সামাজিক পরিসরে সহনশীলতার অভাব কিসের ইঙ্গিত দেয়

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এমন সব বক্তব্য ও আচরণ দেখি, যেখানে পরিষ্কারভাবে সহনশীলতার অভাব দেখা যায়। তবে সহনশীলতার অভাব যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সে কারণেই অসহিষ্ণু আচরণ ও তার প্রভাব আমাদের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ডিসকোর্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয়।

অনেক অসহিষ্ণু আচরণ কিংবা সহনশীলতার অভাবের অন্যতম কারণ হিসেবে আমরা সামাজিক পরিসরের অতিরাজনৈতিকীকরণকে দায়ী করি। সামাজিক পরিসরের অতিরাজনৈতিকীকরণের কারণে আমরা দেখতে পাই সামাজিক সম্পর্ককে লাভ, লোকসান ও প্রাপ্তির সাপেক্ষে দেখার প্রবণতার বৃদ্ধি, যা আমাদের সামাজিক জীবনের একটি বড় সংকট।

ফলে আমরা যে প্রশ্নের সম্মুখীন এখন হচ্ছি সেটি হলো, আমরা কি রাজনৈতিকভাবে সচেতন সমাজ তৈরি করছি, নাকি ক্রমেই আরও বিভাজিত একটি সমাজ গড়ছি? সমাজ ও তার সামাজিক সম্পর্ক যদি প্রথাগত রাজনৈতিক বলয় দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে সেটি একটি সমাজব্যবস্থার গভীর ক্ষতকেই নির্দেশ করে। ফলে আমাদের এই অসহিষ্ণু সামাজিক চর্চার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা জরুরি।

আমাদের সামাজিক পরিসরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিকীকরণকে বুঝতে হলে তিনটি প্রবণতাকে আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি, যা একই সঙ্গে সামাজিক পরিসরের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রথমত, শিক্ষা ও বিদ্যায়তনিক পরিসরের অতি মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণের ফলে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ জ্ঞান তৈরি করা, সেগুলোই ক্রমাগতভাবে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চার একটি অন্যতম ক্ষেত্র। যেখানে আমরা চাই ছাত্র-ছাত্রীরা আরও রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠবে, সেখানে আমরা দেখছি তারা ক্রমাগতভাবে কূটরাজনীতির বলিতে পরিণত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক যুক্ততাকে দেখা হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে। যে কারণে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠছে ওপরে ওঠার একটি সিঁড়ি হিসেবে। এর সঙ্গে রয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের নেতাদের স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার। সেই লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির উপস্থিতি এখন বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি বাস্তবতা।

আরও পড়ুন

এই রাজনৈতিকীকরণ কেবল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং শিক্ষকেরাও হয়ে উঠছেন সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‍অ্যাকটর। অতি রাজনৈতিকীকরণের কারণে আমরা অনেকাংশেই দেখতে পাই শিক্ষক নিয়োগ হয়ে পড়ে শিক্ষকের চেয়ে একজন ভোটার নিয়োগের প্রক্রিয়া, যা আমরা বেশ কয়েক দশক ধরেই দেখেছি।

শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিকীকরণ একটি নির্মম বাস্তবতা। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক সচেতন প্রতিষ্ঠানের চেয়ে যেন পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রাজনৈতিকীকরণকে দেখি সবচেয়ে ভয়াবহ একটি সামাজিক বদল হিসেবে, যা গত দেড় দশকে আমাদের সমাজের সামগ্রিক কাঠামোকে বদলে দিয়েছে। যেখানে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক সম্পর্ক ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, সেটিই তার সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থানকে নির্ধারিত করে। আর তাই এই প্রবণতা সমাজের অন্যান্য মানুষের মধ্যেও একটি কাম্য আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেসব আচরণগত বৈশিষ্ট্য সমাজের উচ্চপর্যায় থেকে সব স্তরেই দৃশ্যমান।

সমাজের খুব গভীরে অসহিষ্ণুতার যে বীজ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, তার সঙ্গে রাজনীতির এমন সূক্ষ্ম ব্যবহার যে গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য। এই প্রবণতা একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক সংহতির ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ, যা আমাদের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।

এ ধরনের সামাজিক বৈশিষ্ট্যকে অনেক সময় পিয়েরে বুর্দ্যের ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’–এর ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এই সোশ্যাল ক্যাপিটালের অতিরিক্ত পণ্যায়নের প্রবণতা দেখতে পাই, যা একটি আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য সমস্যাজনক। কেননা সোশ্যাল ক্যাপিটাল এর ধারণা আগে অনেকটাই সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত থাকত। কিন্তু সেটি এখন কেবল মর্যাদার বিষয় নয়; বরং তা এখন লাভ-লোকসানের একটা পূর্বশর্ত। ফলে পিয়েরে বুর্দ্য যেভাবে সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধারণা দিয়েছেন, বর্তমান বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় সেটি হয়ে ওঠে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অনৈতিক ও অযাচিত ইঁদুর দৌড়ের এক দৃশ্যমান প্রতিযোগিতা।

তৃতীয়ত, ধর্ম ও সামাজিক চর্চার রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার কথা এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়, যেমন কী করে কিছু নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চা, যেমন গান‍সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্লোগানসহ জাতীয় পরিচিতির নানামুখী রাজনীতি আমাদের জাতি হিসেবে বিভাজিত করে রেখেছে। ফলে নির্দিষ্ট কিছু সাংস্কৃতিক চর্চার অনুসরণ করলেই তাকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে ট্যাগ দেওয়ার সংস্কৃতিও বিদ্যমান রয়েছে।

আবার সাংস্কৃতিক চর্চাকে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা দেখছি। যে সাংস্কৃতিক চর্চা একসময় একটি এলাকার ঐতিহ্যকে তুলে ধরত, সেটি এখন হয়ে উঠেছে অনেকের জন্যই ভয়ের।

আরও পড়ুন

আমরা প্রায়ই দেখতে পাই যে সহনশীলতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে। আপনি যদি আমার মতাদর্শের অন্তর্গত অনুসারী না হন, তাহলে আপনি আমার কাছে ‘অন্য’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। আর এই ‘অন্যতা’ নির্ধারিত হয় আপনি মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিকভাবে কতটা ক্ষমতাবান; বা বলা যায়, এই অন্যতাকে নির্মাণ করা হয় ক্ষমতাবানের দৃষ্টিকোণ থেকে। আর সেই ক্ষমতার উৎস হলো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা।

ফলে সমাজের খুব গভীরে অসহিষ্ণুতার যে বীজ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, তার সঙ্গে রাজনীতির এমন সূক্ষ্ম ব্যবহার যে গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য। এই প্রবণতা একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক সংহতির ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ, যা আমাদের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।

এর মধ্য দিয়ে আমরা আরও পক্ষ ও বিপক্ষ হিসেবে বিভাজিত হয়ে পড়ি, যেখানে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত ভিন্নতা অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। আগেও লিখেছিলাম, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো বদলে দিচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। সামাজিক পরিসরের এই রাজনৈতিক বিভাজন এবং সেই সহনশীলতার অভাব আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়।

অসহনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
প্রতীকী ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নানা মত ও পথের সহাবস্থান। সেটি যখন থাকে না তখন সেই সমাজ হয়ে ওঠে নিপীড়নের একটি সামাজিক ক্ষেত্র, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতের মানুষের ওপর নানা রকম নেতিবাচক ও নিপীড়নমূলক আচরণ দেখতে পাই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন নিপীড়নের উদাহরণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। বিশেষ করে নারীর প্রতি আক্রমণ যেন বেশি পরিলক্ষিত হয়। অনেক সময় আমরা শারীরিক নিপীড়নেরও অভিজ্ঞতাও দেখি, যা সাম্প্রতিক সময়ে চলচ্চিত্রশিল্পী বাঁধনের ক্ষেত্রে ঘটেছে, যেখানে সামাজিক পরিসর হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক প্রতিশোধের ক্ষেত্র হিসেবে।

এর সঙ্গে রয়েছে জনপরিসরে অশালীন ভাষার মাধ্যমে ব্যক্তিক আক্রমণ, এটিও যেন একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নানাভাবে অশালীন ভাষার মাধ্যমে হেয় বা ছোট করার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান, যেখানে যুক্তি ও সমালোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ মুখ্য হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

সংসদ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষা ব্যবহারের কারণে সিফাত নামের একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে যথাযথ ভাষা ব্যবহারের যৌক্তিকতা ও বাক্‌স্বাধীনতার সীমা নিয়ে সামাজিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সহনশীলতার অভাব তাই সামাজিক পরিসরের রাজনৈতিকীকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়। সে জন্য সমাজ যেন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি পরিসর না হয়ে ওঠে, সেদিকে সচেতনভাবে আমাদের নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক বদলের জন্য আমাদের রাজনীতিবিদের কাজ করতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রথাগত রাজনৈতিকীকরণ থেকে মুক্ত না রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।

  • বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আহ্বায়ক, অ্যাল্যায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস