জামায়াত সমর্থনে জোয়ার বা হাইপ, ’৯১-এর পুনরাবৃত্তির আলাপ ও বাস্তবতা

খুলনায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। খুলনা সার্কিট হাউস মাঠেছবি: সাদ্দাম হোসেন

সপ্তাহ দু-এক আগে চট্টগ্রামে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে একজন বিএনপি নেতার সঙ্গে দেখা হলো। উপজেলা পর্যায়ের একজন ত্যাগী নেতা। একসময় স্থানীয় নির্বাচনও করেছিলেন। এবারের নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাবনা কেমন জানতে চাইলাম।

আলোচনার এক পর্যায়ে হেসে মন্তব্য করে বসলেন, ‘এবার ১৯৯১ সালের মতো ঘটনা ঘটবে না তো? সবাই তখন বলছিল, আওয়ামী লীগ জিতে যাচ্ছে। আমরাও সেটিই মনে করেছিলাম। পরে দেখা গেল, বিএনপি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় চলে আসল।’ যদিও নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাবেক এই ছাত্রদল নেতা বিএনপির জিতে আসা নিয়েই আত্মবিশ্বাসী।

বিএনপির ওই স্থানীয় নেতা মজা করে বিষয়টি বললেও জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণা যেভাবে আলোচনা তৈরি করেছে, তাতে অনেকের মধ্যেই এমন ভাবনা যে উঁকি দেয়নি, তা নয়। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে প্রকাশ পাওয়া একের পর এক জরিপে জামায়াতের সাফল্যের বিষয়টিও প্রকাশ পেয়েছে।

আরও পড়ুন

এসব জরিপ নানাভাবে জনমানসে প্রভাব ফেলছে এবং জামায়াতের সম্ভাবনা নিয়ে কারও মধ্যে উত্তেজনা বা কারও মধ্যে দুশ্চিন্তাও তৈরি করছে। নাগরিক সমাজের কারও কারও মতে, জামায়াত একটা হাইপ তৈরি করেছে, আদতে নির্বাচনী বাস্তবতা তা বলে না। অন্যদিকে জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে আশাবাদী ব্যক্তিরা বলছেন, মানুষের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই দেশজুড়ে জামায়াতকে নিয়ে জোয়ার তৈরি হয়েছে, এটি অর্গানিক।

বিএনপি বড় দল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপি ক্ষমতায় যাচ্ছে, স্বাভাবিকভাবে এ ধারণাই পোষণ করে আসছে মানুষ। যেহেতু আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিতর্কিত তিন নির্বাচনের বাস্তবতায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম করে এসেছে বিএনপি। বিগত আওয়ামী শাসনামলে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার বিএনপি-জামায়াতসহ অনেক দলই হয়েছে। হয়েছে গুম-খুনের শিকারও।

কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপিই বিকল্প—এটিই গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এ দুটি দল ছাড়া দেশব্যাপী তৃণমূল সমর্থনের ভিত্তি অন্য কোনো দলের নেই। অন্য দলগুলো, বিশেষ করে জামায়াত বা জাতীয় পার্টির তৃণমূলে প্রভাব দেশের নির্দিষ্ট বা একেক অঞ্চলে। ফলে ক্ষমতায় আসার জন্য দেশব্যাপী তৃণমূলের যে ভিত্তি দরকার, সেটি না থাকার পরও জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে—অনেক মানুষের মধ্যে এমন প্রবল ধারণা কেন তৈরি হলো?

গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি তার তৃণমূলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তৃণমূল সামাল দিতে পারেনি দলটি। বিএনপির এই ব্যর্থতা জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণাকে শক্তি জুগিয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং পুরোনো নেতৃবৃন্দের তুলনায় বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের গতিশীল নেতৃত্ব দলটি নিয়ে অনেক মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।

গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাস্তবতায় গত দেড় বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থা বা দক্ষিণপন্থার উত্থানের বিষয়টি দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে দেশজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন শিবিরের অভূতপূর্ব সাফল্যে জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ নিয়ে আলোচনা তৈরি করে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্ম বা জেন–জি’র মধ্যেও জামায়াত–শিবিরের একটা প্রভাব প্রকাশ পায়।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এ সাফল্যের পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল—বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল জিতে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ নিলে ছাত্রলীগের মতো কর্তৃত্ববাদী ও ক্ষমতাচর্চার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা। এই আশঙ্কাকে জাতীয় নির্বাচনেও কৌশল হিসেবে কাজে লাগিয়েছে জামায়াত। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের মতো সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি শুরু হবে—বিষয়টি জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাধান্য পেয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী সমাবেশে দলীয় প্রতীক নিয়ে সমর্থকেরা। গেন্ডারিয়া, ঢাকা
ছবি: দীপু মালাকার

বলতেই হবে, গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি তার তৃণমূলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তৃণমূল সামাল দিতে পারেনি দলটি। বিএনপির এই ব্যর্থতা জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণাকে শক্তি জুগিয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াতের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং পুরোনো নেতৃবৃন্দের তুলনায় বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের গতিশীল নেতৃত্ব দলটি নিয়ে অনেক মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।

এ ছাড়া জামায়াতের বহুমুখী প্রচারণাকৌশল তো আছেই। বিশেষ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলা জামায়াতের ব্যাপক প্রচারণার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ‘জান্নাত পাওয়া’ বা ভোট না দিলে ‘কবরে গিয়ে কী জবাব দেবেন’—এভাবে ভোটের মাঠে ধর্মকে ব্যবহার করার বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। জামায়াতের কোনো কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠলেও শীর্ষ নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করেন।

জামায়াতের এর আগে নির্বাচনী সাফল্য বলতে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন অর্জন, ১৯৯১ সালে। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে আসন ভাগাভাগিতে জিতে ১৭টি আসন। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মতো বড় দল ছাড়াই ছোট ১০টি দল নিয়ে জোট করে জামায়াত কত আসন পেতে পারে?

আরও পড়ুন

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আসিফ মোহাম্মদ শাহানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জামায়াতের পক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন হলো, যেহেতু আমাদের দেশে নির্বাচন ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (এফপিটিপি) বা সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত বিজয়ী পদ্ধতিতে হয়। এই পরিমাণ ভোট কি তাদের ক্ষমতায় নিতে পারবে? তাদের ভোটের হার সামান্য বাড়লেও সেটি কি ১৫০–এর বেশি সংসদীয় আসনে জয় নিশ্চিত করতে পারবে?’

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জামায়াতের প্রতি ভোটারের সমর্থন বৃদ্ধি পাওয়া ও নির্বাচনের পূর্বাভাস বিষয়ে একই বিশ্লেষণ তিনি হাজির করেন।

নির্বাচন হবে কি হবে না এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার দীর্ঘসূত্রতা, এ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রভাব বিএনপিকে চাপে ফেলে। এরপর মনোনয়নপ্রত্যাশীর চাপ, নেতাদের মূল্যায়ন, প্রার্থী বাছাইয়ে পরিকল্পনাহীনতা ও নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে না পারায় বিএনপির বিরুদ্ধেই বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ৭০ জনের বেশি। দলটির নির্বাচনী ইতিহাসে এমন নজির আগে দেখা যায়নি।

কয়েক দিন আগে রাজধানী ঢাকার রামপুরা এলাকায় মোটরসাইকেল রাইডে চড়ার সময় চালকের সঙ্গে কথা বলেও বিষয়টি বুঝতে পারলাম। চালক পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের, বাড়ি বাগেরহাট। তিনি বললেন, বাগেরহাটের চারটা আসনই দাঁড়িপাল্লা পাবে। তার কাছ থেকে বুঝতে চাইলাম, একটা জেলার সব কটি আসনই কেন জামায়াত পাবে?

প্রথম কারণ হিসেবে তিনি বললেন, দাঁড়িপাল্লার প্রচারণা কৌশল—‘সব দলকে দেখছি এবার দাঁড়িপাল্লা দেখতে চাই।’ পরিবর্তনের এ আকাঙ্খা সাধারণ অনেক মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে মনে করেন, এটি মাঠে-ময়দানে জামায়াতের প্রচারণা কৌশলের সফলতা। যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে জামায়াতের চিরায়ত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে জনসাধারণের একটা অংশের মধ্যেও জামায়াত নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ভদ্রলোক কিন্তু একবারও জামায়াতের নাম উচ্চারণ করেনি। বলেছেন, দাঁড়িপাল্লা। জামায়াত যে তার দলের নামের চেয়ে মানুষের মাথার মধ্যে প্রতীকের নামটা জোরালোভাবে সেট বা প্রবেশ করাতে পেরেছে, এটির প্রভাব প্রতীকনির্ভর ইলেকটোরিয়াল ভোটিং প্রসেসে ব্যাপক। তারেক রহমানের নেতৃত্বের ব্যর্থতা, তাঁর উল্টোপাল্টা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সমালোচনা করলেন তিনি। তবে আরেকটা বিষয় যেটা তাঁর কথায় উঠে এসেছে, সেটি হলো তৃণমূলে স্থানীয় বিএনপির নানা অপকর্ম।

জামায়াতের নির্বাচনী জনসমাবেশ। ৭ ফেব্রুয়ারি, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ, সিলেট
ছবি: জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ থেকে

তিনি বললেন, তাঁর এলাকায় গত ১৫ বছরের নির্যাতিত বিএনপির লোকজন তাঁকে ফোন দিয়ে বলেছেন, ভোট দিতে এলাকায় যেতে হবে আর দাঁড়িপাল্লাতেই ভোট দিতে হবে। কারণ, ৫ আগস্টের পর নির্যাতিত বিএনপির লোকেরা এখন দলের মধ্যে কোণঠাসা। সুযোগসন্ধানীরাই দলের মধ্যে বেপরোয়া হয়ে গেছে, যেটা মানুষ সহ্য করছে না। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের লোকেরাও বিএনপিতে অনুপ্রবেশ করেছেন। এতেও নির্যাতিত বিএনপির লোকেরা বিরক্ত।

এই বিষয়গুলো আসলে গোটা দেশের জন্যই প্রযোজ্য। এ কারণে দেশের অনেক জায়গায় জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই জনসমর্থন আসলে কতটা এবং তা নির্বাচনে কী ফলাফল দেবে?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ‘ঐতিহ্যগতভাবেই বিএনপির জনভিত্তি জামায়াতের চেয়ে অনেক বড় ও শক্তিশালী। বিএনপি তাদের ভিত্তির কিছু অংশ হারালেও অবশিষ্টাংশ জামায়াতের চেয়ে বড়ই থাকে। জামায়াতের ভোট ১২ থেকে ৩৫ শতাংশে উঠলেও সেটি সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে। জামায়াত নির্দলীয় ও বিএনপির কিছু ভোট পেলেও সব দোদুল্যমান ভোটারকে টানতে পারেনি। এর বড় কারণ হলো দলের সাংগঠনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সব আসনে যোগ্য প্রার্থীর অভাব। জামায়াত মূলত রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরের ওপর বাজি ধরছে, অন্য বিভাগ নিয়ে তারা নিজেরাও খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী নয়।’

আরও পড়ুন

জামায়াত নিয়ে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, ‘দেড় বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত-শিবির অত্যন্ত অর্গানাইজড বা সুসংগঠিতভাবে প্রচারণা চালিয়েছে এবং সেটির ধারাবাহিকতা শক্তিশালীভাবে ধরে রেখেছে। “আওয়ামী লীগকে দেখলেন, বিএনপিকে দেখলেন, এবার জামায়াতকে দেখেন”—এই ধরনের স্লোগান কিন্তু তারা অনেক আগে থেকেই ব্যবহার করা শুরু করেছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে তাকালে মনে হচ্ছে, জামায়াত অনেক বেশি ভালো করতে যাচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে নির্ভরযোগ্য জরিপগুলোর মিলিয়ে দেখলে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপের সঙ্গে বাস্তবতার কোথাও না কোথাও খানিকটা হলেও অমিল আছে।’

আসিফ বিন আলী আরও বলেন, ‘আরেকটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশে শুধু ৫০ ভাগ মানুষের ইন্টারনেট এক্সেস রয়েছে এবং তার মধ্যেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী আরও কম। ফলে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে থেকে যাওয়া মানুষেরা সাইলেন্ট ভোটার হিসেবে ভোট দেবেন। তো এই সাইলেন্ট ভোটারদের ব্যাপারে আমরা এখনো খুব একটা কিছু জানি না। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপ দ্বারা আগে থেকেই অনুমান করা ঠিক হবে না। এখানে লোকাল ডায়নামিকস, লোকাল রাজনীতি, মানুষের প্রায়োরিটি, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক ও সংখ্যালঘুর ভোট—এই সবগুলোরই একটা প্রভাব থাকবে।’

আরও পড়ুন

তবে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন। শিক্ষক ও গবেষক মারদিয়া মমতাজের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘প্রথমত. দীর্ঘদিন ধরে জনমানুষ জামায়াতের সাংগঠনিক সৌন্দর্য, ন্যায়সংগত আচরণ আচরণ, সহনশীলতা—এসব ব্যাপারে অন্ধকারে ছিল। ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে এ অন্ধকার কেটে যায়। মানুষ নিজের চোখে দেখেছে, দলটির নেতৃত্ব ও তাদের স্ট্যান্ডার্ড। দ্বিতীয়ত. গত ১৭ বছরের গুম, হত্যা, নির্যাতনের ফ্যাসিস্ট শাসন নিয়ে জামায়াত মানুষকে সচেতন করেছে। তৃতীয়ত. দুর্নীতি, ঋণখেলাপিমুক্ত শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়াতেও মানুষ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে জামায়াতের প্রতি মানুষের যে জোয়ার তৈরি হয়েছে, এটা হাইপ নয়। এটা উৎসাহ, নির্ভয়ে মতামত প্রকাশের পরিবেশ পাওয়ায় মতামতের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।’

আরও পড়ুন

শেখ হাসিনার পতনের পর বিএনপিই নির্বাচনের প্রতি বেশি জোর দেয়। আর জুলাইয়ের অন্যান্য পক্ষ, জামায়াত, পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা এনসিপির দাবি ছিল—আগে সংস্কার, এরপর নির্বাচন। সেদিক দিয়ে দলগুলো বিএনপিকে সংস্কার কার্যক্রমে বা ঐকমত্য কমিশনে চাপে রাখতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি জামায়াত মাঠের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় নিজেদের এগিয়ে রাখে। প্রায় এক বছর আগে দেশের প্রায় সব আসনে জামায়াত মনোনয়ন ঘোষণা করে, সেদিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল বিএনপি।

এ ছাড়া নির্বাচন হবে কি হবে না এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার দীর্ঘসূত্রতা, এ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রভাব বিএনপিকে চাপে ফেলে। এরপর মনোনয়নপ্রত্যাশীর চাপ, নেতাদের মূল্যায়ন, প্রার্থী বাছাইয়ে পরিকল্পনাহীনতা ও নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে না পারায় বিএনপির বিরুদ্ধেই বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ৭০ জনের বেশি। দলটির নির্বাচনী ইতিহাসে এমন নজির আগে দেখা যায়নি।

এসব কারণে শুরুর দিকে বিএনপির বড় বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা ছিল, সেটি ধাক্কা খেয়েছে বলতেই হবে। জামায়াতের প্রতি সমর্থনের জোয়ার দেখা হলেও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী ও বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, দিন শেষে দীর্ঘ সময় ধরে শক্ত জনভিত্তি ধরে রাখা বিএনপিই ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকবে। তবে ভোটের ফলাফলে জামায়াত কী চমক তৈরি করে, সেটিও দেখার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব