জামায়াতের নির্বাচনী সাফল্য কতটা টেকসই হবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। জামায়াতের এই নির্বাচনী সাফল্যের কারণ এবং এই সাফল্য কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট যে বড় সাফল্য দেখিয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। ১১–দলীয় জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে; এর মধ্যে জামায়াতের প্রাপ্ত আসন ৬৮। ভোটের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একধরনের ‘হাইপ’ তৈরি করা হয়েছিল যে জামায়াত এবার ক্ষমতায় আসছে। রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘পারসেপশন অব উইনেবিলিটি’; অর্থাৎ মানুষকে বোঝানো যে ‘আমরাও জিততে পারি’।

জামায়াত এবারের নির্বাচনে এই মনস্তাত্ত্বিক জায়গাটি দক্ষভাবে ব্যবহার করেছে। তবে যেকোনো বাস্তববাদী বিশ্লেষক এই প্রশ্ন তুলবেন, জামায়াতের এই নির্বাচনী সাফল্য কতটা টেকসই হবে; অর্থাৎ ভবিষ্যতের জন্য কতটা শক্ত অবস্থানে থাকবে?

২.

জামায়াতের নির্বাচনী সাফল্যের প্রথম কারণটি হলো বিএনপির মধ্যে ‘বিভাজন’। প্রায় ৩০টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ায় জামায়াত স্পষ্ট সুবিধা পেয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মরিস ডুভারজে তাঁর পলিটিক্যাল পার্টিজ বইয়ে এই বাস্তবতার ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যখন একই মতাদর্শ বা ঘরানার একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তখন ভোট বিভক্ত হয় এবং অন্য কোনো দল অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

এ ধরনের ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্য দেশেও ঘটেছে। ভারতে বহু নির্বাচনে দেখা গেছে, কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট বিভক্ত হওয়ার কারণে বিজেপি সুবিধা পেয়েছে। আবার যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভ ও লেবারবিরোধী ভোট বিভিন্ন ছোট দলে ভাগ হয়ে গেলে তৃতীয় পক্ষ লাভবান হয়েছে, এমন উদাহরণও আছে।

সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে, ভবিষ্যতে যদি বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কি এই আসনগুলো থেকে জামায়াত এভাবে সুবিধা পাবে?

আরও পড়ুন

৩.

এর পাশাপাশি এবারের নির্বাচনের আরেকটি বড় বিষয় ছিল ভোটার উপস্থিতি (টার্নআউট)। বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত ছিল, ভোটার যত বেশি ভোটকেন্দ্রে যাবেন, বিএনপির আসনসংখ্যা তত বাড়বে। এ কারণেই নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ অনেকেই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বারবার আহ্বান করেছিলেন।

ভোটের হিসাব প্রকাশের পর দেখা যায়, ভোটার উপস্থিতি ৬০ শতাংশের মতো। এ থেকে বোঝা যায়, বেশ কিছু ভোটার হয়তো ভোট দিতে যাননি। তাঁরা হয়তো ভেবেছেন, নির্বাচনী সমীকরণ তো বিএনপির পক্ষেই। এই আত্মতুষ্টি (ওভার কনফিডেন্স) বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ক্যাডারভিত্তিক ও খুব সংগঠিত দল হওয়ায় তাদের সমর্থকেরা বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে গেছেন। এমনকি অন্যদের ভোটকেন্দ্রে আনার ক্ষেত্রেও সংগঠিতভাবে আয়োজন করেছে।

অনেক দেশে নির্বাচনে ‘গেট আউট দ্য ভোট’ (ভোটকেন্দ্রে ভোটার আনা) কৌশলটি খুব গুরুত্বপূর্ণ; কখনো কখনো এটিই ফল পাল্টে দেয়। জামায়াত এই জায়গায় স্পষ্টভাবেই এগিয়ে ছিল; বিএনপি তুলনামূলক পিছিয়ে ছিল।

৪.

আরেকটি কারণ হলো, দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কাজ। ২০১৪ সালের পর প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি দুর্বল হলেও জামায়াতে ইসলামী মাঠের কাজ থামায়নি। ঘরোয়া তালিম, ধর্মীয় আলোচনা, নারী কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ, স্থানীয় সহায়তা কার্যক্রম এবং অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তারা সমাজে তাদের উপস্থিতি ধরে রেখেছে।

রাজনৈতিক সংগঠন বিষয়ে গবেষণা বলছে, যে দল শক্ত নেটওয়ার্ক ধরে রাখতে পারে, রাজনৈতিক সুযোগ এলে সেই দল দ্রুত শক্তি দেখাতে পারে। এখানে দুটি তাত্ত্বিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ‘সোশ্যাল এমবডিডনেস’, অর্থাৎ দল যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন সম্পর্ক শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সামাজিক ও নৈতিক সম্পর্কেও রূপ নেয়। তুরস্কের একে পার্টির প্রাথমিক উত্থান বা লাতিন আমেরিকার খ্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টিগুলোর ক্ষেত্রেও এমনটি
দেখা গেছে।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয়ত, ‘অর্গানাইজেশনাল পারসিস্টেন্স’; অর্থাৎ ক্যাডারভিত্তিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ দল দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। জামায়াতের কাঠামো এই জায়গায় তাদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। এর ফলে ধারণা করা যায়, বিএনপির কিছু অংশের ভোটার ধীরে ধীরে জামায়াতের দিকে গেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি ‘আদর্শগত স্থায়ী স্থানান্তর’ (আইডিওলজিক্যাল রিয়্যালাইনমেন্ট), নাকি সাময়িক কৌশলগত সরে আসা ( টেম্পোরারি শিফট)?

যদি এই ভোট নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের ফল হয়, তাহলে তা টেকসই হতে পারে। কিন্তু যদি হতাশা বা পরিস্থিতিগত কারণে হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবেশ বদলালে ভোট আবার আগের জায়গায় ফিরতে পারে।

এখন আসল প্রশ্ন হলো, জামায়াত এই নতুন সমর্থনকে কতটা স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তিতে রূপ দিতে পারবে।

সাতক্ষীরায় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ মাঠে
ফাইল ছবি

৫.

গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো, তরুণ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন। এবারের নির্বাচনে অনেক তরুণ প্রথমবার ভোট দিয়েছেন এবং তাঁদের রাজনৈতিক ধারণা অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। এখানে ‘পলিটিক্যাল সোশ্যালাইজেশন’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; যে পরিবেশে একজন নাগরিক বড় হয়, সেই পরিবেশ তার রাজনৈতিক চিন্তাকে গড়ে তোলে। এই প্রজন্ম দীর্ঘ সময় একধরনের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। ফলে তারা রাজনীতির জটিল কাঠামোকে কতটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ভোট দিয়েছে, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হবে।

এখানে একটি তাত্ত্বিক বিষয়ের কথা বলা যেতে পারে। মার্কিন আইনবিদ এবং গবেষক ক্যাস সানস্টেইন ‘ইকো চেম্বার’ তত্ত্বের কথা বলেছেন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ অনেক সময় নিজের মতের সঙ্গে মিল আছে, এমন তথ্যই বেশি দেখে ও শোনে। এতে একটি শক্ত সমর্থনের অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা নীতিগত প্রশ্ন সামনে এলে সেই সমর্থন বদলেও যেতে পারে।

অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ আছে। মালয়েশিয়ায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেই সমর্থনের একটি অংশ সরে যায়। পাকিস্তানে ইমরান খানের উত্থানের সময়ও তরুণদের বড় অংশ তাঁর দল পিটিআইকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সমর্থনের ভেতরে ভাঙন দেখা গেছে; অর্থাৎ তরুণ ভোট অনেক সময় আবেগ, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং ডিজিটাল মাধ্যমের প্রভাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা টিকিয়ে রাখতে হলে দলকে নীতিগত স্পষ্টতা, অর্থনৈতিক কর্মসূচি এবং বাস্তব পারফরম্যান্স দেখাতে হয়।

প্রশ্নটি এখানে স্পষ্ট, জামায়াত কি এই তরুণদের সমর্থনকে সাময়িক ডিজিটাল আবেগ থেকে বের করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আনুগত্যে রূপ দিতে পারবে?

৬.

সীমান্তবর্তী এবং তুলনামূলক দরিদ্র জেলাগুলোতে জামায়াত বেশি সফল হয়েছে। জামায়াত সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ, যেমন অর্থনৈতিক সহায়তা, চিকিৎসা সহযোগিতা, শিক্ষাসহায়তা—এসবের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে একে অনেক সময় ‘কল্যাণভিত্তিক রাজনীতি’ বা ক্লায়েন্টেলিজম বলা হয়—যেখানে সরাসরি সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ভোটার আচরণকে প্রভাবিত করা হয়। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, সামাজিক সুরক্ষা বা সহায়তার পরিধি বাড়াতে পারা দলগুলো দ্রুত জনসমর্থন পায়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিপুল পরিমাণ ‘দোদুল্যমান’ (সুইং) ভোটার স্থায়ীভাবে জামায়াতের দিকে গেছেন নাকি পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে ভোট দিয়েছেন? এ ধরনের সমর্থন সব সময় আদর্শগত নয়; প্রতিযোগী দল যদি সমান বা বেশি কার্যকর কর্মসূচি দেয়, সমর্থনের দিক বদলাতেও পারে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড যদি বাস্তবে দৃশ্যমান ফল দেখাতে পারে, তাহলে দরিদ্র অঞ্চলের ভোট বা সুইং ভোটাররা আবার সরে আসবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার রাজনৈতিক-সামাজিক গতিপথ অনেকাংশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনস্তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত। এই শ্রেণি সাধারণত চায় সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা। যদি কোনো দল এই শ্রেণির প্রত্যাশা বুঝতে ব্যর্থ হয় বা তাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়, তাহলে তাদের সমর্থন টেকসই হয় না।

৭.

জামায়াতের সমর্থন কতটা টেকসই, তা নিয়ে ভাবলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, জামায়াতের রাজনৈতিক এজেন্সি বা স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা দৃঢ়? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ছিল নাকি কোনো গ্রুপ কিংবা ইনফ্লুয়েন্সারদের বক্তব্য তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে? এগুলো নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

নির্বাচনের আগে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি অডিও ফাঁসের ঘটনা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ–সংক্রান্ত কূটনৈতিক যোগাযোগে জামায়াতকে ঘিরে কথা ওঠে। এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, দলটির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান কতটা স্বতন্ত্র আর কতটা বাইরের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত?

জামায়াত বহুবার অভিযোগ করেছে যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছে। এই অভিযোগ আংশিক সত্য হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন ওঠে, ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষায় তারা নিজেরাও কি নিজেদের ব্যবহারযোগ্য করে তোলেনি? একটি আদর্শভিত্তিক ও ক্যাডারনির্ভর দল যদি নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সামনে বড় পরীক্ষা হলো, জামায়াত কি তাদের এজেন্সি স্পষ্ট ও স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?

আরও পড়ুন

৮.

আরেকটি বড় প্রশ্ন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন। দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামপন্থী রাজনীতি বহু দল–উপদলে বিভক্ত। তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক দূরত্ব ও মতভেদ রয়েছে। অতীতের এসব দ্বন্দ্ব আবারও সামনে আসতে পারে। এই বিভাজনগুলো যদি গভীর হয়, তাহলে ‘ইসলামি ভোটব্যাংক’ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার রাজনৈতিক-সামাজিক গতিপথ অনেকাংশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনস্তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত। এই শ্রেণি সাধারণত চায় সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা। যদি কোনো দল এই শ্রেণির প্রত্যাশা বুঝতে ব্যর্থ হয় বা তাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়, তাহলে তাদের সমর্থন টেকসই হয় না।

নারী প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণ, নির্বাচনে নারীদের মনোনয়ন না দেওয়া—এবারের নির্বাচনে এসব বিষয় মধ্যবিত্ত ও তরুণসমাজে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নটি এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আবেগপূর্ণ বিষয়। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না।

আরেকটি বাস্তব প্রশ্ন হলো, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর জামায়াত যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, তা কি ভবিষ্যতেও একইভাবে বজায় থাকবে? নির্বাচনী পরিবেশ বদলালে এই সুবিধা কি বহাল থাকবে? কোনো আন্দোলন-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে কোনো দল অস্থায়ী সুবিধা পেতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও জন–আস্থা—দুটিই দরকার।

৯.

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে সহযোগিতামূলক ছিল না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ যে রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা ছিল কঠোর ও আন্দোলননির্ভর। সংসদের ভেতর-বাইরে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি, হরতাল, অবরোধ—এসবের মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির একটি ধারা তৈরি হয়। এখন প্রশ্ন হলো, জামায়াতে ইসলামী একই ঐতিহ্য অনুসরণ করবে নাকি ভিন্ন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা করবে? এসবের উত্তর খোঁজা দরকার। কারণ, আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকবে, এমন ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

  • মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব