কল্পনা করুন, আপনি আবার নতুন করে জন্ম নিতে চলেছেন। যে সমাজে আপনার জন্ম হবে, সেই সমাজ নিজের ইচ্ছেমতো নির্মাণ করার এক অসাধারণ সুযোগ আপনাকে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি কতটা থাকবে, তা আপনি ঠিক করতে পারবেন। সম্পদ ও সুযোগ কীভাবে বণ্টিত হবে, সেটিও আপনি নির্ধারণ করতে পারবেন।
তবে একটি শর্ত আছে: আপনি জানেন না আপনি কে হবেন। অর্থাৎ আপনি জানেন না, আপনার জন্ম হবে গুলশানের কোনো ধনী পরিবারে, নাকি কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারে।
আপনি জানেন না, আপনার মা-বাবা উচ্চশিক্ষিত হবেন নাকি নিরক্ষর; আপনি সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন নাকি কিছুই পাবেন না; মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাবেন নাকি মৌলিক চিকিৎসা পেতেই সংগ্রাম করতে হবে।
এমনকি আপনি এটাও জানেন না, আপনার জন্ম হবে রাজনৈতিক যোগাযোগসম্পন্ন কোনো পরিবারে, নাকি সম্পূর্ণ যোগাযোগহীন কোনো পরিবারে।
আপনি কেমন সমাজ নির্মাণ করতেন? ‘আ থিওরি অব জাস্টিস’-এ অধ্যাপক জন রওলস আমাদের এমন একটি অবস্থা কল্পনা করতে বলেন, যেখানে প্রত্যেকে সমাজের নিয়মকানুন প্রণয়ন করার সুযোগ পাবে।
কিন্তু সেই সমাজে আমাদের নিজেদের অবস্থান কী হবে, তা আমরা জানি না। আমরা ধনী বা দরিদ্র, ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীন, সুবিধাপ্রাপ্ত বা বঞ্চিত-যে কেউ হতে পারি।
যদি তা-ই হয়, আমাদের নিজেদের গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে এমন নিয়ম বেছে নেব, যা সবার জন্য ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ।
রওলসের ‘জাস্টিস অ্যাজ ফেয়ারনেস’ তত্ত্ব আমাদের সমাজের শুরুর শর্তগুলো ন্যায্য কি না, তা ভাবার একটি শক্তিশালী উপায় প্রদান করে।
শেষ পর্যন্ত সবার হাতে ঠিক সমান পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে, এটা তাঁর উদ্বেগের বিষয় ছিল না। তাঁর উদ্বেগ ছিল-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি সবার কাছে, বিশেষ করে বঞ্চিতদের কাছে ন্যায্য কি না।
আমরা প্রায়ই বৈষম্য নিয়ে এমনভাবে কথা বলি, যেন তা কেবল প্রতিভা, পরিশ্রম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার পার্থক্যের স্বাভাবিক ফল।
ধনীরা ধনী, কারণ তারা কঠোর পরিশ্রম করেছে; দরিদ্ররা দরিদ্র, কারণ তারা যথেষ্ট পরিশ্রম করেনি। এমন ব্যাখ্যা সুবিধাজনক, কিন্তু তা একটি মৌলিক বিষয়কে উপেক্ষা করে। আর তা হলো, মানুষ একই সূচনালাইন থেকে দৌড় শুরু করে না।
একই দিনে জন্ম নেওয়া দুই শিশুর কথা ভাবুন। একজন বড় হয় এক ধনী পরিবারে। তার মা-বাবা সেরা স্কুল, ব্যক্তিগত শিক্ষক, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাবার, পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রম এবং সম্ভবত বিদেশে পড়াশোনার খরচ বহন করতে পারেন।
অন্যজন বড় হয় এক দরিদ্র পরিবারে। তার মা-বাবা হয়তো স্কুলের বেতন দিতে, পর্যাপ্ত পুষ্টি জোগাতে কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খান। পরিবারের আয়ে অবদান রাখতে তাকে হয়তো অল্প বয়সেই স্কুল ছাড়তে হয়।
পরবর্তী সময়ে সমাজ হয়তো ওই দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে দেখে বলবে, ‘প্রথমজন সফল হয়েছে কারণ সে কঠোর পরিশ্রম করেছে আর দ্বিতীয়জন ব্যর্থ হয়েছে কারণ সে তা করেনি।’
বাংলাদেশের জন্য এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যদি কোনো শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মায়, তবে সেই দারিদ্র্যের জন্য দায়ী করা যেতে পারে, এমন কিছুই সে করেনি। আবার যদি আরেকটি শিশু বিপুল সম্পদের মধ্যে জন্মায়, তবে সেই সম্পদের যোগ্য হওয়ার জন্যও সে কিছুই করেনি। দুটিই জন্মগত দৈবঘটনা।
এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা করতে হবে, তা হলো: তারা কি সত্যিই সমান অবস্থা ও অবস্থান থেকে প্রতিযোগিতা করেছিল?
এখানেই রওলসের সুযোগের ন্যায্য সমতা ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যে কারও পক্ষে ডাক্তার, অধ্যাপক, সরকারি কর্মকর্তা বা উদ্যোক্তা হতে কোনো আইনগত বাধা নেই-কাগজে-কলমে এ রকম সমতার নীতির কোনো অর্থ নেই।
কারণ, প্রকৃতপক্ষে এসব অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ কারও মা-বাবার সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা বা যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে।
অতএব, একটি সত্যিকারের ন্যায্য সমাজকে মানুষের জীবন শুরুর শর্তগুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যদি কোনো শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মায়, তবে সেই দারিদ্র্যের জন্য দায়ী করা যেতে পারে, এমন কিছুই সে করেনি।
আবার যদি আরেকটি শিশু বিপুল সম্পদের মধ্যে জন্মায়, তবে সেই সম্পদের যোগ্য হওয়ার জন্যও সে কিছুই করেনি। দুটিই জন্মগত দৈবঘটনা।
অথচ এই দৈবঘটনাগুলোই শিক্ষাগত অর্জন, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আয়, এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবকেও গভীরভাবে নির্ধারণ করে।
এ ক্ষেত্রে রওলসে যুক্তি হলো: বৈষম্যকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমর্থনযোগ্য হতে হবে। এটাই রওলসের বিখ্যাত পার্থক্য নীতির মূল কথা।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন তা সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত সদস্যদের সর্বাধিক কল্যাণে কাজ করে।
অন্য কথায়, রওলস আমাদের বৈষম্য দূর করতে বলেন না; তিনি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে বলেন, বৈষম্যকে কি সমাজের নিচের স্তরে থাকা মানুষের কাছে ন্যায্য বলে প্রমাণ করা যায়?
অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে ভাবার এটি এক গভীরভাবে ভিন্ন পদ্ধতি। ধরা যাক, একটি রাষ্ট্র কিছু মানুষকে অত্যন্ত ধনী হতে দেয়; কারণ, তারা ব্যবসা গড়ে তোলে, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং উদ্ভাবন ঘটায়।
রওলস তাদের সম্পদকে অপরিহার্যভাবে অন্যায় বলে বিবেচনা করতেন না। কিন্তু যদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পদকে ক্রমে কেন্দ্রীভূত হতে দেয়, অথচ দরিদ্রতম মানুষেরা অপর্যাপ্ত শিক্ষা, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা এবং অনিরাপদ কর্মসংস্থানের মধ্যে আটকে থাকে, তবে সেই ব্যবস্থা অন্যায্য।
একই নীতি শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে সমাজ অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচুর ব্যয় করে, অথচ লাখ লাখ শিশু নিম্নমানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পায়, অর্থাৎ শিক্ষার মান যখন এত বেশি মাত্রায় মা-বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করে, তখন সে সমাজের সুযোগকে সত্যিকার অর্থে সমান বলা যায় না।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। মা-বাবা যে শিশুর সেরা চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন, তার জীবন শুরু হয় এমন এক সম্ভাবনার পরিসর নিয়ে, যা সেই শিশুর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যার পরিবার মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার খরচও বহন করতে পারে না।
সমাজ বঞ্চিত শিশুদের সাফল্যের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার জন্য তাদেরই দোষারোপ করে, কিন্তু ন্যায্যতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ কোনো সমাজ এই পার্থক্যগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে না।
এ কারণেই ন্যায়বিচার শুরু হতে হবে দৌড় শুরু হওয়ার আগেই। প্রগতিশীল করব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগে সমান প্রবেশাধিকার-এসবই রওলসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে।
উদ্দেশ্য সাফল্যকে শাস্তি দেওয়া বা অভিন্ন ফলাফল চাপিয়ে দেওয়া নয়। উদ্দেশ্য হলো জন্মের পরিস্থিতি যেন জীবনের পরিস্থিতিকে অতিরিক্তভাবে নির্ধারণ না করে, তা নিশ্চিত করা।
এ যুক্তির একটি রাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বৈষম্যে পরিণত হয়।
যখন সম্পদ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক, উন্নত শিক্ষা ও সুযোগের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ধনীরা প্রবেশাধিকার কিনে নিতে পারে, তখন তারা এমন সুবিধা অর্জন করতে পারে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের পুনরুৎপাদন করে।
তখন বৈষম্য আর কেবল অর্থনৈতিক ঘটনা থাকে না; এটি সামাজিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
অতএব, রওলসের তত্ত্ব আমাদের এক গভীর অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: আমরা যদি না জানতাম কোন পরিবারে আমাদের জন্ম হবে, তবে কি আমরা আমাদের সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে নিতাম? যদি উত্তর না হয়, আমাদের স্বীকার করতে হবে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন।
এই থট এক্সপেরিমেন্ট বৈষম্য নিয়ে বিতর্কের দুই চরম অবস্থানের বিরুদ্ধেও একটি কার্যকর সংশোধনী হিসেবে কাজ করে।
ন্যায়সংগত সমাজের জন্য আয়ের সম্পূর্ণ সমতা অপরিহার্য নয়। আবার সমাজ সবাইকে কেবল বাজারের হাতে ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে উৎপন্ন ফলাফলকে ন্যায্য বলেও ঘোষণা করতে পারে না।
বাজার সম্পদ, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধি সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু বাজার যে নিয়মের অধীনে কাজ করে, সেগুলো সমাজই তৈরি করে।
শিক্ষাব্যবস্থা, সম্পত্তির অধিকার, করব্যবস্থা, শ্রম আইন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি যে সুযোগ সৃষ্টি করে, তা বাজারের নিয়মে হলে, কেউ পায়, কেউ পায় না।
অতএব প্রশ্নটি হলো বৈষম্য আছে কি না, তা নয়। যেকোনো জটিল সমাজেই বৈষম্য প্রায় নিশ্চিতভাবে থাকবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই বৈষম্যগুলো নৈতিক ও সামাজিকভাবে সমর্থনযোগ্য কি না।
আবার কল্পনা করুন, আপনি জানতে চলেছেন আপনি ধনী হবেন নাকি দরিদ্র, সুবিধাপ্রাপ্ত নাকি বঞ্চিত, সুসংযোগসম্পন্ন নাকি উপেক্ষিত।
আপনি কি তখন এমন একটি সমাজ চাইবেন, যেখানে আপনার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে আপনি কোন পরিবারে জন্মেছেন, তার ওপর? নাকি আপনি এমন একটি সমাজ চাইবেন, যেখানে আপনার সূচনাবিন্দু যা-ই হোক না কেন, একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তোলার প্রকৃত সুযোগ আপনার থাকবে?
রওলস আমাদের এমনভাবে সমাজ নির্মাণ করতে আহ্বান জানান, যেন আমরা সেই সমাজের যেকোনো মানুষ হয়ে উঠতে পারি। এটি হয়তো ন্যায়বিচারের সবচেয়ে সহজ-এবং সবচেয়ে কঠিন-পরীক্ষাগুলোর একটি।
একটি সমাজ তখনই ন্যায্য হয় না যখন সবাই দৌড় শেষ করে একই স্থানে পৌঁছায়; বরং তখনই ন্যায্য হয়, যখন কারও ভাগ্য তার সূচনালাইন দ্বারা নির্ধারিত হয় না।
এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। ইমেইল: [email protected]
