ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গত সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লিতে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ, ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এই নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর কর্মসূচির মাধ্যমে।
সর্বশেষ নিবিড় সংশোধন হয়েছিল ২০০৩-০৪ সালে। কিন্তু এবারের কর্মসূচি নজিরবিহীন। এর ব্যাপকতা, খামখেয়ালিভাবে নিয়ম প্রয়োগ এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা ব্যবহারের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন।
মুসলমান, নারী, অভিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী বিজয়ের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল এই এসআইআর কর্মসূচিকে ‘শুদ্ধীকরণ’ হিসেবে তুলে ধরেছে। জাতপাতভিত্তিক সমাজে এমন শব্দচয়ন গভীর উদ্বেগের। এর মাধ্যমে নাগরিকদের দুই শ্রেণিতে ভাগ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
একশ্রেণির মানুষ ভোট দিয়ে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার পাবেন, অন্য শ্রেণির মানুষ সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের ভাষায়, তাঁরা হয়ে পড়বেন কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মানুষ, যাঁদের রাজনৈতিক অধিকার কার্যত নেই।
শুরুতে নির্বাচন কমিশন ভোটার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য আধার কার্ড গ্রহণ করেনি। যুক্তি ছিল, এই পরিচয়পত্রে অতিরিক্ত মানুষ অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা ‘যৌক্তিক অসংগতি’ নামে নতুন একটি শ্রেণি তৈরি করা হয়। এ কারণ দেখিয়ে প্রায় ৯০ লাখ বাদ পড়া নামের মধ্যে ২৭ লাখ নাম তালিকা থেকে সরানো হয়।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্য জানাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে বাদ পড়া ২৭ লাখ মানুষের প্রায় ৬৫ শতাংশ মুসলমান। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩৮ লাখের বেশি আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে মাত্র ১৯টি। ফলে বাদ পড়া অনেকের পক্ষে প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাগত সনদ, জমির কাগজ, পুরোনো নথি ও পারিবারিক বংশতালিকা চাওয়ায় দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা পড়ে। দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা ও নিরক্ষরতায় জর্জরিত এলাকায় এই শর্ত পূরণ করা আরও কঠিন। ফলে প্রমাণ দেওয়ার দায় সাধারণ ভোটারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গণহারে নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ অ্যাপ, অনলাইন ফরম, ডিজিটাল ভোটার তালিকা এবং নির্দিষ্ট নিয়মে নথি স্ক্যান করে জমা দেওয়াকে কর্মসূচির দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সবার প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সমান নয়।
প্রযুক্তিও ক্ষমতার সম্পর্কের বাইরে কাজ করে না; অনেক সময় তা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ‘যৌক্তিক অসংগতি’ শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ইআরওনেট ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি পুরোনো ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তথ্য মিলিয়ে নাম ও পারিবারিক সম্পর্কের অমিল চিহ্নিত করে। এসব তথ্য কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কীভাবে অসংগতি নির্ধারণ করা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিয়ের পর অনেক নারীর নাম ও ঠিকানা বদলে যায়। পুরোনো নথির সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণের কাগজও তাঁদের কাছে না–ও থাকতে পারে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ প্রযুক্তিগত পদ্ধতিও নারীদের ভোটাধিকার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর এতে আরও সংকুচিত হচ্ছে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্য জানাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে বাদ পড়া ২৭ লাখ মানুষের প্রায় ৬৫ শতাংশ মুসলমান। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩৮ লাখের বেশি আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে মাত্র ১৯টি। ফলে বাদ পড়া অনেকের পক্ষে প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
হায়দরাবাদে ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত ও দ্বৈত’—এই চার শ্রেণিতে ১৯ লাখ ৪০ হাজার নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ নাম মুসলমানদের, যদিও শহরের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ মুসলমান। পুরোনো হায়দরাবাদের কয়েকটি আসনে বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত নামের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত মুসলমানদের। দিল্লি ও আশপাশের অঞ্চলেও খসড়া তালিকা থেকে আগের ভোটারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের নাম অনুপস্থিত ছিল।
সংখ্যালঘু ও অভিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা এবং অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারীদের মধ্যে বাদ পড়ার হার বেশি। এসব প্রবণতা নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কর্মসূচির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও এই কর্মসূচি কার্যকর হয়েছে। মুসলমানদের মতো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটার বাদ পড়ায় বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভোটভিত্তি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে পুরোনো তালিকা থেকে ৬৮ লাখ নাম বাদ এবং ২১ লাখ নতুন ভোটারের নাম যুক্ত হওয়ার পর বিজেপি জোটের ব্যবধান বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বিশ্লেষণেও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। যেসব জেলায় বিজেপির সমর্থন ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল ছিল, সেখানে মুসলমান, অভিবাসী ও দরিদ্র ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিজেপির জেতা অনেক আসনে বাদ পড়া বা বিতর্কিত ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল।
এই কর্মসূচি ‘বিশুদ্ধ হিন্দু’ রাষ্ট্র গড়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পকেও শক্তিশালী করছে। ‘রোহিঙ্গা’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘বাংলাদেশি’ বলে মানুষকে চিহ্নিত করে বহিষ্কারের দাবি তোলা হচ্ছে।
সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে এসব শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে মুসলমানদের লক্ষ্য করে। বাঙালি হিন্দুসহ অন্যদের নামও বাদ পড়েছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারে মুসলমানদের সন্দেহভাজন জনগোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন নির্বাচিত বিজেপি সরকারগুলো বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের সরকারি গণবণ্টনব্যবস্থার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রক্রিয়া এমন এক কাল্পনিক শত্রুর ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাকে বহিষ্কার করলেই বিদ্যমান ব্যবস্থা সুরক্ষিত থাকবে। আসামে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি থেকে ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই বাংলাভাষী। তাঁরা কার্যত রাষ্ট্রহীনতার পরিস্থিতিতে পড়েন।
২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনও ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার ভিন্ন সুযোগ তৈরি করেছে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সম্প্রতি গঠিত জনমিতিক পরিবর্তনবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটিও একই ধারার। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ এবং ‘ধর্মীয় ও সামাজিক জনগোষ্ঠীর’ মধ্যে ‘অস্বাভাবিক’ জনসংখ্যা পরিবর্তনের কারণ খতিয়ে দেখাই এর দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন এমন একাধিক ব্যবস্থার অংশ, যার মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের ধারণার বিরোধী বলে বিবেচিত জনগোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং নাগরিকত্বহীন করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার নামে যদি বিপুলসংখ্যক মানুষকে গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং ভেতর থেকেই তাকে দুর্বল করে দেয়।
তানভীর ফজল জার্মানির গ্যোটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্টের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত