৈষম্যহীনতা প্রকাশ করে। অসমতা যত বাড়ে, সহগও তত বাড়ে।

আরও পড়ুন

জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে জিনি সহগ আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। এখন জিনি সহগ মান শূন্য দশমিক ৪৯৯, আগের জরিপে তা ছিল শূন্য দশমিক ৪৮২ এবং ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮। অর্থাৎ, ১২ বছর ধরে দেশে বৈষম্য একটানা বাড়ছেই। এর অর্থ, যাঁরা আয়ের নিম্নসীমায় আছেন; মোট আয়ের মধ্যে তাঁদের অংশ আরও কমে গেছে। আয়বৈষম্যের পাশাপাশি ভোগেও বৈষম্য বেড়েছে গত ছয় বছরে।

২০২২ সাল শেষে ভোগ-সম্পর্কিত জিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৩৩৪। বিবিএসের উপাত্ত অনুযায়ী, এ সহগ ২০১৬ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩২৪ এবং ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩২১।

এই জরিপের প্রকল্পপ্রধানের মতে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশ থেকে বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সারা দেশে ৭২০টি নমুনা এলাকায় দৈবচয়ন ভিত্তিতে ২০টি করে মোট ১৪ হাজার ৪০০ খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটি দেশে প্রণীত এ ধরনের ১৭তম প্রতিবেদন। স্বাভাবিকভাবেই দারিদ্র্য দূর করার জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন-পরিকল্পনা প্রণয়নে তথ্য-উপাত্ত জোগানের উদ্দেশ্য নিয়েই এ জরিপ পরিচালনা করা হয়।

১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে দেশে প্রথম খানা ব্যয় জরিপ পরিচালিত হয়। এভাবে ১৯৯১-৯২ সাল পর্যন্ত আরও কয়েকটি জরিপ করা হয়। তখন খাদ্য ও ক্যালরি গ্রহণ বিবেচনায় দারিদ্র্য পরিমাপ করা হতো। ১৯৯৫-৯৬ সালের জরিপ থেকে মৌলিক চাহিদা ব্যয়পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয় এবং ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ’ নামকরণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে খাদ্যের পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত ভোগ্যপণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে—এমন ভোগ্যপণ্যের একটি তালিকার ভিত্তিতে বিবিএস জরিপ পরিচালনা করে। মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো আয় যারা করতে পারে না, তারা দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়।

জরিপের ফল ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুই মন্ত্রী তাঁদের অবস্থানে থেকে হয়তো যথার্থই বলেছেন—বৈশ্বিক অতিমারি করোনার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সাহসী নীতি এবং কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেই প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে দ্রুত দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হয়েছে। মানুষের আয় বেড়েছে। এর ফলে দারিদ্র্য কমেছে।

আমরা দেখেছি, করোনার মধ্যে ঝুঁকি নিয়েই সীমিত ও শিথিল বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। কলকারখানা বন্ধ করা হয়নি। খেটে খাওয়া মানুষের যোগাযোগ ও যাতায়াতে বাধা দেওয়া হয়নি। ১০০ কোটি ডলারের মতো প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্রদের জন্য নগদ সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

হয়তো এসবের ফল হিসেবে করোনার মধ্যেই দারিদ্র্য কমেছে। গ্রামাঞ্চলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনাও এ ক্ষেত্রেও কাজ করেছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক কালে যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় গ্রামে অকৃষি কার্যক্রমও বেড়েছে। হাটবাজারে বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা বা এনজিওগুলোরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকা রয়েছে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনেরও। অর্থনীতিবিদেরা যথার্থই বলেন, মানুষের আয় বাড়লে দারিদ্র্য কমবে, এটাই স্বাভাবিক।

কোভিডের প্রভাব থেকে আমাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হচ্ছিল আমরা দেখেছি। কিন্তু সবাই আবার বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় ও ব্যয়ও করতে পারছে না। সামাজিক নিরাপত্তাও জিডিপির তুলনায় খুব বেশি নয়।

এ অবস্থায় অতি দারিদ্র্যের হার এত কমে আসা অনেকের কাছেই বৈসাদৃশ্য মনে হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির প্রথম দিকে আমরা যেমন অনেক দেশেই আয়বৈষম্য দেখি বা দেখেছি, অন্যদিকে এটাও সত্যি যে দীর্ঘদিনের আয়বৈষম্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অন্তরায়। আমরা আবার পত্রিকান্তরে দেখেছি, আমাদের সম্পদের বৈষম্যও বেড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাহিদাকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধিই যেহেতু মূল নিয়ামক, তাই ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অর্থনীতির সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করবে।

কেউ কেউ যথার্থই বলেছেন, এ পরিসংখ্যানের মূল রহস্য দারিদ্র্যের সীমারেখা নির্ধারণের মধ্যে। জরিপে নতুন কিছু বিষয়ের সঙ্গে দারিদ্র্যের তুলনা করা হয়েছে, যা আগের জরিপগুলোয় ছিল না। এ কারণে দারিদ্র্য পরিমাপে আগের জরিপগুলোর সঙ্গে এবারের জরিপটি ঠিক তুলনাযোগ্য নয়। প্রতিবেদনে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য, মাথাপিছু আয় ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়—এ রকম অবকাঠামোর মতো অন্যান্য সূচকের পরিসংখ্যানও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

গবেষকদের অনেকেই বলছেন, পক্ষপাতদুষ্ট নীতিই বৈষম্যের বড় কারণ। শতকোটি টাকার ঋণখেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায় না করে তাঁদের আরও বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ধনীদের বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। সহজেই অনুমেয়, বৈষম্যমূলক নীতি-পরিকল্পনার কারণে সুবিধাভোগীদের অবৈধ পুঁজি পুঞ্জীভূত হচ্ছে। যে কারণে বৈষম্য বেড়েই চলেছে।

বিবিএস যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, এমনকি সেটি যদি পুরোপুরি সঠিকও হয়, তাহলেও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্য নিরসনের গতি কমে এসেছে। ২০১৬ সালের জরিপ থেকেই এটি হচ্ছে। তার আগের জরিপগুলোয় দারিদ্র্য কমার হার বেশি ছিল। তা ছাড়া করোনাকালে সারা পৃথিবীতেই দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। অথচ বিবিএসের এবারের পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যে হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে, তার সঙ্গে কর্মসংস্থান পরিস্থিতিরও মিল নেই। সম্পদ বাড়ছে বেশি হারে, কর্মসংস্থান হচ্ছে কম হারে। অনেকে এটাকে বলছেন কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে, সম্পদের পুঞ্জিভবন বা কেন্দ্রীভবন ঘটছে।

গবেষকদের অনেকেই বলছেন, পক্ষপাতদুষ্ট নীতিই বৈষম্যের বড় কারণ। শতকোটি টাকার ঋণখেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায় না করে তাঁদের আরও বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ধনীদের বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। সহজেই অনুমেয়, বৈষম্যমূলক নীতি-পরিকল্পনার কারণে সুবিধাভোগীদের অবৈধ পুঁজি পুঞ্জীভূত হচ্ছে। যে কারণে বৈষম্য বেড়েই চলেছে।

উন্নয়নের যাত্রাকে দ্রুততর করতে হলে শুধু শিল্পায়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি বা ‘চুইয়ে পড়া অর্থনৈতিক নীতির’ দিকে লক্ষ্য রাখলেই হবে না, স্বজনতোষী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। জাতীয় পুঁজির সংবর্ধনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক।