ভ্লাদিমির পুতিনকে যেভাবে পরাজিত করা সম্ভব

ভ্লাদিমির পুতিনফাইল ছবি

কোনো স্বৈরশাসকই চিরস্থায়ী নন। একদিন ভ্লাদিমির পুতিনও ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাশিয়ার অর্থনীতির দুর্বলতা, সমাজে অসন্তোষ এবং তাঁর শাসনব্যবস্থার ভেতরে আস্থাহীনতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তাই বলে পুতিনের পতন খুব কাছাকাছি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বোকামি হবে। মৃত্যু অথবা রাশিয়াই কেবল পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে, আর সেটা কখন বা কীভাবে ঘটবে, তা কেউ জানে না।

ইউরোপসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো যা করতে পারে, তা হলো তাঁর বহির্মুখী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পরাজিত করার জন্য একটি সুস্পষ্ট কৌশল গড়ে তোলা। এমন কৌশলের আটটি উপাদানের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা এখানে দেওয়া হলো।

প্রথমত, লক্ষ্য হতে হবে একেবারে পরিষ্কার। পুতিনের লক্ষ্য হলো ইউক্রেনকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা, যতটা সম্ভব রুশ সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করা, ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করা, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দুর্বল করা এবং পূর্ব ইউরোপের ওপর রাশিয়ার প্রভাবক্ষেত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তাঁকে পরাজিত করার অর্থ হলো এসব লক্ষ্য অর্জনে বাধা দেওয়া।

দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনের পাশে অটল থাকতে হবে। আগামী ১১ জুন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে। অনেক বড় শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের টিকে থাকার সাফল্য বিস্ময়কর। সামনের সারিতে ড্রোননির্ভর হত্যাযজ্ঞের কারণে যুদ্ধের ভাগ্য সম্ভবত সরাসরি ফ্রন্টলাইনে নির্ধারিত হবে না; বরং উভয় পক্ষই একে অন্যের অভ্যন্তরভাগে হামলা চালিয়ে জ্বালানি অবকাঠামো, অর্থনীতি ও মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহার করায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে, তবে তা অচল হয়ে যায়নি। হাঙ্গেরিতে ভিক্তর অরবানের পতনের ফলে ইউরোপের ৯০ বিলিয়ন ইউরোর অর্থনৈতিক সহায়তা আটকে থাকার অবসান হয়েছে, যা ইউক্রেনের বাজেটকে ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে। সামনে নানা সম্ভাব্য গতিপথ থাকলেও সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো—এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।

আমি জীবনের বহু বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি পশ্চিমা নীতিগুলো নিয়ে গবেষণা করেছি। সেখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল: স্নায়ুযুদ্ধে পশ্চিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল কেবল বৈদেশিক নীতি নয়, বরং নিজেদের সমাজকে নিরাপদ, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তোলা এবং তারপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা।

তবে যুদ্ধ শেষ হলেও সবকিছু শেষ হয়ে যাবে না। ১৯৪৫ সালের বিজয় দিবসের মতো এখানে গুলি থামার মুহূর্তেই কে জিতল তা বোঝা যাবে না। ‘শান্তি’ আসবে সম্ভবত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে, যা বর্তমান ফ্রন্টলাইন ধরে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত-স্থবিরতায় রূপ নেবে। আর সেটিই ইউক্রেনের জন্য নতুন বিপদের সূচনা হতে পারে। দেশের ভেতরে বহু বছরের যুদ্ধ থেকে সঞ্চিত সামাজিক বিভাজন ও মানসিক আঘাত গভীর বিভাজনমূলক রাজনীতির বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

বাইরে থেকে ইউরোপের মনোযোগ দ্রুত অন্যদিকে সরে যেতে পারে, যেমনটি ১৯৯৫ সালের ডেটন শান্তি চুক্তির পর বসনিয়ার ক্ষেত্রে হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এমন একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায়, যেখানে রাশিয়ার দখলের বাইরে থাকা ইউক্রেনের চার-পঞ্চমাংশ জনশূন্য, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সেটাই হবে পুতিনের ‘প্ল্যান বি’র বিজয়, অর্থাৎ ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তাকে ধ্বংস করা। কেবল তখনই বলা যাবে পুতিন সেখানে পরাজিত হয়েছেন, যখন ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি তুলনামূলক সমৃদ্ধ, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক সদস্যরাষ্ট্রে পরিণত হবে।

আরও পড়ুন

তৃতীয়ত, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বেছে নেওয়া যুদ্ধের এক অদ্ভুত ফল হলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে আয় বৃদ্ধি পাওয়া এবং সেগুলোর ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া। অথচ পুতিনকে পরাজিত করতে হলে এর উল্টোটা ঘটতে হবে। নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার পাশাপাশি ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার হামলাকে সমর্থন দিতে হবে, যাতে তারা রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপকে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন নৌবহরের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাশিয়ার প্রায় অর্ধেক তেল রপ্তানি বাল্টিক সাগর দিয়ে যায়, যার বড় অংশই ইতিমধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত ট্যাংকারে পরিবাহিত হয়।

চতুর্থত, ভবিষ্যৎ রুশ হামলা ঠেকাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ইউরোপ যেন নিজেই আত্মরক্ষায় সক্ষম হয়, সে বিষয়ে যথার্থই অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে রাশিয়ার হামলার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সম্ভবত এই রূপান্তরের শুরুর দিকেই, বিশেষ করে ২০২৭-২৮ সালে।

আরও পড়ুন

পুতিন একজন তাড়াহুড়ো করা বৃদ্ধ নেতা, যিনি রাশিয়ার ‘গৌরব’ পুনরুদ্ধারে আচ্ছন্ন এবং দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসকদের মতো বাস্তবতা থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। যুদ্ধক্লান্ত হলেও তাঁর হাতে রয়েছে অভিজ্ঞ বিশাল সেনাবাহিনী ও যুদ্ধমুখী অর্থনীতি। অন্যদিকে ইউরোপ মাত্র আবার অস্ত্রসজ্জা শুরু করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এমন একজন, যিনি পূর্ব ইউরোপের কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন কি না, তা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে।

তবে পুতিন জানেন, ট্রাম্প ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারির পর হোয়াইট হাউসে থাকবেন না। তাই ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ প্রমাণ করার এটাই সম্ভবত তাঁর সেরা এবং শেষ সুযোগ। এর জন্য বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসনের প্রয়োজন হবে না; এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, কোনো বাল্টিক দ্বীপ বা পূর্ব সীমান্তের অন্য কোথাও কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করাই যথেষ্ট হতে পারে।

এ ধরনের হামলার সম্ভাবনা কম হলেও ঝুঁকি এতটাই বড় যে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওপর ভরসা করা যেত, তাহলে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর বর্তমান অবস্থানই যথেষ্ট হতো। কিন্তু যেহেতু তা সম্ভব নয়, তাই দ্রুত বিকল্প কৌশল গড়ে তুলতে হবে। ন্যাটোর অধীন থাকা ইউরোপীয় বাহিনী বিশেষত জার্মান বাহিনী ও ব্রিটিশ-নর্ডিক-বাল্টিক-ডাচ যৌথ অভিযাত্রী বাহিনীর মতো আঞ্চলিক কাঠামোগুলোকে এমন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই রাশিয়াকে নির্ভরযোগ্যভাবে নিরুৎসাহিত করতে পারে। কাজটি অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু এখন তা অপরিহার্য।

পঞ্চমত, কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকলে চলবে না। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপক ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ প্রেক্ষাপটে শুধু আত্মরক্ষা নয়, বরং রুশ কর্মকাণ্ড ব্যাহত করা এবং সীমিত ও সতর্ক উপায়ে পাল্টা আক্রমণাত্মক কৌশলও নিতে হবে।

ষষ্ঠত, রাশিয়ার সব অংশের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ইউরোপের পক্ষ থেকে পুতিনের সঙ্গে আলোচনার জন্য একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিয়োগের কথা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুতিন যদি শুনতেও চান, তাঁকে আসলে কী বলা হবে? হ্যাঁ, ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা উচিত, এমনকি গোপন চ্যানেলও। কিন্তু পুতিন আসলে যে ভাষা বোঝেন, তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছাসম্পন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ভাষা।

তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাশিয়ার আরও তিনটি গোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলা: দেশের ভেতরে থাকা ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও আমলাতান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণি এবং বৃহত্তর রুশ, যাঁরা এখন মূলত দেশের বাইরে বাস করছেন এবং পুতিনের পরাজয় সবচেয়ে বেশি কামনা করেন। বার্তা ভিন্ন হলেও মূল সুর হবে একটাই, ‘রাশিয়ার সঙ্গে অন্য রকম সম্পর্ক সম্ভব।’ স্বল্প মেয়াদে এর খুব বেশি প্রভাব না–ও পড়তে পারে, কিন্তু পরিবর্তনের মুহূর্ত এলে তা ফল দিতে পারে।

সপ্তমত, নিজেদের জাতীয়তাবাদীদের মোকাবিলা করতে হবে। ব্রাসেলসে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে রাশিয়ার স্বার্থে ভেটো দেওয়ার ক্ষেত্রে হাঙ্গেরির অরবানের তাৎক্ষণিক বিকল্প এখন পুতিনের নেই। স্লোভাকিয়ার রবার্ট ফিকো তাঁর সমতুল্য নন। কিন্তু ইউরোপের অন্যত্র উদারবিরোধী, জনতাবাদী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলো এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ২০২৭ সালে যদি জর্দান বারদেলা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হন কিংবা ২০২৯ সালে অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) জার্মান পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দলে পরিণত হয়, তাহলে ইউরোপকে নিজের বিরুদ্ধে বিভক্ত করার নতুন সুযোগ পাবে পুতিন।

সবশেষে শুধু কিছু করার তাড়নায় নয়, স্থির থেকেও শক্তিশালী হতে হবে। আমি জীবনের বহু বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি পশ্চিমা নীতিগুলো নিয়ে গবেষণা করেছি। সেখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল: স্নায়ুযুদ্ধে পশ্চিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল কেবল বৈদেশিক নীতি নয়, বরং নিজেদের সমাজকে নিরাপদ, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তোলা এবং তারপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা।

এখনো একই কথা প্রযোজ্য। রাশিয়ায় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন কালই আসতে পারে, আবার আরও ১০ বছরও লাগতে পারে। বৈচিত্র্যময় উদার গণতন্ত্রগুলোর জন্য সবচেয়ে কঠিন, অথচ সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত ধৈর্য। সেটি অর্জন করতে পারলে সময় শেষ পর্যন্ত আমাদের পক্ষেই থাকবে।

  • টিমোথি গার্টন অ্যাশ একজন ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক লেখক ও গার্ডিয়ান পত্রিকার কলামিস্ট।