সড়কপথের শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কী করণীয়

বাসের মালামাল রাখার বাক্সে ঘুমিয়ে আছে এক পরিবহনশ্রমিক। খাগড়াছড়ি সদরের চেঙ্গি ব্রিজ এলাকা থেকে তোলা।ছবি: নীরব চৌধুরী

আধুনিক যুগের এই চরম বিকাশপর্বে মানুষের যোগাযোগের ধরন পাল্টাচ্ছে সর্বত্র। আকাশপথ এখনো সর্বজনীন গণমানুষের গ্রহণযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ফলে সড়ক পরিবহনব্যবস্থাই এখন পর্যন্ত যোগাযোগের অন্যতম পথ রয়ে গেছে। সড়ক পরিবহন শুধু যানবাহন আর রাস্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি, নাগরিক জীবন, লাখো শ্রমিকের জীবিকা, কোটি মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ও দেশের স্বাভাবিক গতি।

একটি বাস, ট্রাক, কার, পণ্যবাহী গাড়ি কিংবা গণপরিবহনের চাকা থেমে গেলে তার প্রভাব পড়ে ঘরের মানুষ থেকে শুরু করে হাটবাজার, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। দীর্ঘদিন শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতি ও সড়ক পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় আমি এই বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করি।

এই বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখছি দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে যুক্ত থেকে। সাংগঠনিক পরিচয়ের মধ্য থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছি, প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে এবং সেই অনুযায়ী নিজের জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। শ্রমিকের সুখ-দুঃখ, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, পরিবারের দায়িত্ব এবং পেশাগত ঝুঁকির বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

আরও পড়ুন

আমার রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। আমার দৃষ্টিতে একজন পরিবহন শ্রমিক কেবল স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসা একজন কর্মী নন; তিনি একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার অন্যতম অংশীদার। তাই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শ্রেণির দাবি পূরণ করা নয়; বরং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনকে নিরাপদ করা।

তবে শ্রমিকের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে সাধারণ যাত্রীর নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। একজন চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি রাস্তায় তাঁর দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন পরিবহন শ্রমিকের হাতে যেমন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, তেমনি তাঁর দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করে অসংখ্য যাত্রীর জীবন।

আজকের বাংলাদেশে পরিবহন খাতকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ চালক তৈরি, কর্মঘণ্টার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সাভারের নবীনগরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস
প্রতীকী ছবি

এই পরিবর্তনের প্রশ্নে আমার অবস্থান পরিষ্কার। শ্রমিককে বাদ দিয়ে নিরাপদ পরিবহন সম্ভব নয়, আবার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে পাশ কাটিয়েও শ্রমিকের স্বার্থের কথা বলা ইনসাফ নয়। আমার বক্তব্যের মূল জায়গা হলো ভারসাম্য, যেখানে শ্রমিকের মর্যাদা থাকবে এবং যাত্রীর নিরাপত্তাও থাকবে সমান গুরুত্বে। আমার কাছে রাজনীতির সাফল্য কোনো ব্যক্তির পদ বা পরিচয়ে নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাব কতটা পড়ল, সেটিতেই। আর সেই কারণেই শ্রমিকের অধিকার ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নকে আমি একই রাজনৈতিক বাস্তবতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখি।

পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি একটাই: শ্রমিককে সম্মান দিয়ে, মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেই একটি শক্তিশালী পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটাই হতে পারে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার বাস্তব রাজনৈতিক পথ।

আরও পড়ুন

আমি বিশ্বাস করি, সড়কপথের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, জননিরাপত্তা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। পরিবহন খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের শ্রম-ঘামে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটছে এবং তারা জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পরিবহন খাত সচল রাখলেও নানা নেতিবাচক সমালোচনা প্রতিনিয়ত তাদের শুনতে হয়। প্রচারমাধ্যমে ‘সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের’ ইতিবাচক কোনো কিছু তুলে ধরা হয় না। দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও মানুষের প্রত্যাশিত নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে পরিবহন শ্রমিকেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুশৃঙ্খল, নিরাপদ একটি সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আমি বরাবরই সড়কপথে যানবাহনের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আসছি। আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের অন্যতম হচ্ছে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স। চালক ও শ্রমিকদের জন্য পেশাদার ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ এবং নবায়নপ্রক্রিয়া সহজ ও বাধ্যতামূলক করা। কাজের সময় নির্ধারণ, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত বিরতির ব্যবস্থা করা। আইন প্রয়োগ ও চাঁদাবাজি বন্ধ, মহাসড়কে অবৈধ চাঁদাবাজি, যত্রতত্র গাড়ি তল্লাশি ও হয়রানি বন্ধ করা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।

যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল হয়ে রাজধানী সুপার মার্কেট পর্যন্ত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নি​চে যত্রতত্র ​বাস–ট্রাক রেখে তৈরি করা হয়ছে অবৈধ টার্মিনাল।
ফাইল ছবি

নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, নিহত বা সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য আইনি সহায়তা, বিমা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শ্রমিকদের নিয়মিত দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা নিশ্চিত করা। টার্মিনাল ও বিশ্রামাগার, চালক-শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত বাস-ট্রাক টার্মিনাল, আধুনিক বিশ্রামাগার ও শৌচাগার নির্মাণ করা।

নিরাপদ যানবাহন, ত্রুটিহীন ও উপযুক্ত ফিটনেসসম্পন্ন যানবাহন পরিচালনা নিশ্চিত করা জরুরি। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের আইনের দমনমূলক ধারা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হলেও তাঁদের কল্যাণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। সড়ক পরিবহন ও শ্রম আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলো আরও বেশি বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী করার প্রয়োজন রয়েছে।

সড়ক পরিবহন, শ্রমিক অধিকার এবং জননিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার কিছু পরামর্শ রয়েছে। সড়কপথে বাস, ট্রাক, ট্যাংক-লরি, কভার্ড ভ্যান, লং ভেহিক্যালসহ দূরপাল্লার ড্রাইভার, কনডাক্টর, হেলপারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

১. কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম নির্ধারণ

নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা: চালকদের দৈনিক টানা গাড়ি চালানোর সর্বোচ্চ সময় বেঁধে দেওয়া।

বাধ্যতামূলক বিশ্রাম: প্রতি ৪–৫ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর আধা ঘণ্টার বিরতি দেওয়া।

বিশ্রামাগার স্থাপন: মহাসড়কের পাশে আধুনিক ও নিরাপদ টার্মিনাল বা বিশ্রামাগার তৈরি করা।

২. মহাসড়কের নিরাপত্তা ও অবকাঠামো

নিরাপদ পার্কিং: হাইওয়েতে ছিনতাই বা ডাকাতি রোধে সিসিটিভি ক্যামেরাযুক্ত নিরাপদ পার্কিং জোন করা।

পুলিশি টহল: রাতে এবং নির্জন রাস্তায় হাইওয়ে পুলিশের সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা।

চাঁদাবাজি বন্ধ: রাস্তায় অবৈধ টোল আদায় এবং পুলিশি হয়রানি সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

৩. চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা

পেশাদার প্রশিক্ষণ: চালকদের যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া।

মাদক পরীক্ষা: ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদকাসক্ত চালকদের চিহ্নিত করা এবং শাস্তির ব্যবস্থা করা।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা: চালকদের চোখের দৃষ্টি ও শারীরিক ফিটনেস নিয়মিত পরীক্ষা করা।

আজকের বাংলাদেশে পরিবহন খাতকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ফাইল ছবি

৪. যান্ত্রিক নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা

ফিটনেস সার্টিফিকেট: বাস, ট্রাকসহ যানবাহনের ব্রেক, লাইট ও টায়ারের ফিটনেস নিয়মিত কঠোরভাবে যাচাই করা।

৫. ওভারলোডিং বন্ধ

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন কঠোর হস্তে দমন করা। অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন রাস্তাঘাটের ক্ষতি করে। দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ায়।

৬. বিমা ও চিকিৎসা

দুর্ঘটনাকবলিত শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত বিমাসুবিধা ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে সরকারি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

৭. সড়ক পরিবহনে পুলিশি নিরাপত্তা

সড়ক পরিবহনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানোর বিকল্প নেই। অন্যায়ভাবে সড়ক পরিবহনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ইতিমধ্যে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা আগের তুলনায় অনেকটাই হ্রাস পাচ্ছে। যানজট পরিহার, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য সড়ক-মহাসড়কে এআই ক্যামেরা স্থাপন, দুর্ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরবাইক সার্ভিস, পথে দূরপাল্লার যানবাহনের চালকদের বিশ্রামের জন্য বিশ্রামাগার চালু, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে প্রতিবন্ধকতা হ্রাস, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ সেন্টার চালুর পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকার সড়ক পরিবহনব্যবস্থাকে একটি স্বাভাবিক সিস্টেমে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ফলে শ্রমিকশ্রেণির অধিকার এবং জননিরাপত্তা—দুটিই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমি একজন শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সারা জীবন শ্রমিকশ্রেণির অধিকারের জন্য লড়াই করেছি। মানুষের নিরাপত্তা, কাঙ্ক্ষিত অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আমি কাজ করে যাচ্ছি এবং কাজ করতে চাই।

  • অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সংসদ সদস্য, পাবনা-৫ (সদর), প্রধান সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক পরিষদ

মতামত লেখকের নিজস্ব